পাহাড়ের ভাঙন, ভেসে যায় জনপদ, পৃথিবীর সতর্কতা: আশফাকুজ্জামান

by protibimbo
0 মন্তব্য 3 বার পড়া হয়েছে

পাহাড় দেখলে মনে হয়,পৃথিবীর সুন্দর আশ্রয়ের ঠিকান। কিন্তু পাহাড়ের এর বুকেও জমে থাকে অস্থিরতা। কখনো বরফে, কখনো পাথরে, কখনো বা মাটির গভীরে। সেই অস্থিরতা একদিন হঠাৎ ভেঙে পড়লে বদলে যায় জনপদ।
নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিয়ে অনুষ্ঠিত হলো একটি গভীর ও তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনা। এটি ছিল সমাজ বিকাশ পাঠাগারের নিয়মিত ‘শনিবারের আলোচনা’র আয়োজন। ১৯ সেপ্টেম্বর সকালে পুরানা পল্টনের মণি সিংহ-ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্ট ভবনের শহীদ মুনীর-আজাদ সভাকক্ষে বসে এই আসর। আলোচনার বিষয় ছিল—‘নেপালের প্রাকৃতিক বিপর্যয়’।
অনুষ্ঠানের মূল আলোচক ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন। এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তিনি নেপালের বিপর্যয়ের ভূতাত্ত্বিক কারণ, ব্যাপ্তি ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করেন।
তাঁর আলোচনায় উঠে আসে বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য। ২৬ আগস্ট নেপালের লাংটাং লিরুং পর্বতাঞ্চলে ভয়াবহ শিলাখণ্ড ও বরফধসের ঘটনা ঘটে। প্রায় ১৬ হাজার ৯০০ ফুট উচ্চতা থেকে পাহাড়ের উত্তর ঢালের বিশাল একটি অংশ বরফ ও শিলাসহ নিচে ধসে পড়ে।
বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ধসে পড়া অংশটির আয়তন ছিল প্রায় ২ দশমিক ২ বর্গকিলোমিটার। পাহাড়ের বুক থেকে নেমে আসে বিশাল পরিমাণ বরফ ও শিলাখণ্ড। প্রায় ১১ কোটি ঘনমিটার শিলা ও বরফ প্রায় ৪ হাজার ৬০০ ফুট নিচে আছড়ে পড়ে। সেই প্রচণ্ড আঘাতে যে ভূকম্পন সৃষ্টি হয়, তার শক্তি ছিল প্রায় ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য।
বরফ, পাথর, মাটি ও পানির সেই প্রবল স্রোত নেমে আসে লহেন্দে খোলা দিয়ে। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর প্রবাহপথে। রাসুয়া জেলার তিমুরে ও সিয়াফ্রুবেশি থেকে নুওয়াকোট ও ধাদিংয়ের বিস্তীর্ণ এলাকা এতে আক্রান্ত হয়। দক্ষিণে গোরখা, তানাহুন ও চিতওয়ানেও পৌঁছে যায় এর প্রভাব। সীমান্তের ওপারে তিব্বতের গিয়িরং এলাকাও রক্ষা পায়নি।
আরও বিস্ময়কর হলো এই ধ্বংসধারার গতি। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কোথাও কোথাও এর গড় গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ১৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছেছিল। এত দ্রুত নেমে আসা বিপর্যয়ের সামনে মানুষের হাতে প্রস্তুতির সময় ছিল না বললেই চলে।
ড. সাখাওয়াতের আলোচনায় নেপালের এই ঘটনা শুধু পাহাড়ধস বা বন্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। উঠে এসেছে বদলে যাওয়া হিমালয়ের ভূপ্রকৃতি। এসেছে হিমবাহের ক্ষয়। এর পাশাপাশি দীর্ঘদিন জমাট থাকা বরফ গলে পাহাড়ের মাটি ও পাথর আলগা হয়ে যাওয়ার বিষয়টিও উঠে আসে। দীর্ঘদিন জমাট থাকা ররফ যখন উষ্ণতার কারণে গলতে শুরু করে, তখন পাহাড় আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। আলোচনায় এসেছে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাবও।
বিজ্ঞানীদের মতে, এসব কারণ একসঙ্গে কাজ করলে তৈরি হতে পারে ‘কম্পাউন্ড ক্রাইসিস’—অর্থাৎ এক বিপর্যয় থেকে আরেক বিপর্যয়ের ধারাবাহিকতা। ফলে হিমালয় অঞ্চলে ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
আলোচনায় অংশ নেন কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও সংগঠক আশফাকুজ্জামান। তিনি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং পাহাড় ও নদীর প্রতি মানুষের দায়বোধের কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে নেপালের বিপর্যয় হয়ে ওঠে শুধু একটি দেশের দুর্যোগ নয়। হয়ে ওঠে গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি সতর্কবার্তা।
কবি ও কথাসাহিত্যিক শাওন আসগরও নেপালের বিপর্যয় নিয়ে আলোচনা করেন। প্রকৃতির আকস্মিক রূপান্তর কীভাবে মানুষের জীবন ও স্বপ্নকে মুহূর্তে বিপন্ন করে, সে কথাও উঠে আসে তাঁর আলোচনায়। পরে তিনি একটি কবিতা পাঠ করেন। পাহাড়, প্রকৃতি ও বিপন্ন মানুষের প্রতি তাঁর কবিতার মানবিক উচ্চারণ অনুষ্ঠানের আবহে যোগ করে অন্যরকম আবেগ।
আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন উপস্থিত অন্যান্য অতিথিরা।
সভাপতির বক্তব্যে ড. নিতাই দাশ বলেন, প্রকৃতিকে বুঝতে হলে শুধু তার সৌন্দর্য দেখলেই হয় না। তার পরিবর্তনের ভাষাও বুঝতে হয়। অনুষ্ঠানের পুরো আলোচনায় যেন সেই উপলব্ধিই ফিরে ফিরে আসে।
নেপালের পাহাড়ে যে বরফ ভেঙে পড়েছে, তার শব্দ হয়তো বাংলাদেশের শহরে শোনা যায়নি। কিন্তু সেই শব্দের প্রতিধ্বনি পৌঁছে গেছে আমাদের নদী, উপকূল ও ভবিষ্যতের দরজায়। পাহাড়ের বিপর্যয় তাই শুধু পাহাড়ের গল্প নয়। এটি মানুষের গল্প। এটি প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের গল্প। আর সবচেয়ে বড় কথা, এটি ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য একটি সতর্ক ঘণ্টাধ্বনি।অনুষ্ঠানটি আয়োজন ও সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন রুশো তাহের।

আশফাকুজ্জামান
কবি, লেখক, সাংবাদিক ও সংগঠক

সম্পর্কিত খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল খায়ের 

নির্বাহী সম্পাদক: 
বার্তা প্রধান:

অফিস: বাড়ি ২৫ (দ্বিতীয় তলা), সড়ক ৫, সেক্টর ৬, উত্তরা, ঢাকা।

যোগাযোগ: ০১৭১৫৩৬৩০৭৯

বিজ্ঞাপন: ০১৮২৬৩৯৫৫৪৯

Email: khair.hrm@gmail.com

info@dainikprotibimbo.com

protibimboprokash.com

ফেসবুকে আমরা

©2025 Dainik Protibimbo – All Right Reserved. Designed and Developed by Bangla Webs