পে-ফিক্সেশনে বেতনক্রমের জটিলতা
— আসাদুজ্জামান খান মুকুল
জাতীয় বেতনস্কেল নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল। সরকার সে অনুযায়ী নতুন পে-স্কেল ২০২৬ দিয়েছে। বেতন বৃদ্ধির সুযোগ এতে তৈরি হয়েছে-এটি নিঃসন্দেহে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য স্বস্তির খবর। কিন্তু একটি নতুন পে-স্কেলে শুধু বেতন বৃদ্ধি পায় না, এর সঙ্গে পদমর্যাদা, জ্যেষ্ঠতা, দায়িত্ব, অভিজ্ঞতা এবং চাকরিজীবনে অর্জিত টাইমস্কেল ও উচ্চতর গ্রেডের আর্থিক বিষয়ও জড়িত। ফলে নতুন কাঠামোয় কে কত টাকা বেশি পেলেন, তার পাশাপাশি একটি প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ- উপরের গ্রেডের কর্মচারীর বেতন কি নিচের গ্রেডের কর্মচারীর চেয়ে যথাযথভাবে বেশি থাকছে?
জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর নতুন কাঠামো দেখলেই একটি বিষয় পরিষ্কার হয়। ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫,০০০ টাকা, আর ১২তম গ্রেডের ২৪,৩০০ টাকা। অর্থাৎ গ্রেডের ক্রম অনুযায়ী ১২তম গ্রেডে প্রারম্ভিক বেতন ১১তম গ্রেডের চেয়ে ৭০০ টাকা কম। এই ব্যবধানটি স্বাভাবিক। কারণ ১১তম গ্রেড পদমর্যাদায় ১২তম গ্রেডের ওপরে। সরকারি গেজেটে নতুন স্কেলের এই প্রারম্ভিক বেতন কাঠামোই নির্ধারিত হয়েছে।
কিন্তু জটিলতা ধরা পড়ে যখন ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে প্রত্যেক কর্মচারী যে বেতন পাচ্ছেন, সেটিকে গেজেটে নির্ধারিত পদ্ধতিতে নতুন স্কেলে ফিক্সেশন করার সময়। সেখানে শুধু নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন দেখলেই হবে না, পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন, ৩০ জুনের বর্তমান মূল বেতন এবং নতুন স্কেলের ধাপ – সবকিছুর পার্থক্য হিসাব করতে হয়। গেজেটের অনুচ্ছেদ ৫ ও ৯-এর বিধানে ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে বেতন নির্ধারণ করে সেই নির্ধারিত নতুন বেতন ও বর্তমান বেতনের পার্থক্য থেকে পর্যায়ক্রমে ৫০ শতাংশ, ৭৫ শতাংশ, পরে শতভাগ সুবিধা কার্যকর করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এখানেই একটি আপাতদৃষ্টিতে ছোট হিসাব বড় প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে।
ধরে নিই- ১১তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর ২০১৫ সালের প্রারম্ভিক বেতন ছিল ১২,৫০০ টাকা এবং ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে তাঁর মূল বেতন ২৩,৬৬০ টাকা। পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন থেকে তাঁর বর্তমান বেতনের পার্থক্য হচ্ছে ১১,১৬০ টাকা। এই পার্থক্য নতুন ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন ২৫,০০০ টাকার সঙ্গে যোগ করলে পাওয়া যায় ৩৬,১৬০ টাকা। নতুন স্কেলে ৩৬,১৬০ টাকার ধাপ না থাকায় পরবর্তী উচ্চতর ধাপ ৩৭,০০০ টাকায় বেতন নির্ধারণ করতে হয়।
এবার একই পদ্ধতিতে ১২তম গ্রেডের হিসাব করে নিই। ২০১৫ সালের এই গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন ছিল ১১,৩০০ টাকা। ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে মূল বেতন ২৩,৫৮০ টাকা হলে পুরোনো প্রারম্ভিক বেতন থেকে পার্থক্য দাঁড়ায় ১২,২৮০ টাকা। নতুন ১২তম গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন ২৪,৩০০ টাকার সঙ্গে এই পার্থক্য যোগ করলে পাওয়া যায় ৩৬,৫৮০ টাকা। নতুন স্কেলে এই অঙ্কের ধাপ না থাকায় পরবর্তী উচ্চতর ধাপ ৩৭,৭০০ টাকায় বেতন নির্ধারণ করতে হয়।
