রাষ্ট্রপতি নির্বাচন : ৭০ অনুচ্ছেদের ভূমিকা —শহীদুল্লাহ ফরায়জী, গীতিকবি

by protibimbo
0 মন্তব্য 38 বার পড়া হয়েছে

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন : ৭০ অনুচ্ছেদের ভূমিকা
—শহীদুল্লাহ ফরায়জী, গীতিকবি
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে—রাষ্ট্রপতি সংসদ-সদস্যগণ কর্তৃক আইন অনুযায়ী নির্বাচিত হবেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচকমণ্ডলী হলেন সংসদ-সদস্যগণ।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নয়; এটি নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত একটি স্বতন্ত্র নির্বাচন। সংসদ কক্ষে ভোট অনুষ্ঠিত হয়, কিন্তু সংসদের অধিবেশন হিসেবে নয়। সংসদ কক্ষ একটি ভৌত কাঠামো; আর সংসদের অধিবেশন একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। কোনো নির্বাচন কোথায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে, শুধু সেই স্থান দ্বারা তার সাংবিধানিক প্রকৃতি নির্ধারিত হয় না; বরং নির্বাচনটি কোন সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে, কোন কর্তৃপক্ষের অধীনে এবং কোন উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত হচ্ছে—তা-ই তার প্রকৃতি নির্ধারণ করে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন ৬ আগস্ট প্রজ্ঞাপন জারি করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সকল সদস্যকে আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে। স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে ভোট গ্রহণের তারিখ ২০ আগস্ট নির্ধারণ করেছে।
অন্যদিকে মহামান্য রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে ২৭ আগস্ট সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন। সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা ছাড়া সংসদের অধিবেশনের আয়োজন করার আর কোনো সাংবিধানিক বিকল্প নেই।
সুতরাং ২০ আগস্টের সংসদ-সদস্যদের বৈঠক কেবলমাত্র রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য, সংসদের কোনো কার্যক্রমের জন্য নয়।
কিন্তু এখানে কেউ কেউ একটি সাংবিধানিক বিতর্ক সামনে আনেন—সংসদ-সদস্যগণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেন; সেই ভোটে কি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য? উত্তর হলো—না, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটকে ৭০ অনুচ্ছেদের অর্থে ‘সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট’ হিসেবে গণ্য করার সাংবিধানিক ভিত্তি নেই।
৭০ অনুচ্ছেদ মোতাবেক কোনো সংসদ-সদস্য সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দান করলে সংসদে তাঁর আসন শূন্য হবে।
কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ-সদস্যের প্রদত্ত ভোট সাংবিধানিক অর্থে “সংসদে প্রদত্ত ভোট” নয়। কারণ সেখানে ‘সংসদ’ কোন অধিবেশনে বসে কোনো সংসদীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে না এবং সংসদ-সদস্য কোনো বিল, প্রস্তাব বা সংসদীয় সিদ্ধান্তের ওপর ভোট দিচ্ছেন না। তিনি রাষ্ট্রপতি পদে একজন প্রার্থীকে নির্বাচিত করার জন্য ভোট দিচ্ছেন।
একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে সংসদ-সদস্য এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য। সংসদে আইন প্রণয়ন বা সংসদীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় তিনি সংসদ-সদস্য হিসেবে তাঁর সংসদীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করেন; রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় তিনি সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদে নির্ধারিত নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে তাঁর নির্বাচনী ক্ষমতা প্রয়োগ করেন।
সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদে সংসদের অধিবেশন ও ৭৫(১)(খ) অনুচ্ছেদে কার্যপ্রণালি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুনির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদীয় কোন কার্যক্রম নয়। এটি একটি স্বতন্ত্র নির্বাচন। ভোটদাতা সংসদ-সদস্য—কিন্তু ভোটটি সংসদীয় ভোট নয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলীয় প্রার্থী নির্বাচিত করার সাংবিধানিক ব্যবস্থা নেই। সংবিধানের ৪৮(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রপ্রধানরূপে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে নিছক একটি দলীয় আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত করা রাষ্ট্রপতি পদের সাংবিধানিক মর্যাদা ও প্রকৃতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে চিফ হুইপ বলেছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য এবং দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সংসদ-সদস্যের আসন শূন্য হবে।
সরকারের এই ব্যাখ্যা ৭০ অনুচ্ছেদের আক্ষরিক ভাষা এবং ৪৮(১), ১১৯ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর সমন্বিত সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে গুরুতর অসামঞ্জস্য সৃষ্টি করে। কারণ ৭০ অনুচ্ছেদকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না যে, সংসদ-সদস্যের প্রতিটি ভোটই স্বয়ংক্রিয়ভাবে “সংসদে প্রদত্ত ভোট” হয়ে যাবে।
এ সংকট নিরসনে আমাদের তিনটি প্রস্তাব:
১. সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে সরকারের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য—সরকারি দলের চিফ হুইপের এমন বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রত্যাহার করে সরকারকে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে হবে যে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ-সদস্যের ভোট ৭০ অনুচ্ছেদের অর্থে “সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোট” নয়; ফলে এ কারণে সংসদ-সদস্যের আসন শূন্য হওয়ার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে সংবিধানের বিধান সম্পর্কে সরকারের বক্তব্য হতে হবে দ্ব্যর্থহীন ও বিভ্রান্তিমুক্ত।

