একটি দেশের উন্নয়ন শুধু বড় বড় সেতু, উড়ালসড়ক, মেট্রোরেল কিংবা নতুন নতুন অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো—দেশের সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদে, স্বাচ্ছন্দ্যে ও মর্যাদার সঙ্গে প্রতিদিনের জীবনযাপন করতে পারছে। বিশেষ করে নারীরা যখন ঘর থেকে কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা প্রয়োজনীয় গন্তব্যে বের হন, তখন তাদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা একটি আধুনিক ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।
সেই জায়গা থেকে নারীদের জন্য বিশেষ ‘পিংক বাস’ সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) উদ্যোগে নারীদের জন্য বিশেষ বাসসেবা চালুর মাধ্যমে গণপরিবহনে একটি নতুন চিন্তার সূচনা হলো। শুধু নারী যাত্রীদের জন্য আলাদা পরিবহন নয়, এই উদ্যোগে নারী চালক ও কন্ডাক্টরদের যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। অর্থাৎ এটি একই সঙ্গে নিরাপদ যাতায়াত ও নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির একটি উদ্যোগ।
এ জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বিআরটিসি এবং এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন, শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ।
বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা ও সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে নারীদের জন্য পৃথক বাসসেবা চালুর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাই প্রশংসার দাবিদার।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কোনো উদ্যোগ ঘোষণা বা উদ্বোধনের মধ্যেই তার সফলতা শেষ হয়ে যায় না। প্রকৃত সফলতা তখনই আসবে, যখন একজন নারী প্রতিদিন বাসে উঠে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন, তাকে হয়রানির শিকার হতে হবে না, নির্ধারিত সময়ে বাস পাবেন এবং যাতায়াতের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে না।
আমাদের শহরের গণপরিবহনে নারীদের নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। অতিরিক্ত ভিড়, আসনসংকট, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, হয়রানি, অসৌজন্যমূলক আচরণ, বাসে ওঠা-নামার সময় ঝুঁকি—এসব বাস্তবতা অনেক নারীর প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার অংশ। কর্মজীবী নারী থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, গৃহিণী কিংবা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারী—সবাই কোনো না কোনোভাবে এসব সমস্যার মুখোমুখি হন।
তাই ‘পিংক বাস’ শুধু একটি বাস নয়; এটি নারীদের নিরাপদ চলাচলের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি প্রতীকী উদ্যোগও হতে পারে।
আরও আশার বিষয় হলো, পরিবহন খাতে নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা। একজন নারী যদি বাস চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, একজন নারী যদি কন্ডাক্টর হিসেবে কাজ করেন, তাহলে সেটি শুধু একটি চাকরি নয়—এটি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনেরও একটি বার্তা।
আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি, নারীর ক্ষমতায়ন মানে শুধু নারীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা নয়; তাদের নিজেদের সক্ষমতা দিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করে দেওয়া। পরিবহন খাতে নারীদের অংশগ্রহণ সেই পথেরই একটি অংশ হতে পারে।
তবে এখানে আমাদের প্রত্যাশাও অনেক।
‘পিংক বাস’ যেন শুধু রাজধানীর কয়েকটি রুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। পর্যায়ক্রমে দেশের বিভাগীয় শহর, জেলা শহর এবং গুরুত্বপূর্ণ নগর এলাকাগুলোতেও এই সেবা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। যেখানে নারী যাত্রীদের চাহিদা বেশি, সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী বাসের সংখ্যা ও রুট বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে বাসগুলোর সময়সূচি হতে হবে নির্ভরযোগ্য। কারণ একজন কর্মজীবী নারী বা শিক্ষার্থীর কাছে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সময়ে বাস না পাওয়া গেলে কিংবা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলে আলাদা বাসসেবার মূল উদ্দেশ্যই অনেকাংশে ব্যাহত হতে পারে।
নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। বাসে পর্যাপ্ত আলো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় নজরদারি এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কোনো নারী যাত্রী সমস্যার মুখোমুখি হলে তার অভিযোগ যেন দ্রুত ও গুরুত্বের সঙ্গে সমাধান করা হয়—এমন একটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
পাশাপাশি নারী চালক ও কর্মীদের জন্যও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের প্রশিক্ষণ, কর্মঘণ্টা, বিশ্রাম, বেতন-ভাতা এবং পেশাগত মর্যাদার বিষয়গুলো যথাযথভাবে নিশ্চিত করা দরকার।
এদিকে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাকে পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক করতে বৈদ্যুতিক বাস চালুর পরিকল্পনাও আশাব্যঞ্জক। ২০০টি বৈদ্যুতিক বাস কেনার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে, অন্যদিকে গণপরিবহনের আধুনিকায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর মধ্যে নারীদের জন্য বাস পরিচালনার পরিকল্পনা থাকলে সেটি এই উদ্যোগকে আরও অর্থবহ করে তুলতে পারে।
তবে নতুন কোনো উদ্যোগকে সফল করতে হলে শুধু সরকার বা বিআরটিসির ওপর নির্ভর করলেই হবে না। যাত্রীদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। নারী যাত্রীদের প্রতি সম্মান দেখানো, শৃঙ্খলা মেনে চলা এবং গণপরিবহনে অসৌজন্যমূলক আচরণ থেকে বিরত থাকা—এসবও নাগরিক দায়িত্বের অংশ।
একই সঙ্গে গণমাধ্যমেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ভালো উদ্যোগের প্রশংসা যেমন করা প্রয়োজন, তেমনি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তুলে ধরাও প্রয়োজন। কারণ গঠনমূলক সমালোচনা কোনো উদ্যোগকে দুর্বল করে না; বরং সেটিকে আরও কার্যকর করতে সাহায্য করে।
আমি মনে করি, ‘পিংক বাস’ প্রকল্পকে আমরা শুধু একটি পরিবহন প্রকল্প হিসেবে না দেখে
নারীর নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, মর্যাদা ও সমঅধিকারের একটি বৃহত্তর উদ্যোগ হিসেবে দেখতে পারি।
আজ যে উদ্যোগ কয়েকটি রুটে শুরু হলো, আগামী দিনে সেটি যদি দেশের আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, আরও বেশি নারী যদি এর মাধ্যমে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারেন এবং আরও বেশি নারী যদি পরিবহন খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ পান—তাহলে এই উদ্যোগ সত্যিকার অর্থেই সফল হবে।
সরকারের প্রতি আমার প্রত্যাশা থাকবে, এই উদ্যোগ যেন ধারাবাহিকতা হারিয়ে কোনো একসময় কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না হয়ে যায়। বরং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, যাত্রীদের মতামত গ্রহণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রুট ও বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি করে ‘পিংক বাস’কে একটি টেকসই গণপরিবহন ব্যবস্থায় পরিণত করা হোক।
সবশেষে, নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করার এই উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি), পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, চালক, কন্ডাক্টর এবং মাঠপর্যায়ে কাজ করা প্রত্যেককে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন, শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ।
একজন সংবাদকর্মী ও নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি, দেশের মানুষের জন্য যে কোনো ইতিবাচক উদ্যোগকে স্বাগত জানানো আমাদের সবার দায়িত্ব। একই সঙ্গে সেই উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমাদেরও সহযোগিতা করা উচিত।
নারীর নিরাপদ পথচলা মানেই একটি নিরাপদ সমাজের পথে এগিয়ে যাওয়া।
‘পিংক বাস’ সেই পথচলায় একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখন আমাদের প্রত্যাশা—এই পদক্ষেপ আরও বড় হোক, আরও দূর এগিয়ে যাক এবং দেশের প্রতিটি নারী যেন একদিন নিশ্চিন্তে বলতে পারেন—
গণপরিবহন আমার জন্যও নিরাপদ।

