রীনা রানী তালুকদার : জীবনসংগ্রাম, মানবসেবা ও নারীজাগরণের এক অনন্য অভিযাত্রা — নূরুল হক

by protibimbo
0 মন্তব্য 13 বার পড়া হয়েছে

রীনা রানী তালুকদার : জীবনসংগ্রাম, মানবসেবা ও নারীজাগরণের এক অনন্য অভিযাত্রা
— নূরুল হক

একটি জনপদের পরিচয় কেবল তার ভৌগোলিক সীমানা, নদী, পাহাড় কিংবা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেই জনপদের প্রকৃত পরিচয় নির্মিত হয় তার মানুষের কর্ম, চিন্তা, মনন, মানবিকতা ও অবদানের মধ্য দিয়ে। কোনো ভূখণ্ড যখন যুগে যুগে জ্ঞানী, সাধক, সাহিত্যিক, বিপ্লবী, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিসেবী ও সমাজসংস্কারকের জন্ম দেয়, তখন তার ইতিহাস হয়ে ওঠে বহুমাত্রিক। সেই ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় পরবর্তী প্রজন্মের কাছে একেকটি আলোকবর্তিকা।

চট্টগ্রামের রাউজান তেমনই এক ঐতিহ্যসমৃদ্ধ জনপদ। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, হালদা নদীর প্রবাহ, প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্য, শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশ এবং অসংখ্য কৃতী মানুষের কর্মময় জীবনের মধ্য দিয়ে রাউজান অর্জন করেছে স্বতন্ত্র পরিচয়। এই জনপদ জন্ম দিয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পণ্ডিত, কবি, বিপ্লবী, গবেষক, ধর্মীয় সাধক, শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবকের। তাঁদের কেউ জ্ঞানের সাধনায়, কেউ সাহিত্যচর্চায়, কেউ স্বাধীনতার সংগ্রামে, কেউ ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশে নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। তাঁদেরই উত্তরাধিকারবাহী এই জনপদে রীণা রানী তালুকদারের জীবন ও কর্মকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কারণ তিনি এমন এক মানবিক উদ্যোগের প্রতিনিধিত্ব করেন, যার মূল লক্ষ্য মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অসহায় নারীর হাতে কাজ তুলে দেওয়া, শিশুর শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা এবং ব্যক্তিগত বেদনা ও জীবনের সীমাবদ্ধতাকে সামাজিক কল্যাণের শক্তিতে রূপান্তরিত করা।

রাউজানের ইতিহাসে যাঁদের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ড. বেণীমাধব বড়ুয়া, সংঘরাজ ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথেরো, মহারথী মহাথেরো, বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেন, মহাকবি নবীনচন্দ্র সেন, ভাষাসৈনিক কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী, চট্টলতত্ত্ববিদ আবদুল হক চৌধুরী, ছড়াসাহিত্যিক সুকুমার বড়ুয়া এবং আরও অনেকে। তাঁদের প্রত্যেকের কর্মক্ষেত্র আলাদা, অর্জনের ধরনও ভিন্ন। ড. বেণীমাধব বড়ুয়া আন্তর্জাতিক জ্ঞানজগতে রাউজানের নাম প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মাস্টারদা সূর্য সেন স্বাধীনতার সংগ্রামে আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল প্রতীক। নবীনচন্দ্র সেন বাংলা সাহিত্যে স্বদেশপ্রেম ও ইতিহাসচেতনার এক স্মরণীয় কণ্ঠস্বর। মাহবুব উল আলম চৌধুরী ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর কবিতা ও সাংস্কৃতিক ভূমিকার জন্য স্মরণীয়। আবদুল হক চৌধুরী আঞ্চলিক ইতিহাস ও সংস্কৃতির গবেষণায় অসামান্য অবদান রেখেছেন। সংঘরাজ জ্ঞানশ্রী মহাথেরো ধর্মীয় সাধনা, শিক্ষা ও মানবকল্যাণে দীর্ঘ জীবন উৎসর্গ করেছেন।

Banner

এইসব মানুষের কর্ম ও কৃতিত্বের সঙ্গে রীণা রানী তালুকদারের কাজের প্রকৃতি এক নয়। তাঁকে তাঁদের সঙ্গে একই মাপকাঠিতে বিচার করারও প্রয়োজন নেই। বরং রাউজানের বহুমাত্রিক ঐতিহ্যের মধ্যে তাঁর অবস্থান বুঝতে হবে তাঁর নিজস্ব কর্মক্ষেত্রের আলোকে। তিনি কাজ করছেন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কাছাকাছি, যেখানে একজন অসহায় নারীকে আত্মনির্ভর করে তোলা, একটি শিশুর শিক্ষার পথ খুলে দেওয়া কিংবা অসুস্থ দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোই মানবিকতার সবচেয়ে বাস্তব প্রকাশ। একটি জনপদের ইতিহাস শুধু তার অতীতের মনীষীদের স্মৃতিতে গৌরবান্বিত হয় না; বর্তমানের কর্মনিষ্ঠ মানুষেরাও সেই ইতিহাসকে নতুন অর্থ দেন। রীণা রানী তালুকদারের জীবন সেই ধারারই একটি সমকালীন অধ্যায়।

রীণা রানী তালুকদারের জন্ম চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের আবুরখীল গ্রামে। পিতা ফণীভূষণ বড়ুয়া, মাতা পরীমলাময়ী বড়ুয়া। হালদা নদীর পাড়ের এই গ্রাম তাঁর জন্মভূমি, শৈশবের স্মৃতি এবং আত্মপরিচয়ের গভীর ভিত্তি। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি বলেন, তিনি হালদা নদীর পাড়ের মেয়ে। এই পরিচয়ের মধ্যে শুধু জন্মস্থানের উল্লেখ নেই; আছে নিজের মাটির প্রতি ভালোবাসা, শৈশবের স্মৃতির প্রতি মমতা এবং শিকড়ের সঙ্গে এক অবিচ্ছেদ্য আত্মিক সম্পর্ক।

