গ্যাসলাইটিং কী এবং এর প্রভাব: একটি গবেষণাধর্মী আলোচনা
আফসানা ইয়েসমিন অর্থী
গ্যাসলাইটিং (Gaslighting) হলো এক ধরনের মানসিক নির্যাতন বা মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তারের কৌশল, যেখানে একজন ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য ব্যক্তিকে তার নিজের স্মৃতি, অনুভূতি, বিচারবোধ এবং বাস্তবতা সম্পর্কে সন্দিহান করে তোলে। দীর্ঘ সময় ধরে এই আচরণ চলতে থাকলে ভুক্তভোগী আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে এবং নির্যাতনকারীর ওপর মানসিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। (Cleveland Clinic)
“Gaslighting” শব্দটির উৎপত্তি ১৯৩৮ সালের Gas Light নাটক এবং পরবর্তীতে নির্মিত ১৯৪৪ সালের Gaslight চলচ্চিত্র থেকে। সেখানে একজন স্বামী পরিকল্পিতভাবে তার স্ত্রীকে এমনভাবে বিভ্রান্ত করেন যাতে তিনি নিজের মানসিক সুস্থতা নিয়েই সন্দেহ করতে শুরু করেন। বর্তমানে মনোবিজ্ঞানে এটি একটি সুপরিচিত মানসিক নির্যাতনের ধরন হিসেবে বিবেচিত হয়। (Cleveland Clinic)
গ্যাসলাইটিংয়ের বৈশিষ্ট্য
গ্যাসলাইটিংয়ের কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো:
* ভুক্তভোগীর অনুভূতি বা অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করা।
* “তুমি ভুল মনে রেখেছ”, “এমন কিছু কখনও ঘটেনি” ইত্যাদি মন্তব্যের মাধ্যমে বাস্তবতা বিকৃত করা।
* নিজের ভুলের দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া।
* ভুক্তভোগীকে অতিরিক্ত সংবেদনশীল বা মানসিকভাবে অস্থির বলে উপস্থাপন করা।
* ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে তাকে নির্যাতনকারীর ওপর নির্ভরশীল করে তোলা। (WebMD)
গ্যাসলাইটিংয়ের প্রভাব
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি গ্যাসলাইটিং একজন মানুষের মানসিক, সামাজিক এবং শারীরিক সুস্থতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
প্রথমত, এটি আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়। ভুক্তভোগী নিজের সিদ্ধান্ত এবং স্মৃতির ওপর আস্থা হারাতে শুরু করেন।
দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন গ্যাসলাইটিংয়ের শিকার হলে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং ট্রমার ঝুঁকি বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে ঘুমের সমস্যা, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও দেখা দেয়। (Medical News Today)
তৃতীয়ত, কর্মক্ষেত্র, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা দাম্পত্য জীবনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ভুক্তভোগী সবসময় মনে করেন যে তিনি ভুল করছেন এবং অন্যের অনুমোদন ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।
চতুর্থত, শিশুদের ক্ষেত্রে গ্যাসলাইটিং তাদের ব্যক্তিত্ব বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তারা আত্মবিশ্বাসহীন, ভীতু এবং সামাজিকভাবে অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিরোধ ও করণীয়
গ্যাসলাইটিং থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:
* নিজের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া।
* প্রয়োজনে ঘটনা লিখে রাখা, যাতে বাস্তবতা যাচাই করা সহজ হয়।
* বিশ্বস্ত বন্ধু বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করা।
* প্রয়োজনে প্রশিক্ষিত মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সেলরের সহায়তা নেওয়া।
* মানসিকভাবে নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা।
গ্যাসলাইটিং কেবল একটি সাধারণ মিথ্যা বলা বা তর্কের বিষয় নয়; এটি একটি ধারাবাহিক মানসিক নির্যাতনের প্রক্রিয়া, যার উদ্দেশ্য একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস, বিচারক্ষমতা এবং বাস্তবতার অনুভূতিকে দুর্বল করে ফেলা। সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে শিক্ষা এবং সময়মতো পেশাগত সহায়তা গ্রহণের মাধ্যমে এর ক্ষতিকর প্রভাব অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগই একটি নিরাপদ ও মানসিকভাবে সুস্থ পরিবেশ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
লেখক:
আফসানা ইয়েসমিন অর্থী
গবেষক ও শিশু কাউন্সেলর
B.Sc., MS (Child Development), MPH (Hospital Management)