২.রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য নয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটের সাংবিধানিক উৎস সংসদের কার্যপ্রণালি নয়; এটি সংবিধাননির্ধারিত একটি স্বতন্ত্র নির্বাচনী ব্যবস্থা। অতএব, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদের প্রযোজ্যতা নেই। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে ভোটার ও দেশবাসীর উদ্বেগ ও সংশয় দূর করতে হবে। এটি নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
৩. সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগক্ষেত্র সাংবিধানিকভাবে সীমিত করতে হবে।
৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সংসদ-সদস্যের দলীয় সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার নিষেধাজ্ঞা কেবল অর্থবিল ও সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করতে হবে।
অহেতুক সংবিধান সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে সংসদ-সদস্য ও দেশবাসীর মনে ভয় ও বিভ্রান্তি ছড়ানো কোনো দায়িত্বশীল সরকারের কর্তব্য হতে পারে না।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে দলীয় আনুগত্যের বন্দিশালা থেকে মুক্ত রাখাই সংবিধানের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা।
আমরা ত্রয়োদশ সংসদের সকল সংসদ-সদস্যের প্রতি আহ্বান জানাই—গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কার ও রাষ্ট্রবিনির্মাণের স্বার্থে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে প্রজাতন্ত্রের প্রতি দায়বদ্ধতা, বিবেক ও স্বাধীন বিচারবোধ প্রয়োগ করে ভোট দিন। কোনো দলের রাষ্ট্রপতি নয়—প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য ভোট দিন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিবেকের স্বাধীনতা কোনো অপরাধ নয়; বরং প্রজাতন্ত্রের প্রতি সাংবিধানিক দায়িত্ব।
সবাইকে ধন্যবাদ।
১৭ আগস্ট ২০২৬
আয়োজনে: বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন

সম্পর্কিত খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল খায়ের 

নির্বাহী সম্পাদক: 
বার্তা প্রধান:

অফিস: বাড়ি ০৭, সড়ক ১৪/সি, সেক্টর ৪,

উত্তরা, ঢাকা-১২৩০।

যোগাযোগ: ০১৭১৫৩৬৩০৭৯

বিজ্ঞাপন: ০১৮২৬৩৯৫৫৪৯

Email: khair.hrm@gmail.com

info@dainikprotibimbo.com

protibimboprokash.com

ফেসবুকে আমরা

©2025 Dainik Protibimbo – All Right Reserved. Designed and Developed by Bangla Webs