হালদা নদী বাংলাদেশের প্রকৃতি ও পরিবেশের এক অনন্য সম্পদ। দেশীয় কার্পজাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র হিসেবে নদীটির গুরুত্ব বিশেষভাবে স্বীকৃত। নদীর স্রোত, সবুজ গ্রাম, মানুষের সহজ-সরল জীবনযাপন এবং প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের যে পরিবেশে রীণা রানীর শৈশব কেটেছে, তা তাঁর জীবনবোধের প্রাথমিক ভিত্তি নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে হয়। আবুরখীলের গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা তাঁর জীবনকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত করেছিল। গ্রামের প্রকৃতি, পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে তিনি জীবনের সহজ পাঠ পেয়েছিলেন।

রাউজানের এই প্রকৃতিনির্ভর জনপদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেবল জন্মসূত্রের নয়; এটি স্মৃতি, অনুভব ও দায়বদ্ধতার সম্পর্ক। পরবর্তী সময়ে যখন তিনি দরিদ্র, অসহায় ও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজে যুক্ত হন, তখন জন্মভূমির মানুষের প্রতি তাঁর মমতা বিশেষভাবে প্রকাশ পায়। নিজের গ্রামের মানুষের শিক্ষার সুযোগ, চিকিৎসা, সামাজিক নিরাপত্তা ও আর্থিক সংকটের বিষয়েও তিনি সচেতন থেকেছেন। জন্মভূমির সঙ্গে এই আত্মিক সম্পর্ক তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

অল্প বয়সেই তাঁর বিয়ে হয়। ফলে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের স্বপ্ন পূর্ণতা পায়নি। জীবনের শুরুতেই সংসার, পরিবার ও সন্তানদের দায়িত্ব তাঁর সামনে এসে দাঁড়ায়। আমাদের সমাজে বহু নারীর জীবনেই এমন ঘটনা ঘটে। পারিবারিক ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে তাঁদের শিক্ষা মাঝপথে থেমে যায়, ব্যক্তিগত স্বপ্নগুলো সংকুচিত হয়ে আসে। কিন্তু শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া মানেই যে জ্ঞান, উপলব্ধি কিংবা কর্মক্ষমতার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়, রীণা রানী তালুকদারের জীবন তার একটি উদাহরণ।

নিজের জীবনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সীমিত থাকলেও সন্তানদের শিক্ষার বিষয়ে তিনি ছিলেন সচেতন ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাঁর দুই সন্তানকে দেশের স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জনের সুযোগ করে দিতে তিনি নিরলস চেষ্টা করেছেন। নিজের জীবনের অপূর্ণতা যেন সন্তানদের ভবিষ্যতের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেই চিন্তাই তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে। এখানে তাঁর মাতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশিত হয়। তিনি শুধু সন্তানদের লালন-পালন করেননি; তাঁদের শিক্ষিত, আত্মনির্ভর ও প্রতিষ্ঠিত করে তোলার জন্যও দায়িত্ব পালন করেছেন।

তাঁর জীবনসংগ্রামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মজীবনের শুরু থেকেই মানুষের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা। ১৯৮৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তিনি সিডব্লিউএফপি (CWFP) নামের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় যোগ দেন। সেখানে প্রায় চৌদ্দ থেকে পনেরো বছর কাজ করেন। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর কর্মক্ষেত্র ছিল সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে বস্তিবাসী মানুষ, শিশু ও অসচ্ছল পরিবার। শিশুস্বাস্থ্য, পরিবার উন্নয়ন, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট এবং দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নের বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন।

মাঠপর্যায়ে কাজ করার ফলে সমাজের সেই বাস্তব চিত্র তাঁর সামনে উন্মোচিত হয়, যা অনেক সময় শহরের সচ্ছল জীবনের আড়ালে থেকে যায়। বস্তির শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির সমস্যা, শিক্ষার অনিশ্চয়তা, দরিদ্র পরিবারের নারীদের অসহায়ত্ব এবং জীবিকার সংকট তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। মানুষের দুঃখ তখন তাঁর কাছে কোনো বিমূর্ত ধারণা ছিল না; ছিল পরিচিত মুখ, বাস্তব পরিবার এবং প্রতিদিনের সংগ্রামের গল্প। উন্নয়নমূলক কাজের এই অভিজ্ঞতা তাঁর মধ্যে সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ আরও গভীর করে।

তিনি উপলব্ধি করেন, উন্নয়ন মানে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং জীবনের সুযোগ নিশ্চিত করা। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের অবস্থার পরিবর্তন ছাড়া কোনো সমাজের উন্নয়ন পূর্ণতা পেতে পারে না। কর্মক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা, কাজের দক্ষতা এবং অন্যদের উৎসাহিত করার ক্ষমতার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি প্রতিবছর একাধিক পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন বলে জানা যায়। ক্লিনিক্যাল পারফরম্যান্স, কাজের দক্ষতা এবং প্রেরণাদানমূলক ভূমিকার জন্য পাওয়া এসব স্বীকৃতি তাঁর কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

