দুর্গাপূজায় শিশুর আনন্দ ও নিরাপত্তা: অভিভাবকদের জন্য ৫টি জরুরি পরামর্শ
— আফসানা ইয়াসমিন অর্থী
শরতের আকাশে কাশফুল দুললেই শুরু হয় দুর্গাপূজার প্রস্তুতি। বড়দের কাছে এটি আয়োজনের সময়, আর শিশুদের কাছে নতুন রং, আলো, ঢাকের শব্দ, মেলা আর অফুরন্ত বিস্ময়ের এক আনন্দময় জগৎ। কিন্তু একটু অগোছালো প্রস্তুতিতে সেই আনন্দই কখনো কান্না, ক্লান্তি কিংবা অস্বস্তিতে বদলে যেতে পারে।
তাই উৎসবের আনন্দ অটুট রাখতে শিশুদের আরাম, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মানসিক স্বস্তির দিকে একটু বাড়তি নজর দেওয়া জরুরি।
১. পোশাক: সাজ হোক সুন্দর, আরামদায়ক
পূজার সময় আবহাওয়া প্রায়ই গরম ও আর্দ্র থাকে। অতিরিক্ত গরমে শিশুরা দ্রুত অস্বস্তিতে পড়তে পারে। তাই শিশুর জন্য সুতির, হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক বেছে নেওয়া ভালো। ভারী কাপড়, অতিরিক্ত জরির কাজ কিংবা বাতাস চলাচলে বাধা দেয় এমন পোশাক দীর্ঘ সময় পরে থাকলে ঘাম ও ত্বকের অস্বস্তি বাড়তে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গরমে শিশুদের হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরানোর পরামর্শ দেয়। [১]
অভিভাবকদের জন্য কিছু পরামর্শ:
* ব্যাগে অন্তত দুই সেট বাড়তি পোশাক, ছোট তোয়ালে ও প্রয়োজনীয় পরিষ্কার করার সামগ্রী রাখুন।
* শিশুর পোশাক ঘামে ভিজে গেলে শরীর মুছে শুকনো পোশাক পরিয়ে দিন।
* সহজে পরা ও খোলা যায় এমন রেডিমেড ধুতি-পাঞ্জাবি, শাড়ি বা উৎসবের পোশাক বেছে নিতে পারেন।
* পোশাক নির্বাচনের সময় শিশুর মতামতকে গুরুত্ব দিন। নিজের পছন্দের পোশাক পরতে পারলে শিশু উৎসবের প্রস্তুতিতে আরও আনন্দের সঙ্গে অংশ নিতে পারে।
মনে রাখবেন, শিশুর সাজের চেয়ে তার স্বস্তি ও নিরাপত্তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
২. খাবার: উৎসবের ব্যস্ততায়ও পুষ্টির যত্ন
উৎসবের ভিড়, মণ্ডপে ঘোরাঘুরি কিংবা দীর্ঘ সময় বাইরে থাকার কারণে শিশুর খাবারের সময় এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। ক্ষুধার্ত শিশু সহজেই ক্লান্ত, বিরক্ত বা কান্নাকাটি করতে পারে। তাই বাইরে যাওয়ার আগে খাবারের পরিকল্পনা করে নেওয়া ভালো।
সঙ্গে রাখতে পারেন:
* সিদ্ধ ডিম
* কলা ও অন্যান্য ভালোভাবে ধোয়া ফল
* সেদ্ধ আলু বা মিষ্টি আলু
* চিড়া-দই
* রুটি ও সবজির রোল
* শিশুর বয়স অনুযায়ী উপযোগী ঘরে তৈরি হালকা খাবার
সঙ্গে নিরাপদ পানীয় জল রাখুন এবং শিশুকে নিয়মিত পানি পান করতে দিন। গরমে ঘাম ও পর্যাপ্ত পানি না খাওয়ার কারণে পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
রাস্তার খোলা খাবার, অপরিষ্কার পানি এবং দীর্ঘ সময় বাইরে পড়ে থাকা খাবার এড়িয়ে চলুন। অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার শিশুর পেটে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
খাবার আগে থেকে পরিষ্কার পাত্রে প্রস্তুত করে রাখলে উৎসবের ব্যস্ততার মধ্যেও শিশুকে সময়মতো খাওয়ানো সহজ হবে।
৩. ঘুম: পর্যাপ্ত বিশ্রামেই থাকুক উৎসবের আনন্দ
উৎসবের উত্তেজনায় শিশুর ঘুমের রুটিন প্রায়ই বদলে যায়। কিন্তু ঘুমের ঘাটতি শিশুর মনোযোগ, আচরণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলতে পারে।
