“এম সাইফুর রহমান: বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের রূপকার”– মো. মোস্তফা মিয়া

by protibimbo
0 মন্তব্য 77 বার পড়া হয়েছে

“এম সাইফুর রহমান: বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের রূপকার”
— মো. মোস্তফা মিয়া

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে “তলাবিহীন ঝুড়ি” থেকে একটি উদীয়মান অর্থনীতিতে পরিণত করার সংগ্রামের ইতিহাসে একটি নাম শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয় – এম সাইফুর রহমান। তিনি কেবল একজন সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি দর্শনের প্রবর্তক, যে দর্শন বাংলাদেশকে সাহায্য নির্ভরতা থেকে আত্মনির্ভরশীলতার দিকে নিয়ে গেছে। তাই তাকে যথার্থই বলা হয় বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের রূপকার।
১৯৩২ সালের ৬ অক্টোবর মৌলভীবাজারে জন্ম নেওয়া এই অর্থনীতিবিদ লন্ডন থেকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি পাশ করে দেশে ফিরে আসেন এবং জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি সর্বোচ্চ ১২ বার জাতীয় বাজেট পেশ করেছেন, যা আজও একটি রেকর্ড।
সংস্কারের তিন স্তম্ভ:
এম সাইফুর রহমানের অর্থনৈতিক সংস্কার ছিল তিনটি মৌলিক স্তম্ভের উপর দাঁড়ানো, যা আজকের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) এর মূল ভিত্তির সাথে হুবহু মিলে যায়।
১. রাজস্ব সংস্কার ও ভ্যাট প্রবর্তন: ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের রাজস্ব আয় ছিল অত্যন্ত নাজুক। প্রায় ৯০ ভাগ বাজেট নির্ভর করত বিদেশি অনুদানের উপর। এম সাইফুর রহমান এই বৃত্ত ভাঙতে ১৯৯১ সালের ২ জুলাই মূল্য সংযোজন কর (VAT) আইন চালু করেন। তখন এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন হয়েছিল, কিন্তু তিনি পিছু হটেননি। তিনি বলেছিলেন, “ভিক্ষা করে জাতির উন্নয়ন হয় না, নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়।” আজ বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) প্রায় ৬০ শতাংশ আয় আসে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক থেকে। এই একটি সিদ্ধান্তই বাংলাদেশকে টেকসই অর্থনীতির পথে নিয়ে গেছে।
২. বেসরকারি খাত ও মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবর্তন: ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালে জাতীয়করণের ফলে দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছিল। এম সাইফুর রহমান প্রথম উপলব্ধি করেন, সরকার ব্যবসা করবে না, সরকার ব্যবসার পরিবেশ তৈরি করবে। তার হাত ধরেই বাংলাদেশে বেসরকারি ব্যাংকিংয়ের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালে আরব বাংলাদেশ ব্যাংক (এবি ব্যাংক), ন্যাশনাল ব্যাংক, দি সিটি ব্যাংক এর অনুমোদন দেন। বেসরকারি বীমা কোম্পানি, ১৯৯৫ সালে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠা এবং পুঁজিবাজার সংস্কার তার অবদান। আজ বাংলাদেশের জিডিপির ৭৫ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে, যার বীজ বপন করেছিলেন তিনি।
৩. মানবিক ও সামাজিক উন্নয়ন: টেকসই উন্নয়ন মানে শুধু অবকাঠামো নয়, মানুষের উন্নয়ন। এম সাইফুর রহমানই প্রথম বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ধারণা আনেন। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা, প্রাথমিক শিক্ষা উপবৃত্তি, মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের উপবৃত্তি – সবই তার মস্তিষ্কপ্রসূত। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন মা যদি শিক্ষিত হন, একটি পরিবার দারিদ্র্যমুক্ত হবে।
অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক আস্থা:
যমুনা বহুমুখী সেতু, যা আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড, তার অর্থায়ন ও নির্মাণ পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয় তার সময়ে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সাথে তিনি এমনভাবে দর কষাকষি করতেন যে, বাংলাদেশ সাহায্য গ্রহণ করলেও মাথা নত করত না। তিনি খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য কৃষিতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখেন এবং সার ও বিদ্যুতে ভর্তুকি দিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেন।
তার ব্যক্তিগত জীবন ছিল সততার প্রতীক। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তার বিরুদ্ধে একটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগও কেউ করতে পারেনি। সিলেটের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন “সাইফুর ভাই” – একজন বিনয়ী, প্রজ্ঞাবান অভিভাবক।
২০০৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খাটিহাতায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় এই মহান অর্থনীতিবিদের জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তার রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক সংস্কারের পথ ধরেই আজ বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে।
তাই ইতিহাস যখন বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের মূল্যায়ন করবে, তখন এম সাইফুর রহমানের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে – একজন রূপকার হিসেবে, যিনি বাংলাদেশকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলেন কীভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়। গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে উনার রুহের মাগফেরাত কামনা করছি।

লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক

সম্পর্কিত খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল খায়ের 

নির্বাহী সম্পাদক: 
বার্তা প্রধান:

অফিস: বাড়ি ২৫ (দ্বিতীয় তলা), সড়ক ৫, সেক্টর ৬, উত্তরা, ঢাকা।

যোগাযোগ: ০১৭১৫৩৬৩০৭৯

বিজ্ঞাপন: ০১৮২৬৩৯৫৫৪৯

Email: khair.hrm@gmail.com

info@dainikprotibimbo.com

protibimboprokash.com

ফেসবুকে আমরা

©2025 Dainik Protibimbo – All Right Reserved. Designed and Developed by Bangla Webs