পরবর্তী সময়ে তিনি ন্যাশনাল লাইফ ইনসুরেন্সের  এজেন্সি ম্যানেজার হিসেবে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষমতাকে আরও সমৃদ্ধ করে। উন্নয়ন সংস্থার মাঠপর্যায়ের কাজ এবং ব্যবস্থাপনাগত দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে তিনি ভবিষ্যতে নিজস্ব সামাজিক উদ্যোগ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তব জ্ঞান অর্জন করেন। মানুষের সঙ্গে কাজ করা, সমস্যা বোঝা, দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং একটি উদ্যোগকে সংগঠিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার যে অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেছিলেন, তা পরবর্তী জীবনে তাঁর সামাজিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় শুরু হয় স্বামীর অসুস্থতা ও মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। ২০১০ সালের ১৭ মার্চ তাঁর স্বামীর ক্যানসার শনাক্ত হয়। তখন রোগটি চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। দীর্ঘ চিকিৎসা, উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তা এবং প্রিয়জনকে হারানোর আশঙ্কার মধ্য দিয়ে পরিবারকে সময় কাটাতে হয়। অবশেষে ২০১১ সালের ৫ মে তাঁর স্বামীর মৃত্যু ঘটে। অল্প বয়সে জীবনসঙ্গীকে হারানোর এই ঘটনা রীণা রানী তালুকদারের জীবনে গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করে।

দীর্ঘ সংসারজীবনের স্মৃতি, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং একাকিত্ব তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। কয়েক বছর ধরে তিনি এই শোক ও মানসিক সংকটের সঙ্গে লড়াই করেছেন। মানুষের জীবনে কিছু ক্ষতি থাকে, যা কোনো সান্ত্বনাতেই সম্পূর্ণ পূরণ হয় না। জীবনসঙ্গীকে হারানো শুধু একজন মানুষের অনুপস্থিতি নয়; এর সঙ্গে বদলে যায় প্রতিদিনের অভ্যাস, পারিবারিক বাস্তবতা, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা এবং জীবনের অনুভূতিও। রীণা রানী তালুকদারের জীবনেও সেই গভীর পরিবর্তন এসেছিল।

তবু মানুষের জীবনে কখনো কখনো নতুন কোনো সম্পর্ক, নতুন কোনো দায়িত্ব কিংবা একটি শিশুর হাসি আবার বেঁচে থাকার অর্থ ফিরিয়ে দেয়। ২০১৪ সালের জুন মাসে তাঁর বড় ছেলের ঘরে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। নাতির আগমন তাঁর জীবনে নতুন আনন্দ ও আশার সঞ্চার করে। তিনি শিশুটির মধ্যে স্বামীর স্মৃতির এক কোমল প্রতিচ্ছবি অনুভব করেন। দীর্ঘদিনের শোকের মধ্যে এই নতুন সম্পর্ক তাঁর জীবনে এক ধরনের মানসিক আশ্রয় হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে তিনি নিজের জীবনকে নতুনভাবে সাজানোর কথা ভাবতে শুরু করেন। ব্যক্তিগত বেদনার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে অন্য মানুষের দুঃখ লাঘবের মধ্য দিয়ে জীবনের নতুন উদ্দেশ্য খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করেন।

এই পরিবর্তন তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ব্যক্তিগত শোকের অভিজ্ঞতা তাঁকে অন্য মানুষের কষ্টের প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তোলে। তিনি বুঝতে পারেন, মানুষের জীবনে দুঃখ ও সংকট অনিবার্য হলেও অন্য মানুষের সহযোগিতা অনেক সময় সেই সংকট অতিক্রম করার শক্তি জোগায়। নিজের জীবনে যে শূন্যতা ও অসহায়ত্ব অনুভব করেছেন, অন্য কোনো মানুষ যেন সেই অবস্থায় একেবারে একা না থাকেন, এমন একটি মানবিক আকাঙ্ক্ষা তাঁর মধ্যে ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

স্বামীর মৃত্যুর পর বিমা থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ নিয়েও তিনি একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজন কিংবা আরাম-আয়েশের কথা না ভেবে তিনি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার জন্য অর্থ ব্যয় করার কথা ভাবেন। ঢাকার কমলাপুরের আনন্দ আলো স্কুলে তিনি এক লাখ টাকা অনুদান প্রদান করেন। তাঁর দুই ছেলেকে না জানিয়েই তিনি এই অর্থ দান করেছিলেন। এই অনুদান ছিল সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর একটি আন্তরিক প্রয়াস। অর্থের অঙ্কের চেয়েও এখানে বড় হয়ে ওঠে তাঁর মানসিকতা: নিজের জীবনের কঠিন সময়ে পাওয়া অর্থের একটি অংশ তিনি অন্যের ভবিষ্যৎ নির্মাণে ব্যয় করতে চেয়েছেন। একজন শিশুর শিক্ষার সুযোগ তৈরি করার মধ্যেই তিনি মানবিক দায়িত্বের অর্থ খুঁজে পেয়েছিলেন।

২০১২ সালে তিনি ‘উজ্জ্বললিনা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’ নামে একটি কল্যাণমূলক উদ্যোগ প্রতিষ্ঠা করেন। স্বামীর স্মৃতি এবং মানুষের জন্য কিছু করার আকাঙ্ক্ষা এই উদ্যোগের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। ট্রাস্টটির লক্ষ্য ছিল গ্রামের দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি প্রদান, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশুদের বিকল্প শিক্ষার সুযোগ তৈরিতে সহায়তা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর কার্যক্রমে যুক্ত হয় আরও নানা ধরনের মানবিক সহায়তা।

