5
কেন এইচএসসিতে এই ফল বিপর্যয়? একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন
— আফসানা ইয়াসমিন অর্থী
ভূমিকা
২০২৬ সালের এইচএসসিতে নয়টি সাধারণ বোর্ডে পাসের হার ৫১.৬২ শতাংশ, যা গত ২২ বছরে সর্বনিম্ন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩৫ হাজার ৯৪৮ জন, গত বছর ছিল ৬৩ হাজার ২১৯ জন। এটি এক বছরের আকস্মিক ঘটনা নয়, একটি ধারাবাহিক পতনের অংশ।
পতনের চিত্র
২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৭৫.৫৬ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা নেমে হয় ৫৭.১২ শতাংশ, আর এবার ৫১.৬২ শতাংশ। অর্থাৎ দুই বছরে প্রায় ২৪ শতাংশীয় পয়েন্টের পতন। ২০০৬ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত কোনো বছরই হার ৬০ শতাংশের নিচে নামেনি। তাই বিষয়টি সাময়িক ওঠানামা নয়, কাঠামোগত প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।
সম্ভাব্য কারণ
গবেষণার সততার খাতিরে বলা দরকার, কোনো একটি কারণকে নিশ্চিতভাবে দায়ী করার মতো তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে প্রকৃত কারণ নির্ধারণ সম্ভব নয়; বিষয়ভিত্তিক ফল, প্রশ্নের কাঠিন্য, প্রস্তুতি ও খাতা মূল্যায়নের ধরন বিশ্লেষণ করতে হবে। আলোচনায় থাকা কারণগুলো এরকম:
১. ইংরেজিতে ব্যাপক অকৃতকার্যতা। ঢাকা বোর্ড ছাড়া অন্য কোনো বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৭০ শতাংশে পৌঁছায়নি; ঢাকায় ৭৩.৬২ শতাংশ, অন্যত্র ৫৪ থেকে প্রায় ৬৬ শতাংশ। ইংরেজি বাধ্যতামূলক বিষয় হওয়ায় এর প্রভাব সরাসরি সামগ্রিক ফলে পড়ে। গত বছরের বিশ্লেষণেও ইংরেজি ও আইসিটিতে বেশি অকৃতকার্য হওয়ার তথ্য এসেছিল।
২. মূল্যায়নে কঠোরতা। ২০২৫ সালে একজন অভিজ্ঞ পরীক্ষক আগেই আভাস দিয়েছিলেন, খাতায় গ্রেস মার্ক না দেওয়া হলে পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমতে পারে। উত্তরপত্র মূল্যায়নে আগের তুলনায় কঠোরতা এসেছে কি না, তা নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে।
৩. প্রশ্নপত্রের ত্রুটি ও পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার গরমিল। পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের দুটি প্রশ্নে ভুল সরকার নিজেই স্বীকার করেছিল। রসায়ন ও জীববিজ্ঞানেও অসংগতির অভিযোগ ওঠে। কোথাও নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের হাতে অনিয়মিতদের প্রশ্ন, কোথাও প্রথম পত্রের জায়গায় দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা নেওয়া হয়। বৈরী আবহাওয়ায় পরীক্ষা নেওয়া এবং মূল্যায়নপদ্ধতির পরিবর্তনও আলোচনায় এসেছে।
৪. পাঠদান ও শিখন ঘাটতি। নিয়মিত পাঠদান, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের প্রাপ্যতা এবং শ্রেণিকক্ষে ইংরেজি শেখার পরিবেশ, সবই পর্যালোচনার দাবি রাখে। এই ঘাটতি রাতারাতি তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের শিখন-অর্জনের দুর্বলতা মূল্যায়ন কঠোর হওয়ার পর স্পষ্ট হয়ে উঠছে, এমন ব্যাখ্যাও দেওয়া যায়, তবে এর পক্ষে এখনো পূর্ণাঙ্গ গবেষণা-উপাত্ত নেই।
৫. রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব। গত বছরের ফল বিশ্লেষণে রাজনৈতিক অস্থিরতাও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেছিলেন সংশ্লিষ্টরা। এটি ২০২৫ সালের পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতিকালের প্রসঙ্গে বেশি প্রযোজ্য।
কোনটির প্রভাব কতটা?
কোন কারণের প্রভাব কতটা, তা নির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত ছাড়া বলা সম্ভব নয়। সম্ভবত একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে: দীর্ঘদিনের শিখন-ঘাটতি, কঠোর মূল্যায়ন এবং পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার ত্রুটি।
করণীয় (গবেষণাভিত্তিক সুপারিশ)
•বিষয়ভিত্তিক ও বোর্ডভিত্তিক বিস্তারিত উপাত্ত প্রকাশ করে স্বাধীন বিশ্লেষণ
•ইংরেজি, গণিত ও আইসিটিতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ
•প্রশ্ন প্রণয়ন ও মডারেশনে জবাবদিহি
•মূল্যায়ননীতি আগে থেকে স্পষ্ট করে জানানো, যাতে শিক্ষার্থীরা প্রস্তুত থাকে
•অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য কাউন্সেলিং ও পুনঃপ্রস্তুতির সুযোগ
উপসংহার
এই ফল শুধু পাস-ফেলের সংখ্যা নয়, শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে একটি সতর্কসংকেত। দায় চাপানোর আগে প্রয়োজন তথ্যনির্ভর, স্বচ্ছ বিশ্লেষণ। আর যারা এবার অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের ব্যর্থতা ব্যক্তিগত নয়, ব্যবস্থার প্রশ্নও এতে জড়িয়ে আছে, এটা মনে রাখা জরুরি।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো (৩১ অক্টোবর ২০২৬), আজকের পত্রিকা, বিডিনিউজ২৪

