কুমিল্লা গর্ব “বীর বিক্রম” শহীদ রঙ্গু মিয়া
মিজানুর রহমান
কুমিল্লার মাটিতে যুগ যুগ ধরে জন্মেছে সাহসী বিদ্রোহী বীর। একজন মানুষ, একটি জীবন, আর সেই জীবনের শেষ ঠিকানা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ।
কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের মাটিতে জন্ম নিয়েছিলেন এমন একজন বীর, যার সাহস ও আত্মত্যাগ শুধু নাঙ্গলকোট নয়, সমগ্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
তিনি শহীদ হাবিলদার রঙ্গু মিয়া, বীর বিক্রম।
আজকের প্রজন্মের কাছে তাঁর নাম হয়তো খুব বেশি পরিচিত নয়। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় রয়েছে আমাদেরই জনপদের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, যিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য সম্মুখযুদ্ধে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
নাঙ্গলকোটবাসী হিসেবে তাঁর ইতিহাস জানা, সংরক্ষণ করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা আমাদের দায়িত্ব।
বীর বিক্রম রঙ্গু মিয়া কুমিল্লা জেলার বর্তমান নাঙ্গলকোট উপজেলার মৌকরা ইউনিয়নের মোকরা (মৌবাড়ি) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
তার পিতা এয়াকুব আলী (আকু মিয়া) এবং মাতা রংমালা (ছন্দ নাম লালমতি বিবি) তার স্ত্রী ছিলেন জয়তুন নেছা। তাদের ছিল দুই ছেলে ও এক মেয়ে।
হাবিলদার রঙ্গু মিয়ার সামরিক নম্বর ছিল ৭০২১২৪৭।
১৯৭১ সালের ২২ নভেম্বর বড়খাতার যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় তাঁর নাম ও সামরিক নম্বর সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রে উল্লেখ রয়েছে। তিনি তার পিতার কাছে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন এবং স্থানীয় মক্তবে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে
১৯৫৫ সালে সামরিক বাহিনীতে যোগদানের পর তিনি সামরিক প্রশিক্ষণ লাভ করেন এবং একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ সৈনিক হিসেবে গড়ে ওঠেন।
১৯৫৫ সালে রঙ্গু মিয়া তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের EME শাখায় যোগ দেন। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি সৈয়দপুর রংপুর অঞ্চলে সামরিক দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৭১ সালে তিনি হাবিলদার পদে কর্মরত ছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করলে রঙ্গু মিয়া ক্যান্টনমেন্টে থেকে নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবেননি। তিনি ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেন। প্রাথমিক প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নেওয়ার পর তিনি গ্রামের বাড়িতে আসেন এবং কয়েকদিন স্থানীয় ছাত্র-যুবকদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেন। এরপর চৌদ্দগ্রাম এলাকায় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে ইচ্ছুকদেরও প্রশিক্ষণ দেন। পরে তিনি ভারতে গিয়ে আগরতলা ও মেলাঘর হয়ে ৬ নম্বর সেক্টরের সদর দপ্তর বুড়িমারীতে যোগ দেন।
প্রথমে সাহেবগঞ্জ সাব-সেক্টরের কমান্ডার ক্যাপ্টেন নওয়াজিশ উদ্দিন এবং পরে পাটগ্রাম সাব-সেক্টরের কমান্ডার ক্যাপ্টেন মতিউর রহমানের নেতৃত্বে তিনি বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
একের পর এক রণাঙ্গনে বীরত্ব, রঙ্গু মিয়া শুধু একটি যুদ্ধে অংশ নেননি। তিনি তিস্তা রেলসেতু, হাতীবান্ধা, হাতীবান্ধা পাকিস্তানি ক্যাম্প, বাউরা, শিঙ্গমারী BOP এবং বড়খাতাসহ বিভিন্ন অপারেশন ও সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। প্রতিটি রণাঙ্গনে তিনি অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় দেন। ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় পাকিস্তানি বাহিনীর একটি শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল। মুক্তিযোদ্ধারা কয়েকবার চেষ্টা করেও ঘাঁটিটি দখল করতে পারেননি। এরপর নেওয়া হয় একটি সাহসী কৌশলগত সিদ্ধান্ত, ঈদের দিন পাকিস্তানি সৈন্যরা কিছুটা অসতর্ক থাকতে পারে, সেই সুযোগে আকস্মিক আক্রমণ চালানো হবে। ৬ নম্বর সেক্টরের পাটগ্রাম সাব-সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ শুরু করেন। তীব্র গোলাগুলির মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি শক্তিশালী বাঙ্কার মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রার বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক তখন সামনে এগিয়ে যান হাবিলদার রঙ্গু মিয়া ও নায়েক সুবেদার লুৎফর রহমান। প্রচণ্ড গোলাবর্ষণের মধ্যেও তাঁরা পিছিয়ে যাননি। শত্রুর শক্ত অবস্থানের দিকে এগিয়ে গিয়ে তাঁরা বাঙ্কার আক্রমণ করেন। এই অপারেশনে রঙ্গু মিয়ার অসীম সাহসিকতার কথা পরবর্তীতে তাঁর কমান্ডার ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান স্মৃতিচারণে তুলে ধরেন। প্রথম আলোর চিরন্তন ১৯৭১ আর্কাইভেও রঙ্গু মিয়াকে ‘অমিত সাহসী যোদ্ধা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
হাতীবান্ধার যুদ্ধের পরও তার যুদ্ধ থামেনি। ২২ নভেম্বর ১৯৭১ রংপুর জেলার অন্তর্গত বড়খাতা এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রচণ্ড সংঘর্ষ শুরু হয়, পাকিস্তানি বাহিনী সেখানে গোলন্দাজ বাহিনী ব্যবহার করে। সেই ভয়াবহ সংঘর্ষে কোম্পানি কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান শহীদ হন। একই যুদ্ধে শহীদ হন হাবিলদার রঙ্গু মিয়া (সামরিক নম্বর ৭০২১২৪৭) এবং এম-এফ নাসির আহমেদ। রঙ্গু মিয়া সেদিন যুদ্ধ করতে করতেই শহীদ হন। একজন সৈনিক হিসেবে তিনি অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। কিন্তু একজন বীর হিসেবে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য জীবন দিয়ে গেছেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অসাধারণ সাহসিকতা ও সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার আমাদের নাঙ্গলকোটের এই বীর যোদ্ধাকে ‘বীর বিক্রম’ খেতাবে ভূষিত করেন। নাঙ্গলকোটের মাটিতে জন্ম নেওয়া একজন সন্তান বাংলাদেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ সামরিক বীরত্বসূচক খেতাব ‘বীর বিক্রম’ এ ভূষিত হয়েছেন, এটি শুধু তাঁর পরিবারের গর্ব নয়, এটি নাঙ্গলকোটের গর্ব।
এটি কুমিল্লার গর্ব। এটি বাংলাদেশের গর্ব।
নাঙ্গলকোটের মানুষ হিসেবে আমাদের গর্ব কোথায়?
নাঙ্গলকোটের একটি গ্রামের একজন সন্তান পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন, কিন্তু যখন নিজের দেশের মানুষের ওপর গণহত্যা শুরু হলো, তখন তিনি চাকরি, নিরাপত্তা কিংবা নিজের জীবনের কথা ভাবেননি। তিনি অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন বাংলাদেশের জন্য। তিনি একের পর এক যুদ্ধে লড়েছেন। আর শেষ পর্যন্ত ২২ নভেম্বর ১৯৭১-এ বড়খাতার রণাঙ্গনে নিজের জীবন দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল্য পরিশোধ করেছেন। নাঙ্গলকোটের ইতিহাসে এমন বীরের নাম যত বেশি উচ্চারিত হবে, আমাদের নতুন প্রজন্ম তত বেশি জানতে পারবে এই মাটিও বীরের জন্ম দিয়েছে।
তার নাম শুধু একটি তালিকায় থাকার জন্য নয়।
তার জীবন আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
তাই আসুন
আমরা নাঙ্গলকোটের এই বীর সন্তানকে নতুন করে স্মরণ করি। তার জীবনের ইতিহাস সংরক্ষণ করি।
এবং গর্ব করে বলি, এই নাঙ্গলকোটের মাটিতেই জন্মেছিলেন শহীদ হাবিলদার রঙ্গু মিয়া, বীর বিক্রম।
যে মানুষটি নিজের জীবনের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁর প্রতি নাঙ্গলকোটবাসীর শ্রদ্ধা কখনো শেষ হওয়ার নয়।
শহীদ হাবিলদার রঙ্গু মিয়া, ‘বীর বিক্রম’ আপনার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
আপনি নাঙ্গলকোটের গর্ব।
আপনি আমাদের ইতিহাসের গর্ব।
আপনি স্বাধীন বাংলাদেশের গর্ব।
আপনার আত্মত্যাগ আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করব, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
লেখক: মিজানুর রহমান,সদস্য-
নাঙ্গলকোট রাইটার্স এসোসিয়েশন।
সদস্য: প্রতিবিম্ব সাহিত্য পরিষদ।