কিডনি রোগী, ক্যানসার আক্রান্ত ব্যক্তি, আর্থিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থী এবং অসচ্ছল নারীদের সহযোগিতার জন্য তিনি উদ্যোগ গ্রহণ করেন। দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রেও সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার ব্যবস্থা করেন। আবুরখীল গ্রামের মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এই ট্রাস্টের কার্যক্রমে বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়। নিজের জন্মভূমির মানুষের দুঃখ-কষ্ট তিনি ভুলে যাননি। প্রতিবছর অন্তত পাঁচ থেকে সাতজন অসহায় মানুষকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করার উদ্যোগ তাঁর এই শিকড়মুখী মানবিকতার পরিচয় বহন করে। কখনো চিকিৎসার প্রয়োজনে, কখনো শিক্ষার ব্যয় মেটাতে, কখনো কোনো দরিদ্র পরিবারের মেয়ের বিয়ের জন্য তিনি সহযোগিতার ব্যবস্থা করেন।

এই সহায়তার পরিমাণ হয়তো সব সময় বড় নয়, কিন্তু প্রয়োজনের মুহূর্তে তা একটি পরিবারের জন্য আশার কারণ হয়ে উঠতে পারে। মানবসেবার প্রকৃত মূল্য অনেক সময় অর্থের অঙ্কে নয়, মানুষের সংকটের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর আন্তরিকতায় নির্ধারিত হয়। একজন অসুস্থ মানুষের চিকিৎসায় সহযোগিতা, একটি শিশুর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ কিংবা কোনো দরিদ্র পরিবারের মেয়ের বিয়েতে সহায়তা—প্রতিটি উদ্যোগের পেছনে রয়েছে মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ। উজ্জয়নী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মাধ্যমে রীণা রানী তালুকদার সেই দায়িত্ববোধকে একটি সংগঠিত কাঠামো দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

একই সময়ে তিনি বৃহত্তর বৌদ্ধ সমাজের একটি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের সঙ্গেও যুক্ত হন। সেখানে নির্বাহী সদস্য হিসেবে তাঁর দায়িত্ব রয়েছে। ড. কনক বড়ুয়া ওই ট্রাস্টের চেয়ারম্যান। এই সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ফলে তিনি বৃহত্তর সামাজিক ও সম্প্রদায়ভিত্তিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ পান। ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি সম্মিলিত প্রাতিষ্ঠানিক প্রচেষ্টার গুরুত্ব তিনি উপলব্ধি করেন। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সহযোগিতা, সংগঠিত উদ্যোগ এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধের মধ্য দিয়ে কল্যাণমূলক কাজকে কীভাবে বিস্তৃত করা যায়, সে অভিজ্ঞতাও তাঁর অর্জিত হয়।

তবে রীণা রানী তালুকদারের জীবন ও কর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং স্বতন্ত্র অধ্যায় হলো নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার প্রয়াস। দীর্ঘদিন উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে তিনি নারীর অসহায়ত্বের নানা বাস্তব চিত্র প্রত্যক্ষ করেছেন। সমাজের বহু নারী দারিদ্র্য, পারিবারিক নির্যাতন, সামাজিক অবহেলা এবং অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার কারণে নিজেদের জীবন সম্পর্কে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। অনেক নারী স্বামীর ওপর কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকেন। নিজের উপার্জনের সুযোগ না থাকায় তাঁরা অন্যায় ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহসও হারিয়ে ফেলেন। অনেকেরই কাজ করার সামর্থ্য ও আগ্রহ রয়েছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, পুঁজি, সুযোগ কিংবা সামাজিক সমর্থনের অভাবে তাঁরা সেই সামর্থ্য কাজে লাগাতে পারেন না।

এই বাস্তবতা রীণা রানী তালুকদারকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। তিনি উপলব্ধি করেন, নারীর প্রকৃত মুক্তির জন্য শুধু সহানুভূতি বা সাময়িক আর্থিক সহায়তা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে একজন নারী নিজের দক্ষতা তৈরি করতে পারবেন, নিজের উপার্জনের পথ খুঁজে পাবেন এবং আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার শক্তি অর্জন করবেন। তাঁর কাছে নারীকল্যাণের অর্থ কেবল অনুদান প্রদান নয়; বরং একজন নারীর হাতে কাজ তুলে দেওয়া, তাঁকে দক্ষ করে তোলা এবং নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সামর্থ্য গড়ে তোলা।

তিনি বিশ্বাস করেন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা একজন নারীর আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। যে নারী নিজের উপার্জনের মাধ্যমে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারেন, তিনি পরিবারে নিজের অবস্থান সম্পর্কে নতুন করে সচেতন হন। সন্তানদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর ভূমিকা বাড়ে। নিজের প্রয়োজন সম্পর্কে কথা বলার সাহসও অর্জিত হয়। অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা তাই কেবল অর্থ উপার্জনের বিষয় নয়; এটি আত্মমর্যাদা, নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ২০১৪ সালে তিনি মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং প্রশিক্ষণ গ্রহণের উদ্যোগ নেন। তিন মাসের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে তিনি ভালো ফলাফল অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নারীদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। এই প্রশিক্ষণ তাঁর কাছে শুধু একটি সনদ অর্জনের বিষয় ছিল না; বরং নিজের সামাজিক উদ্যোগকে আরও কার্যকর ও সুসংগঠিত করার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

প্রশিক্ষণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তিনি ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দরিদ্র নারী ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। উত্তরার দক্ষিণখান, দিয়াবাড়ি, বনশ্রী, খিলগাঁও, বাসাবো এবং সাভারসহ বিভিন্ন এলাকায় তাঁর কর্মকাণ্ড বিস্তৃত হয়। পথশিশুদের জীবন, বস্তিবাসী নারীদের সংকট, স্বল্প আয়ের পরিবারের অসহায়ত্ব এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারীদের বাস্তবতা তাঁর কাজের অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে। মাসকট স্কুলের আয়া ও কর্মজীবী নারীদের সঙ্গেও তিনি কাজ করেন। ঢাকার বাইরেও ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন এলাকার নারীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়।

