কালোত্তীর্ণ জিয়া
মো. মনির হোসেন
আমি তখন ৮ম শ্রেণির ছাত্র। বাড়িতে থাকা হলুদ রংয়ের ফিলিপস রেডিও ছেড়ে সকালে অংক করা ছিল আমার নিত্যদিনের রুটিন। সেদিনও রেডিও ছেড়ে অংকের খাতা নিয়ে বসেছি। রেডিওতে গান বাজছে না… খানিক বাদেই ঘোষণা এলো চট্টগ্ৰামে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হয়েছেন। ৪৫ বছর পূর্বে নিভৃত একটা পল্লীতে বসে তথ্য পাবার কোন ব্যবস্থাই ছিল না, তাছাড়া নিতান্ত কিশোর আমি জানবার সীমাবদ্ধতা প্রচুর। তবে স্মৃতির পাতায় উজ্জ্বল আজো, জিয়া’র শোকে অক্ষর জ্ঞাণহীন আমার দাদীকে ছটফট করতে দেখেছি।
সময়ের ট্রেন চলেছে আপন গতিতে। স্কুল কলেজ পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন সময়ে তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা প্রয়াত নির্মল গুহ দাদার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মুজিববাদী ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে গেলাম। সময়ের আবর্তে রাজনীতিই হয়ে উঠলো ধ্যান, জ্ঞাণ, সাধনা।
তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা মাঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরী, মাঈনু ভাইয়ের পরামর্শে রাজনীতি নিয়ে পড়াশুনা শুরু করলাম। যদিও নব্বইয়ের ছাত্রগণ অভ্যুত্থানে জড়িয়ে পড়ে তৎকালীন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটা ক্যাম্পাসে গিয়েছি মিছিল মিটিংয়ে।
ক্রমান্নয়েই ধাক্কা খাচ্ছি। তরুন প্রজন্মের বৃহৎ অংশের ভাবনায় শহীদ জিয়া। ঢাবি, রাবিসহ দেশের প্রায় সবগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের জয় জয়কার।
ভাবতে লাগলাম, আমাদের বিবেচনায় স্বৈরশাসক, সেনা শাসক জিয়া কেন জনপ্রিয় তৎকালীন সময়ের লেখক, বুদ্ধিজীবি গবেষক যাদের জানি তাঁদের কাছেও বিষয়টা তুলে ধরলে তাঁরা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে যাচ্ছিল।
ভাসানী অনুসারী ২/১ জনের শরনাপন্ন হলাম। এবার বুঝতে পারলাম আমার জানার সীমাবদ্ধতা।
রাজনৈতিক চিন্তায় পরিবর্তন এলো। ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা স্যারের হাত ধরে চলে এলাম জিয়ার দলে-
অসম্ভব কর্মীবান্ধব হুদা স্যার জনাব ফিরোজ নুন স্যারের কথা বললেন-
সময়ে অসময়ে ফিরোজ নুন স্যারের মাধ্যমে শুরু করলাম নতুন যাত্রা-
শেখ মুজিবর রহমান যেখানে ব্যর্থ জিয়াউর রহমান সেখানেই সফল:
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে জন প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এই মৌলিক চাহিদা পুরনের আশা জাগিয়ে তৎকালীন শাসক শ্রেণি বাঙালির মাঝে যে জাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন আবার তাদের দ্বারা সংঘটিত নজীর বিহীন লুটপাট জনমনে ব্যাপক হতাশা আর ক্ষোভের সৃষ্টি করছিল। জিয়াউর রহমান তাঁর স্বল্প সময়ের শাসনে জনমনে পঞ্জীভুত ক্ষোভকে প্রশমিত করে রাজনৈতিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জনমনে স্থায়ী আসন পাকাপোক্ত করে নেন। বলাবাহুল্য জিয়াউর রহমানের শাসনামল স্বল্প কালীন হওয়ায় ভাগ্য তাঁকে দারুণ ভাবে সহায়তা করছে। হুজুকে বাঙালি জিয়াউর রহমানের সমালোচনায় যাবার পূর্বেই তিনি শাহাদাৎ রবন করেন।
এছাড়াও তৎকালীন আর্ন্তজাতিক রাজনীতিতে মুসলিম বিশ্ব ইসলামী গ্লোগানধারী পাকিস্তানের বিভাজনে শেখ মুজিবর রহমানের উপর রুষ্ট ছিলেন। তাঁর অবর্তমানে জিয়াউর রহমানকে আরব বিশ্ব দ্রুত স্বীকৃতি দিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে রাষ্ট্রনায়ক জিয়া এই সুযোগটি পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে ঐ সময় থেকেই আবর বিশ্বে বাংলাদেশের শ্রমজীবিদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেশের অর্থনীতিতে গতির সঞ্চার করেন।
তৎকালীন সময়ে চলমান ইরাক-ইরান যুদ্ধ বন্ধে জিয়াউর রহমানের ভুমিকার জন্য আবর বিশ্ব তাঁকে আস্থাভাজন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতা হিসেবে সাদরে গ্ৰহন করে নেয়।
ইসলামী মূল্যবোধে পবিত্র স্থান আরাফাত ময়দানে জিয়াউর রহমানের পরামর্শে নিমগাছ লাগানোর বিষয়টি ব্যাপক ভাবে প্রচার পেলে রাতারাতি মুসলিম বিশ্বে তিনি স্বপ্নের হিরোর আসনে অধিষ্টিত হয়ে যান।
জিয়াউর রহমান দেশের আমজনতার ভারত বিরোধী সেন্টিমেন্টকে সঠিকভাবে রাজনৈতিক ও কুটনৈতিক ছকে ব্যবহার করে ভারতের সাথে তৎকালীন সময়ে আমাদের অমীমাংসিত ফারাক্কা পানি চুক্তি গ্যারান্টি ক্লোজ সহ স্বাক্ষর করে সকল শাসকদের অতিক্রম করে নিজের স্থানটি উচ্চতায় তুলে ফেলেন। যদিওবা এ সময়েও তাঁর ভাগ্য বিধাতা তাঁকে দারুন ভাবেই সহায়তা করে। ঐ সময়ে ভারতের আয়রন লেডী ইন্দ্রাগান্ধী ক্ষমতা থেকে ছিটকে পরে মেরাজ দেশাই সরকার ক্ষমতাশীন থাকবার বদৌলতে জিয়াউর রহমান ভারতীয় শাসকগোষ্ঠীর আনাকূল্য পেয়েছিলেন বটে।
জিয়াউর রহমান তাঁর জনপ্রিয়তার শীর্ষ সময়ে অকালে কতিপয় বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে প্রাণ হারারে মানুষের মাঝে তাঁর জন্য একটা মততা জড়ানো ভালোবাসার আসন চিরস্থায়ী হয়ে যায়।
সেই মোহবিষ্ট ভালোবাসাই বিএনপি’র প্রধান শক্তি।
কালের বিবর্তনে ক্রমশ তা বাড়ছেই… অবিনশ্বর এই ভালোবাসার কমতি নেই। তবে, একজন জিয়ার অর্জন আদর্শ বিহীন কর্মী নামক ধান্দাবাজদের হাত থেকে রক্ষা করতে জাগ্ৰত থাকতে হবে জিয়ার সেনাদের।