আমেরিকান একাডেমি অব স্লিপ মেডিসিনের সুপারিশ অনুযায়ী, ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের ২৪ ঘণ্টায় মোট ১০–১৩ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন; এই সময়ের মধ্যে দিবানিদ্রাও অন্তর্ভুক্ত। [২]
যা করতে পারেন:
* শিশুর বয়স ও অভ্যাস অনুযায়ী দুপুরে বিশ্রামের সময় রাখুন।
* খুব ছোট শিশুকে দীর্ঘ সময় ধরে ভিড়ের মধ্যে ঘোরাবেন না।
* সম্ভব হলে সন্ধ্যার মধ্যেই বাড়ি ফেরার পরিকল্পনা করুন।
* বাড়ি ফিরে শিশুকে স্বাভাবিক ঘুমের রুটিনে ফিরতে সাহায্য করুন।
শিশু ক্লান্ত হয়ে পড়লে তাকে জোর করে ঘোরানো বা আনন্দ করতে বাধ্য করা উচিত নয়। মনে রাখবেন, উৎসব উপভোগ করার জন্য শিশুরও বিরতি প্রয়োজন।
৪. ভিড় ও শব্দে ভয় কমাতে শিশুর পাশে থাকুন
দুর্গাপূজার মণ্ডপ, মেলা, মানুষের ভিড়, আলোর ঝলকানি ও ঢাকের জোরালো শব্দ অনেক শিশুর কাছে আনন্দের হলেও কারও কারও জন্য তা ভীতিকর বা অতিরিক্ত উদ্দীপনাময় হতে পারে। বিশেষ করে সংবেদনশীল শিশু কিংবা অটিজমসহ যেসব শিশুর শব্দ ও ভিড় সহ্য করতে অসুবিধা হয়, তাদের জন্য বাড়তি প্রস্তুতি দরকার।
শিশুর নিরাপত্তায় যা করবেন:
* বাইরে যাওয়ার আগে গল্প করে বা ছবি দেখিয়ে বুঝিয়ে দিন, কোথায় যাচ্ছেন এবং সেখানে কী দেখতে পাবে।
* শিশুকে সব সময় চোখের সামনে রাখুন এবং ভিড়ের মধ্যে হাত ধরে চলুন।
* পোশাকের ভেতরে বা নিরাপদ পরিচয়-কার্ডে অভিভাবকের নাম ও ফোন নম্বর লিখে রাখুন।
* শিশুকে শেখান, হারিয়ে গেলে যেন কোনো নির্দিষ্ট নিরাপত্তাকর্মী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির সাহায্য চায়।
* ছোট শিশুর ক্ষেত্রে উপযুক্ত পরিচয়-ব্যান্ড ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে কোনো ব্যান্ড বা ক্লিপই অভিভাবকের সরাসরি নজরদারির বিকল্প নয়।
* ভিড় বা শব্দে অস্বস্তি হলে ফাঁকা জায়গায় নিয়ে যান, শান্তভাবে কথা বলুন এবং প্রয়োজনে বাড়ি ফিরে আসুন।
* শিশুর শব্দ-সংবেদনশীলতা থাকলে উপযুক্ত শিশু-সুরক্ষিত কানের সুরক্ষা ব্যবহার করা যেতে পারে।
শিশু ভয় পেলে তাকে বকবেন না বা বলবেন না, “এত ভয় পাওয়ার কী আছে?” বরং বলুন, “তুমি অস্বস্তি বোধ করছ, আমি তোমার পাশে আছি।” এই আশ্বাস শিশুর নিরাপত্তাবোধ বাড়ায়।
৫. সব ধর্মের শিশুর জন্য উৎসব হোক সম্প্রীতির পাঠ
দুর্গাপূজা হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। একই সঙ্গে এর শিল্প, সাজসজ্জা, সংগীত ও সামাজিক আয়োজন বৃহত্তর বাঙালি সংস্কৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২০২১ সালে ইউনেসকো কলকাতার দুর্গাপূজাকে মানবজাতির অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ইউনেসকোর বিবরণে এই উৎসবের শিল্প, সৃজনশীলতা ও বিভিন্ন শ্রেণি ও সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণের দিকটি তুলে ধরা হয়েছে। [৩]
শিশুরা ছোটবেলা থেকেই পরিবার, প্রতিবেশী ও সমাজের আচরণ দেখে মানুষকে বুঝতে শেখে। তাই ভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের মানুষের প্রতি সম্মান গড়ে তোলার শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হওয়া দরকার।