এই বিস্তৃত অভিজ্ঞতা তাঁকে বুঝতে সাহায্য করে যে নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার প্রয়োজন কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল কিংবা শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাংলাদেশের বহু পরিবারের বাস্তব প্রয়োজন। শহরের বস্তি থেকে শুরু করে প্রান্তিক গ্রাম, স্বল্প আয়ের পরিবার থেকে শুরু করে নিরক্ষর নারী—বিভিন্ন পরিসরে নারীর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা ও কাজের সুযোগের অভাব তাঁকে একই বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। তিনি বুঝেছেন, একজন নারীকে শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়াই যথেষ্ট নয়; প্রশিক্ষণের পর তাঁর কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে, নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আয় করার পথ দেখাতে হবে এবং প্রয়োজনে তাঁকে অন্য নারীদের প্রশিক্ষক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

নারীদের সেলাই ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তোলার পরিকল্পনা ধীরে ধীরে তাঁর কাছে একটি সুসংগঠিত সামাজিক কর্মসূচির রূপ পেতে থাকে। তিনি মনে করেন, একজন নারী সেলাই কিংবা অন্য কোনো কারিগরি কাজে দক্ষ হয়ে উঠলে তিনি শুধু নিজের জীবিকার পথ তৈরি করতে পারেন না, অন্য নারীদেরও প্রশিক্ষণ দিতে পারেন। একজন প্রশিক্ষিত নারী যদি পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকজন নারীকে প্রশিক্ষণ দিতে পারেন, তাহলে উদ্যোগটির প্রভাব বহুগুণে বিস্তৃত হতে পারে। এই ধারণা তাঁর কর্মপরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে। একজনের অর্জিত জ্ঞান অন্যের কাছে পৌঁছাবে, একজনের আত্মনির্ভরতা আরও কয়েকজনের আত্মনির্ভরতার পথ তৈরি করবে। এভাবে স্থানীয় পর্যায়ে নারীদের মধ্য থেকেই নতুন নেতৃত্ব ও প্রশিক্ষণদাতা তৈরি হতে পারে।

দীর্ঘ প্রস্তুতি, অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ এবং নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার স্বপ্নের সম্মিলিত ফল হিসেবে ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ধ্রুবতারা ওমেন্স ফাউন্ডেশন’। নামের মধ্যেই রয়েছে এক গভীর প্রতীকী তাৎপর্য। ধ্রুবতারা যেমন অন্ধকার আকাশে পথিককে দিকনির্দেশনা দেয়, তেমনি এই ফাউন্ডেশনের লক্ষ্য হলো জীবনের অনিশ্চয়তা ও অসহায়ত্বের মধ্যে থাকা নারীদের সামনে আত্মনির্ভরতার পথ উন্মুক্ত করা। রীণা রানী তালুকদারের কাছে এটি কেবল একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠার ঘটনা নয়; বরং বহু বছরের অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত উপলব্ধি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রয়াস।

ধ্রুবতারা ওমেন্স ফাউন্ডেশনের মূল লক্ষ্য দরিদ্র, স্বল্পশিক্ষিত ও নিরক্ষর নারীদের সেলাই এবং বিভিন্ন কারিগরি কাজে প্রশিক্ষণ দেওয়া, তাঁদের দক্ষতা তৈরি করা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং নিজের উপার্জনের মাধ্যমে সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ সৃষ্টি করা। বিশেষ করে যেসব নারী আর্থিকভাবে অসচ্ছল, যাঁদের জীবনে কাজের সুযোগ সীমিত, যাঁরা পারিবারিক নির্ভরশীলতার কারণে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন, তাঁদের পাশে দাঁড়ানো এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

ফাউন্ডেশনের ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি সহজ অথচ গভীর সত্য: একজন নারীকে সাহায্য করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তাঁকে এমন দক্ষতা দেওয়া, যার মাধ্যমে তিনি নিজের জীবন নিজেই পরিচালনা করতে পারেন। সাময়িক অনুদান হয়তো কোনো মুহূর্তের সংকট দূর করতে পারে, কিন্তু দক্ষতা ও কাজের সুযোগ একজন নারীর দীর্ঘমেয়াদি জীবনে পরিবর্তন আনতে সক্ষম। নিজের হাতে তৈরি পোশাক কিংবা অন্য কোনো পণ্য বিক্রি করে একজন নারী যখন আয় করতে পারেন, তখন তাঁর মধ্যে আত্মবিশ্বাস জন্মায়। তিনি পরিবারের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে অংশ নিতে পারেন, সন্তানদের শিক্ষায় অবদান রাখতে পারেন এবং নিজের জীবনের প্রতি নতুন করে আস্থা ফিরে পান।

ধ্রুবতারা ওমেন্স ফাউন্ডেশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা হলো প্রশিক্ষক তৈরি করা। একজন দক্ষ নারীকে প্রশিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলা গেলে তিনি পরবর্তী প্রকল্পে অন্য নারীদের প্রশিক্ষণ দিতে পারেন। এতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং স্থানীয় পর্যায়ে নারীদের মধ্য থেকেই নতুন নেতৃত্ব তৈরি হয়। একজন নারী কেবল নিজের জীবনের পরিবর্তন ঘটান না, অন্য নারীর জীবনেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেন। এই উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে সামাজিক সংহতি, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং নারীর ক্ষমতায়নের একটি বাস্তবধর্মী দর্শন।

নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে অনেক আলোচনা হয়, কিন্তু বাস্তব জীবনে তার অর্থ কী, তা বোঝা যায় একজন অসহায় নারী যখন নিজের উপার্জনের মাধ্যমে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারেন। যে নারী একসময় সামান্য অর্থের জন্য অন্যের মুখাপেক্ষী ছিলেন, তিনি যখন নিজের শ্রমের মূল্য পান, তখন তাঁর আত্মবিশ্বাস বদলে যায়। পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর অংশগ্রহণ বাড়ে। সন্তানদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর ভূমিকা আরও দৃঢ় হয়। তিনি নিজের প্রয়োজন সম্পর্কে কথা বলার সাহস অর্জন করেন। এই পরিবর্তন শুধু একজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; পরিবারের ভেতরেও তার প্রভাব পড়ে। ধ্রুবতারা ওমেন্স ফাউন্ডেশনের লক্ষ্য এই বাস্তব পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করা।

রীণা রানী তালুকদারের কাছে একজন নারীকে স্বাবলম্বী করে তোলা মানে তাঁকে অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্তির পথ দেখানো। তাঁর চিন্তায় নারীকল্যাণ কোনো দয়ার বিষয় নয়, এটি অধিকার ও মর্যাদার বিষয়। তিনি চান না, কোনো নারী শুধু অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে অন্যের অবহেলা কিংবা নির্যাতন নীরবে সহ্য করতে বাধ্য হন। নিজের হাতে কাজ থাকলে, নিজের উপার্জন থাকলে একজন নারী অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবনকে মোকাবিলা করতে পারেন। এ কারণেই তাঁর উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে প্রশিক্ষণ, দক্ষতা, কাজের সুযোগ এবং উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার সম্ভাবনা।

এই পর্যায়ে রীণা রানী তালুকদারের জীবনকে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার আলোকে বিচার করা প্রয়োজন। আমাদের সমাজে নারীশিক্ষা ও নারীস্বাধীনতা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। আইন, নীতি, অধিকার ও উন্নয়ন পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু সমাজের প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং নিম্ন আয়ের পরিবারের অনেক নারীর কাছে এসব আলোচনা তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তাঁদের হাতে বাস্তব কাজের সুযোগ পৌঁছায়। প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং উপার্জনের সক্ষমতা তাঁদের জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করে। ধ্রুবতারা ওমেন্স ফাউন্ডেশনের মতো উদ্যোগের তাৎপর্য এখানেই। এটি নারীর ক্ষমতায়নকে কেবল ধারণার পর্যায়ে না রেখে দক্ষতা ও কর্মের মাধ্যমে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করে।

রাউজানের মনীষা-ঐতিহ্যের সঙ্গে রীণা রানী তালুকদারের কাজের সম্পর্কও এই জায়গায় তাৎপর্যপূর্ণ। ড. বেণীমাধব বড়ুয়া জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে বিশ্বপরিসরে রাউজানের পরিচয় তুলে ধরেছেন। সংঘরাজ ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথেরো ধর্মীয় সাধনা, শিক্ষা ও মানবকল্যাণের মাধ্যমে মানুষের জীবনে অবদান রেখেছেন। মাস্টারদা সূর্য সেন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় জীবন উৎসর্গ করেছেন। কবি নবীনচন্দ্র সেন সাহিত্য ও কাব্যের মাধ্যমে বাঙালির মননজগতে স্থায়ী স্থান অর্জন করেছেন। মাহবুব উল আলম চৌধুরী ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্বের কবিতার জন্য স্মরণীয়। আবদুল হক চৌধুরী চট্টগ্রামের ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতির গবেষণায় এক স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করেছেন। সুকুমার বড়ুয়া সাধারণ মানুষের জীবন, হাসি-কান্না ও অভিজ্ঞতাকে ছড়ার শিল্পে রূপ দিয়েছেন।

এইসব ব্যক্তিত্বের কর্মক্ষেত্র আলাদা হলেও তাঁদের অবদান একটি বৃহত্তর ঐতিহ্যের অংশ। তাঁদের কেউ জ্ঞান দিয়ে, কেউ সাহিত্য দিয়ে, কেউ আত্মত্যাগ দিয়ে, কেউ গবেষণা দিয়ে, কেউ ধর্মীয় ও মানবিক সাধনা দিয়ে মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করেছেন। রীণা রানী তালুকদার সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন মানবিক দায়িত্ববোধ ও নারীকল্যাণের মধ্য দিয়ে। তাঁর কাজের গুরুত্ব এই যে, তিনি সমাজের এমন একটি অংশকে কেন্দ্র করে নিজের কর্মপরিকল্পনা গড়ে তুলেছেন, যাদের কণ্ঠস্বর অনেক সময় সামাজিক আলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না: দরিদ্র, নির্যাতিত, স্বল্পশিক্ষিত ও অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল নারী।

একটি জনপদের গৌরব কেবল অতীতের মনীষীদের স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকলে সেই গৌরব জীবন্ত থাকে না। সেই ঐতিহ্যকে বর্তমানের মানুষের কাজের মধ্য দিয়ে নতুন করে অর্থবহ করে তুলতে হয়। রাউজানের ইতিহাসে যেমন পাণ্ডিত্য, সাহিত্য, বিপ্লব ও ধর্মীয় সাধনার উজ্জ্বল অধ্যায় রয়েছে, তেমনি সমাজসেবা ও মানবকল্যাণের ধারাও রয়েছে। রীণা রানী তালুকদার সেই ধারায় যুক্ত হয়েছেন নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কল্যাণের কর্মসূচি নিয়ে। তাঁর কাজের বিশেষত্ব হলো, তিনি মানবসেবাকে কেবল দান-অনুদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; মানুষের সক্ষমতা তৈরি করার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন।

