পরণকথার আঙিনায় গল্পের ভেতর মানুষের মুখ।মুক্তগদ্য। আশফাকুজ্জামান

by protibimbo
0 মন্তব্য 17 বার পড়া হয়েছে

‘পরণকথা’ ৭৯তম আসর, সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রের তৃতীয় তলায় জমে উঠেছিল সাহিত্যপ্রেমীদের প্রাণবন্ত সমাবেশ:

গল্প সময়ের দলিল। গল্প হৃদয়ের ভাষা। সেই গল্পকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ‘পরণকথা’। যেখানে শব্দের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ভাবনা। মতের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে সাহিত্য। এটি কোনো কৃত্রিম বা আনুষ্ঠানিক পাঠসভা নয়। এটি গল্পকে ভালোবাসার এক পরম আন্তরিক আয়োজন। এখানে নিয়মিত মিলিত হন গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, সাহিত্যসমালোচক ও অনুরাগী পাঠক। সবাই আসেন গল্পের গভীরে প্রবেশ করতে। গল্পকে বুঝতে এবং জীবনকে নতুন আলোয় দেখতে।
‘পরণকথা’ ৭৯তম আসরটিও ছিল তেমনি এক আলোকময় বিকেল। রাজধানীর সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রের তৃতীয় তলায় জমে উঠেছিল সাহিত্যপ্রেমীদের প্রাণবন্ত সমাবেশ। পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল গল্পের আবহ। মনোযোগী শ্রোতার নীরব উপস্থিতি আর আলোচনার নিবিড় গভীরতা।

সেদিন গল্পপাঠে অংশ নেন দুইজন ভিন্ন ধারার লেখক। নিজের নতুন গল্প পাঠ করেন বিশিষ্ট অধ্যাপক ও কথাসাহিত্যিক আবুল ইসলাম শিকদার ও ছড়াকার, থিয়েটারকর্মী মাহবুবা হক কুমকুম। দুটি ভিন্ন স্বরের গল্প, দুটি আলাদা অভিজ্ঞতা এবং দুটি পৃথক জীবনবোধ মুহূর্ত আসরকে মুগ্ধতায় ভরিয়ে তোলে।
গল্পপাঠ শেষের সাথে সাথেই শুরু হয় আন্তরিক আলোচনা ও ব্যবচ্ছেদ।
কেউ গল্পের ভাষা ও অলঙ্কার নিয়ে বলেন, কেউ কথা বলেন চরিত্র সৃষ্টি ও মনস্তত্ত্ব নিয়ে, আবার কেউ আলোকপাত করেন নির্মাণশৈলীতে। কেউ তোলেন কৌতুহলোদ্দীপক প্রশ্ন, কেউবা জানালেন সুচিন্তিত ভিন্ন মত। আবার অনেকে গল্পের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা জীবনদর্শন খুঁজে দেখার চেষ্টা করেন। মতের ভিন্নতা ছিল, কিন্তু কোথাও সৌজন্য বা শ্রদ্ধাবোধের অভাব ছিল না। আর এটিই ‘পরণকথার’ মূল সৌন্দর্য। এখানে প্রশংসা যেমন থাকে উন্মুখ হৃদয়ে, তেমনি থাকে গঠনমূলক সমালোচনাও। তবে সেই সমালোচনা কাউকে আঘাত করার জন্য নয়, বরং লেখার পথকে আরও পরিচ্ছন্ন ও সমৃদ্ধ করার জন্য। একজন লেখকের পাশে অপর লেখকের পরম মমতায় দাঁড়িয়ে থাকার জন্য।
আসরের প্রতিটি মুখে ছিল গভীর মনোযোগ। প্রতিটি চোখে ছিল জানার আকুল কৌতূহল। কারো হাতে ছিল গল্পের খসড়া কাগজ। মনে ছিল সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ। কেউ মন দিয়ে পড়ছেন। কেউ শুনছেন। কেউবা খাতায় মূল্যবান বিষয় নোট নিচ্ছেন। আবার কেউ নিভৃতে গভীর ভাবনায় ডুব দিয়েছেন।
একটি গল্পকে কত আঙ্গিকে পাঠ করা যায়, এটি যেন ছিল তারই এক জীবন্ত অনুশীলন। অনুষ্ঠানের এই প্রাণবন্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ ও স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে পুরো আসরকে আনন্দ আড্ডায় ভরিয়ে তোলেন খায়রুল আলম সবুজ, ইখতিয়ার চৌধুরী, মোজাম্মেল হক, লায়লা আরজুমান, কে এম কামাল, আনিস রহমান, সরদার আব্দুল মান্নান, আয়শা জাহান নূপুর, আশফাকুজ্জামান, শামীমা ফেরদৌসী, শহীদুল জয়, ড. আলী রেজা, ড. শামীম আরা, খালেদ মল্লিক, পারভীন সুলতানা ও সুজন বড়ুয়াসহ আরও অনেকে।
সবচেয়ে বড় শক্তি এর মেলা মেশার নিবিড় ও আন্তরিক পরিবেশ। এখানে জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠ কিংবা নামি-বেনামির কোনো কৃত্রিম দূরত্ব নেই। প্রতিষ্ঠিত লেখক ও নবীন গল্পকার একই বৃত্তে বসেন, একই আলোচনায় সমান অধিকারে অংশ নেন এবং একই শ্রদ্ধায় একে অপরের কথা শোনেন। সাহিত্য এখানে কোনো অহংকারের বিষয় নয়, সাহিত্য এখানে এক সুন্দর জীবন্ত সংলাপ।
আজকের এই যান্ত্রিক সময়ে, যখন গভীর পাঠ ও পর্যালোচনার অভ্যাস ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে, তখন ‘পরণকথার’ মতো আয়োজন নতুন আশার আলো জ্বালায়। ভালো সাহিত্য শুধু নির্জনে লিখে তৈরি হয় না। ভালো সাহিত্য রূপ নেয় নিবিড় পাঠে। মুক্ত আলোচনায়, প্রশ্নে এবং আত্মসমালোচনায়।
‘পরণকথা’ সেই সুস্থ সাহিত্যচর্চারই একটি বিশ্বস্ত ঠিকানা। যেখানে গল্প পড়া শেষ হলেও ভাবনার আলোচনা শেষ হয় না। একটি গল্প থেকে জন্ম নেয় হাজারো নতুন ভাবনা। আর সেই ভাবনাই সাহিত্যকে এগিয়ে নেয় পরম পূর্ণতার দিকে।
পরণকথা তাই গল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক নান্দনিক ও মায়াময় সাহিত্য পরিবার। যেখানে শব্দের প্রতি ভালোবাসাই সবার বড় পরিচয়।
এই প্রাণবন্ত অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ‘পরণকথা’র সাধারণ সম্পাদক ঝর্ণা রহমান।

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও সংগঠক

Banner

সম্পর্কিত খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল খায়ের 

নির্বাহী সম্পাদক: 
বার্তা প্রধান:

অফিস: বাড়ি ০৭, সড়ক ১৪/সি, সেক্টর ৪,

উত্তরা, ঢাকা-১২৩০।

যোগাযোগ: ০১৭১৫৩৬৩০৭৯

বিজ্ঞাপন: ০১৮২৬৩৯৫৫৪৯

Email: khair.hrm@gmail.com

info@dainikprotibimbo.com

protibimboprokash.com

ফেসবুকে আমরা

©2025 Dainik Protibimbo – All Right Reserved. Designed and Developed by Bangla Webs