এখানেই মূল অসংগতিটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নতুন পে-স্কেলে ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন ২৫,০০০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ২৪,৩০০ টাকা, অর্থাৎ ১১তম গ্রেড ৭০০ টাকা ওপরে। কিন্তু একই কর্মচারীদের বর্তমান বেতন ধরে গেজেটের ফিক্সেশন সূত্র প্রয়োগ করার পর ১১তম গ্রেডের নির্ধারিত ধাপ দাঁড়াচ্ছে ৩৭,০০০ টাকা, আর ১২তম গ্রেডের ৩৭,৭০০ টাকা।
অর্থাৎ যে গ্রেডটি নিচে, সেটিই নির্ধারিত বেতনের ক্ষেত্রে ৭০০ টাকা ওপরে চলে যাচ্ছে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে বাস্তবায়নযোগ্য বেতন বৃদ্ধির হিসাবেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। ১১তম গ্রেডের ক্ষেত্রে ৩৭,০০০ টাকার পরবর্তী বার্ষিক বেতনবৃদ্ধি ধরে নির্ধারিত বেতন ৩৮,৮০০ টাকা হয়। ২৩,৬৬০ টাকার বর্তমান মূল বেতনের সঙ্গে এর পার্থক্য ১৫,১৪০ টাকা। ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য প্রথম পর্যায়ে এই পার্থক্যের ৫০ শতাংশ কার্যকর হওয়ায় ১ জুলাই ২০২৬ থেকে মূল বেতন দাঁড়ায় ৩১,২৩০ টাকা।
১২তম গ্রেডের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ৩৭,৭০০ টাকার পর বার্ষিক বেতনবৃদ্ধি ধরে অঙ্কটি দাঁড়ায় ৩৯,৬০০ টাকা। বর্তমান ২৩,৫৮০ টাকার সঙ্গে পার্থক্য ১৬,০২০ টাকা। এর ৫০ শতাংশ ৮,০১০ টাকা। ফলে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে মূল বেতন দাঁড়ায় ৩১,৫৯০ টাকা।
পরবর্তী ধাপেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৭৫ শতাংশ বাস্তবায়নের হিসাবে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন দাঁড়ায় ৩৫,০১৫ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৩৫,৫৯৫ টাকা। ব্যবধান তখন ৫৮০ টাকা। আর ১ জুলাই ২০২৭-এ বার্ষিক ইনক্রিমেন্টসহ শতভাগ পর্যায়ে ১১তম গ্রেডের বেতন ৪০,৮০০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৪১,৬০০ টাকা হলে ব্যবধান দাঁড়ায় ৮০০ টাকা।
নিচের চিত্রটি লক্ষ করা যেতে পারে:
সময়
১১তম গ্রেড
১২তম গ্রেড
১২তম গ্রেডের অতিরিক্ত
৩০ জুন ২০২৬
২৩,৬৬০
২৩,৫৮০
১ জুলাই ২০২৬
৩১,২৩০
৩১,৫৯০
৩৬০
১ জানুয়ারি ২০২৭
৩৫,০১৫
৩৫,৫৯৫
৫৮০
১ জুলাই ২০২৭
৪০,৮০০
৪১,৬০০
৮০০
এই হিসাবটিই সমস্যাটির সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে সামনে আনা যায়। ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত ১১তম গ্রেডের কর্মচারী ১২তম গ্রেডের কর্মচারীর চেয়ে ৮০ টাকা বেশি মূল বেতন পাচ্ছেন। অথচ নতুন পে-স্কেলের ফিক্সেশন পদ্ধতি কার্যকর হওয়ার পর ১২তম গ্রেডের কর্মচারীর বেতন প্রথম পর্যায়েই ৩৬০ টাকা বেশি নির্ধারিত হচ্ছে, পরের পর্যায়ে সেই ব্যবধান ৫৮০ টাকা এবং শতভাগ বাস্তবায়নের পর্যায়ে ৮০০ টাকা।
অর্থাৎ ৩০ জুন পর্যন্ত যে স্বাভাবিক বেতনক্রম ছিল – উপরের গ্রেডে বেশি, নিচের গ্রেডে কম। নতুন ফিক্সেশন পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সেই ক্রমই উল্টে যাচ্ছে।