তাঁর প্রতিষ্ঠিত উজ্জয়নী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট এবং ধ্রুবতারা ওমেন্স ফাউন্ডেশনের কর্মপরিকল্পনা দুটি ভিন্ন পরিসরে কাজ করলেও তাদের অন্তর্নিহিত মানবিক লক্ষ্য একসূত্রে গাঁথা। একটি উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি শিক্ষার্থী, রোগী, অসচ্ছল পরিবার ও গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন; অন্যটির মাধ্যমে নারীদের দক্ষতা ও আত্মনির্ভরতার পথ তৈরি করতে চাইছেন। প্রথমটি মানুষের তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় সহায়তার ক্ষেত্র তৈরি করে, দ্বিতীয়টি দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা গড়ে তোলার চেষ্টা করে। এই দুই ধরনের উদ্যোগের সমন্বয়ে তাঁর মানবসেবার দর্শন আরও পূর্ণতা পেয়েছে।

তবে কোনো সামাজিক প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সাফল্য শুধু তার প্রতিষ্ঠার তারিখ কিংবা ঘোষিত উদ্দেশ্যে নির্ধারিত হয় না। সাফল্য নির্ভর করে তার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা, প্রশিক্ষণের গুণগত মান, উপকারভোগীদের বাস্তব অগ্রগতি, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং সমাজের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ওপর। ধ্রুবতারা ওমেন্স ফাউন্ডেশনের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীদের জন্য স্থায়ী বা নিয়মিত আয়ের সুযোগ তৈরি করা, তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা, প্রশিক্ষক তৈরির ব্যবস্থা বিস্তৃত করা এবং কার্যক্রমের ফলাফল নথিবদ্ধ করা। এতে শুধু প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতাই বাড়বে না, নারীদের জীবনে যে পরিবর্তন আনার স্বপ্ন নিয়ে এই উদ্যোগের জন্ম, তার বাস্তব মূল্যায়নও সম্ভব হবে। রীণা রানী তালুকদারের উদ্যোগকে আরও কার্যকর ও স্থায়ী করতে সমাজের সহযোগিতা, স্থানীয় নেতৃত্বের সম্পৃক্ততা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

একজন মানুষের জীবনকে মূল্যায়ন করতে গেলে তাঁর অর্জনের পাশাপাশি প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতাকেও বিবেচনায় নিতে হয়। রীণা রানী তালুকদারের জীবন মসৃণ ছিল না। অল্প বয়সে সংসার, উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া, স্বামীর দীর্ঘ অসুস্থতা ও মৃত্যু, মানসিক বিপর্যয় এবং জীবনের নানা অনিশ্চয়তা তাঁকে বারবার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাগুলোকে তিনি কেবল নিজের দুঃখের স্মৃতি হিসেবে ধরে রাখেননি; অন্য মানুষের জীবনে পরিবর্তনের প্রেরণায় রূপান্তরিত করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর জীবনসংগ্রামের এই দিকটিই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দাবি করে।

মানবসেবার ইতিহাসে অনেক বড় উদ্যোগের সূচনা হয়েছে ব্যক্তিগত উপলব্ধি থেকে। কেউ নিজের জীবনের কোনো অভিজ্ঞতা থেকে মানুষের কষ্ট বুঝেছেন, কেউ প্রিয়জনকে হারিয়ে অন্যের জীবনে আশ্রয় হয়ে উঠেছেন, কেউ নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই অন্যের সম্ভাবনা তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। রীণা রানী তালুকদারের জীবনেও সেই মানবিক উপলব্ধির প্রতিফলন রয়েছে। স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর মানসিক বিপর্যয়, নাতির আগমনে জীবনের প্রতি নতুন করে ফিরে আসা, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য অনুদান, গ্রামের মানুষের কল্যাণে উজ্জয়নী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা এবং নারীর আত্মনির্ভরতার জন্য ধ্রুবতারা ওমেন্স ফাউন্ডেশন গড়ে তোলা—এই ঘটনাগুলো আলাদা আলাদা নয়। এগুলো একটি দীর্ঘ জীবনযাত্রার ধারাবাহিক অধ্যায়।

একটি শিশুর শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা, একজন ক্যানসার বা কিডনি রোগীর পাশে দাঁড়ানো, কোনো দরিদ্র পরিবারের মেয়ের বিয়েতে সহায়তা করা কিংবা একজন অসহায় নারীকে সেলাই শিখিয়ে উপার্জনের পথ দেখানো—প্রতিটি কাজের সামাজিক গুরুত্ব রয়েছে। এসব কাজ হয়তো সব সময় সংবাদপত্রের বড় শিরোনাম হয় না, কিংবা জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত হয় না। কিন্তু যাঁর জীবনে এই সহায়তা পৌঁছায়, তাঁর কাছে তা হতে পারে বেঁচে থাকার নতুন অবলম্বন। একজন নারী যখন নিজের উপার্জনে সন্তানকে পড়াতে পারেন, তখন তাঁর সাফল্যের সঙ্গে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎও বদলে যায়। এই ছোট ছোট পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবই সমাজের বৃহত্তর পরিবর্তনের ভিত্তি।

রীণা রানী তালুকদারের জীবন তাই কেবল একজন নারীর ব্যক্তিগত সংগ্রামের কাহিনি নয়; এটি শোক থেকে শক্তি অর্জন, সীমাবদ্ধতা অতিক্রম এবং মানবকল্যাণের মধ্য দিয়ে জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়ার এক অনুপ্রেরণামূলক অধ্যায়। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছা থাকলে প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগের সীমাবদ্ধতা কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিকূলতা সবকিছুকে অতিক্রম করার চেষ্টা করা যায়। তিনি নিজের জীবনে যে শিক্ষা পাননি, সন্তানদের জীবনে তা নিশ্চিত করতে চেয়েছেন। যে নিরাপত্তা ও সহায়তার অভাব তিনি অন্য নারীদের জীবনে দেখেছেন, তা দূর করার জন্য কাজ করতে চেয়েছেন। যে শোক তাঁকে দীর্ঘদিন আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, সেই শোকের মধ্য থেকেই তিনি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নতুন শক্তি খুঁজে নিয়েছেন।

