শব্দের আলোয় এক অন্যরকম সন্ধ্যা, জাতীয় প্রেসক্লাব
— আশফাকুজ্জামান
মাসের শেষ দিন। জাতীয় প্রেসক্লাবের তিন তলা। আকরাম খাঁ হল। সেখানে জমে ওঠে এক অন্যরকম সন্ধ্যা। বাইরে শহরের ব্যস্ততা। যানজট, কোলাহল। ব্যস্ত মানুষের ছুটে চলা। আর ভেতরে শব্দের এক অন্য জগৎ। যেখানে শব্দ মানে কবিতা,ভাবনা, জীবন ও সময়কে নতুন করে দেখা।
প্রতি মাসের শেষ তারিখে নিয়ম করে বসে ‘কবিতা পাঠের আসর’। আয়োজন করে জাতীয় প্রেসক্লাব কবিতাপত্র পরিষদ। সংগঠনটির সভাপতি কবি, কথাশিল্পী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাহীন চৌধুরী। টেলিভিশনের টক শোতে যিনি নিয়মিত সমকালীন নানা বিষয়ে কথা বলেন, কবিতার এই আসরেও তাঁকে পাওয়া যায় গভীর মনন ও ভালোবাসা নিয়ে। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কবি ও সংগঠক রফিক হাসান। তাঁর সাবলীল সঞ্চালনায় কবিতা, আলোচনা ও ভাবনার ভেতর তৈরি হয় এক সুন্দর যোগসূত্র।

এ মাসের আসরের আলোচনার বিষয় ছিল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিশ্বভাবনা ও তাঁর সাহিত্য-জীবনের নানা দিক। আলোচনায় অংশ নিই আমি, আশফাকুজ্জামান। নজরুলের কবিতা ও গানে মানুষ, সাম্য, স্বাধীনতা এবং বিশ্বমানবতার যে গভীর আকাঙ্ক্ষা, সে প্রসঙ্গ উঠে আসে আলোচনায়। দেশ ও কালের সীমানা অতিক্রম করে নজরুল কীভাবে মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন, তাঁর সাহিত্য কীভাবে বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, সেসব বিষয়ও আলোচনায় স্থান পায়।
আলোচনার সাথে ছিল প্রায় ৪০ জন কবির কবিতা পাঠ। রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কবিরা এসেছিলেন এই আয়োজনে। ছিলেন কবি আবাম ছালাইউদ্দিন, কামার ফরিদ, আতিকুল সইলাম ও মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আব্দুল মজিদসহ অনেকে।
একের পর এক কবিতায় মুখর হয়ে ওঠে হলরুম। কখনো প্রেম। কখনো রাজনীতি। কখনো জীবনের টানাপোড়েন। কখনো সমাজের বাস্তবতা ও অর্থনীতির কঠিন চিত্র। কবিদের উচ্চারণে উঠে আসে মানুষের আনন্দ, বেদনা, স্বপ্ন ও সংকট।
আলোচনার পরিসরও ছিল বিস্তৃত। বাংলা কবিতা ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের দর্শন নিয়ে কথা বলেন বরেণ্য কবি ও শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন। বাংলা মিথ ও লোকজ সাহিত্য নিয়ে ঋদ্ধ আলোচনা করেন কবি ও সাংবাদিক ড. মাহবুব হাসান। সিনিয়র সাংবাদিক মাহফুজুর রহমান কথা বলেন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে। সমকালীন প্রযুক্তি, সাহিত্য ও মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবনার দরজা খুলে যায়।
মঞ্চের সামনে ও চারপাশের আসনে ছিলেন কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা। তাঁদের উপস্থিতিতে ছোট্ট কক্ষটি যেন আরও বড় হয়ে ওঠে। মনে হয়, কবিতার নিজস্ব একটি দেশ আছে। সেখানে বয়সের বিভাজন নেই। পেশার দূরত্ব নেই। আছে শুধু শব্দের প্রতি ভালোবাসা ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা।
মাসের শেষ দিনটি তাই এখানে শেষের কথা বলে না। বরং কবিতা, চিন্তা ও মানুষের মিলনে শুরু করে আরেকটি নতুন সন্ধ্যার অপেক্ষা।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও সংগঠক