এখানে প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়। ১২তম গ্রেডের কর্মচারী বেশি বেতন পেলে তিনি তো গেজেট অনুযায়ীই পাবেন। তাঁর বেতন কমানোর দাবি তোলা এই আলোচনার উদ্দেশ্য নয়। উদ্যেশ্য বরং নতুন পে-স্কেলের ফিক্সেশন পদ্ধতিতে যে এই জটিলতা তৈরি হচ্ছে, সেটিই নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিগোচর করা।
আরও বড় প্রশ্ন আসে টাইমস্কেল ও উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে।
একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী চাকরিতে কয়েক বছর বেশি কাটিয়েছেন এবং নিয়ম অনুযায়ী একটি টাইমস্কেল পেয়েছেন। আরেকজন আরও বেশি সময় চাকরি করে দুটি টাইমস্কেল পেয়েছেন। এই সুবিধাগুলো তাঁর চাকরিজীবনের অগ্রগতি ও জ্যেষ্ঠতার আর্থিক স্বীকৃতি। স্বাভাবিকভাবেই নতুন পে-স্কেলেও সেই জ্যেষ্ঠতার একটি সুস্পষ্ট আর্থিক প্রতিফলন থাকা উচিত।
কিন্তু যদি নতুন ফিক্সেশন সূত্রের কারণে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী এমন মূল বেতন পান, যা একটি টাইমস্কেলপ্রাপ্ত সিনিয়রের বেতনকে ছাড়িয়ে যায়, কিংবা আরও অস্বাভাবিকভাবে দুটি টাইমস্কেলপ্রাপ্ত সিনিয়র কর্মকর্তা বা কর্মচারীর মূল বেতনও কোনো পর্যায়ে তাঁর নিচে নেমে যায়, তাহলে বিষয়টি আর সাধারণ বেতন বৃদ্ধির হিসাবে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখনই প্রশ্ন ওঠে চাকরির জ্যেষ্ঠতার আর্থিক মূল্যায়ন নিয়ে।
২০১৫ সালের পে-স্কেলে বিভিন্ন গ্রেড, ইনক্রিমেন্ট ও টাইমস্কেলের মাধ্যমে একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর কর্মজীবনের অগ্রগতির সঙ্গে তাঁর বেতনের একটি সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। নতুন পে-স্কেলের উদ্দেশ্য অবশ্যই সেই অর্জনকে নষ্ট করে দেওয়া নয়। কিন্তু নতুন সূত্রের প্রয়োগে যদি কোথাও জুনিয়র ও সিনিয়রের বেতনক্রম উল্টে যায়, তাহলে বাস্তবায়নের আগে কিংবা বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে সেই জায়গাগুলো চিহ্নিত করে সংশোধনের ব্যবস্থা থাকা একান্ত প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি ঠেকানো কোনো সমাধান নয়। বরং যাঁরা উচ্চতর গ্রেডে আছেন বা দীর্ঘ চাকরিজীবনের কারণে টাইমস্কেল ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা অর্জন করেছেন, তাঁদের বেতনও এমনভাবে সুরক্ষিত করা প্রয়োজন, যাতে নতুন কাঠামোয় তাঁদের জ্যেষ্ঠতার মূল্য হারিয়ে না যায়।
প্রয়োজনে বেতন সুরক্ষা, ব্যক্তিগত বেতন, অতিরিক্ত ধাপ বা বিশেষ সমন্বয়ের মতো ব্যবস্থা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা ভাবতে পারেন। এতে নতুন পে-স্কেলে সিনিয়র-জুনিয়র সকলের সুবিধা অক্ষুণ্ন থাকবে। তাই নতুন ফিক্সেশনের পর কোথায় অসামঞ্জস্য হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে বিশেষ পদ্ধতিতে নিরসন করা গেলে কোন গ্রেডের কর্মচারীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না।নতুন পে-ফিক্সেশন বিধিমালার কারণে জ্যেষ্ঠ কর্মচারীর বেতন যেন তাঁর জুনিয়রের নিচে নেমে না যায়, সেটি নিশ্চিত করা একান্ত আবশ্যক।
শিক্ষক ও লেখক।
গ্রাম – সাভার
পোস্ট – হেমগঞ্জ বাজার
উপজেলা – নান্দাইল
জেলা – ময়মনসিংহ
বিভাগ – ময়মনসিংহ
ফোন 01737939451