রাউজানের হালদা নদীর পাড়ের আবুরখীল গ্রাম থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা তাই এক ব্যক্তির জীবনের সীমানা অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবিক তাৎপর্য অর্জন করেছে। ড. বেণীমাধব বড়ুয়ার জ্ঞানসাধনা, জ্ঞানশ্রী মহাথেরোর ধর্মীয় ও সমাজকল্যাণমূলক জীবন, মাস্টারদা সূর্য সেনের আত্মত্যাগ, নবীনচন্দ্র সেনের সাহিত্যকীর্তি, মাহবুব উল আলম চৌধুরীর ভাষা আন্দোলনের চেতনা এবং আবদুল হক চৌধুরীর ইতিহাসচর্চা রাউজানের ইতিহাসকে নানা মাত্রায় সমৃদ্ধ করেছে। সেই ইতিহাসের বর্তমান পর্বে রীণা রানী তালুকদারের অবদানকে দেখতে হবে তাঁর নিজস্ব কর্মক্ষেত্রের আলোকে। তিনি পাণ্ডিত্যের আসনে বসেননি, বিপ্লবের নেতৃত্ব দেননি, বৃহৎ সাহিত্যকীর্তি রচনা করেননি। তিনি কাজ করছেন মানুষের জীবনের কাছাকাছি, যেখানে একজন অসহায় নারীকে আত্মনির্ভর করে তোলা, একটি শিশুর শিক্ষার পথ খুলে দেওয়া কিংবা অসুস্থ দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোই মানবিকতার সবচেয়ে বাস্তব প্রকাশ।

একটি জনপদের ইতিহাস কেবল তার অতীতের মহাপুরুষদের স্মৃতিতে গৌরবান্বিত হয় না; বর্তমানের কর্মনিষ্ঠ মানুষেরাও সেই ইতিহাসকে নতুন অর্থ দেন। রীণা রানী তালুকদার তাঁর জীবনসংগ্রাম, মানবিক উদ্যোগ এবং ধ্রুবতারা ওমেন্স ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সেই অর্থ নির্মাণের চেষ্টা করছেন। তাঁর স্বপ্ন, একজন নারী যেন নিজের উপার্জনে বাঁচতে পারেন, একজন শিশু যেন শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, একজন অসুস্থ দরিদ্র মানুষ যেন প্রয়োজনের মুহূর্তে সহায়তা পান। এই স্বপ্নের পূর্ণতা নির্ভর করবে উদ্যোগগুলোর ধারাবাহিকতা, প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা, নারীদের জন্য বাস্তব কর্মসংস্থান এবং সমাজের সম্মিলিত সহযোগিতার ওপর। কিন্তু তাঁর এই প্রয়াসের মানবিক তাৎপর্য ইতিমধ্যেই স্পষ্ট।

শেষ পর্যন্ত একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত হয় তিনি কতটা খ্যাতি অর্জন করেছেন, শুধু তা দিয়ে নয়; বরং তাঁর উপস্থিতিতে অন্য মানুষের জীবনে কতখানি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা দিয়েও। রীণা রানী তালুকদারের জীবন আমাদের সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। হালদা নদীর পাড়ের এক সাধারণ গ্রামীণ পরিবার থেকে উঠে এসে তিনি নিজের জীবনের সীমাবদ্ধতা ও বেদনাকে অতিক্রম করে সমাজের অসহায় মানুষের জন্য কাজ করার পথ বেছে নিয়েছেন। উজ্জয়নী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মানবিক সহায়তা এবং ধ্রুবতারা ওমেন্স ফাউন্ডেশনের নারীজাগরণের স্বপ্ন তাঁর এই পথচলার দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।

ধ্রুবতারা আকাশে স্থির থেকে পথিককে দিক দেখায়। রীণা রানী তালুকদারের প্রতিষ্ঠিত ফাউন্ডেশনের নামেও সেই পথনির্দেশের প্রতীকী প্রত্যয় রয়েছে। তাঁর স্বপ্ন যদি আরও বহু নারীর হাতে কাজ, মনে সাহস এবং জীবনে মর্যাদা এনে দিতে পারে, তবে সেই আলো কয়েকটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ছড়িয়ে পড়বে সমাজের বৃহত্তর পরিসরে। তখন আবুরখীলের এক নারীর জীবনসংগ্রাম শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প হয়ে থাকবে না, রাউজানের মানবিক ঐতিহ্যেরও একটি নতুন অধ্যায় হয়ে উঠবে। মনীষার ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ রাউজানের মাটিতে রীণা রানী তালুকদারের ধ্রুবতারার আলো তাই মানবসেবা, নারীজাগরণ ও আত্মনির্ভরতার এক প্রত্যাশাময় প্রতীক।

নূরুল হক
কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক
ঢাকা, বাংলাদেশ

সম্পর্কিত খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল খায়ের 

নির্বাহী সম্পাদক: 
বার্তা প্রধান:

অফিস: বাড়ি ২৫ (দ্বিতীয় তলা), সড়ক ৫, সেক্টর ৬, উত্তরা, ঢাকা।

যোগাযোগ: ০১৭১৫৩৬৩০৭৯

বিজ্ঞাপন: ০১৮২৬৩৯৫৫৪৯

Email: khair.hrm@gmail.com

info@dainikprotibimbo.com

protibimboprokash.com

ফেসবুকে আমরা

©2025 Dainik Protibimbo – All Right Reserved. Designed and Developed by Bangla Webs