মনোবিজ্ঞানী গর্ডন অলপোর্ট তাঁর ১৯৫৪ সালের The Nature of Prejudice গ্রন্থে আন্তগোষ্ঠী যোগাযোগের ধারণা ব্যাখ্যা করেন। পরবর্তীকালে পেটিগ্রু ও ট্রপের ২০০৬ সালের একটি বৃহৎ গবেষণা-বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে ইতিবাচক যোগাযোগ সাধারণত পারস্পরিক পক্ষপাত কমাতে সাহায্য করে। [৪, ৫]
শিশুর জীবনে এই শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য অভিভাবকেরা কিছু সহজ পদক্ষেপ নিতে পারেন:
* প্রতিবেশী ও সহপাঠীদের উৎসবের আনন্দে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিন।
* অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাসকে সম্মান করতে শেখান।
* শিশুদের একসঙ্গে খেলতে, ছবি আঁকতে, গল্প করতে ও আনন্দ ভাগ করে নিতে উৎসাহিত করুন।
* কোনো ধর্ম বা সম্প্রদায় সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য শিশুর সামনে করা থেকে বিরত থাকুন।
* দুর্গাপূজার পাশাপাশি ঈদ, বড়দিন ও বুদ্ধপূর্ণিমার মতো উৎসব সম্পর্কেও শিশুর বয়স উপযোগী ভাষায় পরিচয় করিয়ে দিন।
শিশুকে বলা যায়, “আমার উৎসব আমার কাছে আনন্দের, তোমার উৎসব তোমার কাছে আনন্দের। আমরা একে অপরের বিশ্বাসকে সম্মান করে একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতে পারি।”
তবে সম্প্রীতির অর্থ নিজের ধর্মীয় পরিচয় ভুলে যাওয়া নয়। বরং নিজের বিশ্বাসে স্থির থেকেও অন্যের বিশ্বাস, অধিকার ও মর্যাদাকে সম্মান করতে শেখাই প্রকৃত সম্প্রীতি।
শেষ কথা
শিশুর জন্য উৎসব সুন্দর হয়ে ওঠে তখনই, যখন সে আরামদায়ক পোশাক পরে, সময়মতো খাবার খায়, পর্যাপ্ত ঘুমায় এবং নিরাপদ পরিবেশে আনন্দ করার সুযোগ পায়।
আর যখন সে দেখে, ভিন্ন ধর্মের মানুষও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তখন তার মনে গড়ে ওঠে সহমর্মিতা, মানবিকতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তি।
আজকের শিশুরাই আগামীর পৃথিবী। তাদের মনে বিভেদের নয়, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বীজ বুনে দিই।
সবাইকে জানাই শুভ শারদীয়ার আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
লেখক: আফসানা ইয়াসমিন অর্থী (Afsana Yesmen Aurthi)
ইন্টারন্যাশনাল চাইল্ড কাউন্সেলর | লেখক | গবেষক
Child Growth and Development Center
⸻————————————————-
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
[১] World Health Organization. Heat and health. শিশুদের গরমে সুরক্ষা ও হালকা পোশাকসংক্রান্ত নির্দেশনা।
https://www.who.int/en/news-room/fact-sheets/detail/climate-change-heat-and-health
[২] Paruthi, S., et al. (2016). Recommended Amount of Sleep for Pediatric Populations: A Consensus Statement of the American Academy of Sleep Medicine. Journal of Clinical Sleep Medicine, 12(6), 785–786.
https://doi.org/10.5664/jcsm.5866
[৩] UNESCO. (2021). Durga Puja in Kolkata. Representative List of the Intangible Cultural Heritage of Humanity.
https://ich.unesco.org/en/RL/durga-puja-in-kolkata-00703
[৪] Allport, G. W. (1954). The Nature of Prejudice. Addison-Wesley.
[৫] Pettigrew, T. F., & Tropp, L. R. (2006). A Meta-Analytic Test of Intergroup Contact Theory. Journal of Personality and Social Psychology, 90(5), 751–783.
https://doi.org/10.1037/0022-3514.90.5.751

