পরমাণবিক বিদ্যুতের যুগে বাংলাদেশ, উন্নয়নের স্বপ্ন ও নিরাপত্তার প্রশ্ন
— আশফাকুজ্জামান
বিদ্যুতের আলোয় বদলে যায় একটি দেশের অর্থনীতি। বদলে যায় মানুষের জীবন, শিল্পের গতি, প্রযুক্তির বিস্তার। সেই আলোর উৎস যখন পরমাণুর গভীরে লুকিয়ে থাকা বিপুল শক্তি, তখন সম্ভাবনার পাশাপাশি সামনে এসে দাঁড়ায় দায়িত্ব ও নিরাপত্তার কঠিন প্রশ্ন।
স্টারট্রেক ড্রিম আয়োজিত, ৮ অক্টোবর, ‘পরমাণবিক বিদ্যুতের যুগে বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আলোচনায় এর সম্ভাবনা, প্রত্যাশা ও উদ্বেগের নানা দিক আসে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ইতিহাসে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও পরিকল্পনার পথ ধরে দেশ প্রবেশ করছে উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন বাস্তবতায়।
অনুষ্ঠানের ব্যানারে ছিল পরমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছবি। সামনে বসেছিলেন বিশেষজ্ঞ, আমন্ত্রিত অতিথি ও আলোচকেরা। তাঁদের আলোচনায় উঠে আসে প্রযুক্তির অগ্রগতি, বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং জাতীয় উন্নয়নে পরমাণবিক শক্তির সম্ভাব্য ভূমিকা।
কিন্তু উন্নয়নের গল্প কখনো একমাত্রিক নয়। প্রতিটি বড় অর্জনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কিছু দায়িত্ব, কিছু সতর্কতা। পরমাণবিক বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নেই।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্ঘটনা মানুষের মনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। জাপানের ফুকুশিমা ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের চেরনোবিল সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এসব ঘটনা মনে করিয়ে দেয়। আধুনিক প্রযুক্তির সক্ষমতা যতই বিস্ময়কর হোক, নিরাপত্তার প্রশ্নে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই।
আলোচনায় রূপপুরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আশ্বাসের কথা আসে। বলা হয়, কেন্দ্রটিতে উচ্চমানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এমন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষেত্রে আশ্বাসের পাশাপাশি প্রয়োজন তথ্যের স্বচ্ছতা, স্বাধীন তদারকি, নিয়মিত পরীক্ষা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার কার্যকর প্রস্তুতি।
এ কারণেই সাধারণ আলোচকদের প্রশ্নগুলো ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে? দুর্ঘটনার আশঙ্কা মোকাবিলায় কী ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে? আশপাশের মানুষের সুরক্ষা, পরিবেশের সংরক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? এসব প্রশ্ন উন্নয়নের বিরোধিতা নয়। বরং উন্নয়নকে আরও দায়িত্বশীল ও জনবান্ধব করে তোলার অংশ।
এই গোলটেবিলের তাৎপর্য এখানেই। একদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা, অন্যদিকে মানুষের জীবন ও পরিবেশের সুরক্ষা—দুটিকে পাশাপাশি রেখে ভাবতে হবে বাংলাদেশকে। বিদ্যুৎ কেবল উৎপাদনের হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ।
পরমাণবিক বিদ্যুতের যুগে বাংলাদেশের যাত্রা তাই শুধু নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের গল্প নয়। এটি আস্থার গল্প, দায়িত্বের গল্প এবং প্রশ্ন করার অধিকারকে সম্মান করার গল্পও।
এ আলোচনা অনুষ্ঠানে মুখ্য আলোচক ছিলেন —মেজর জেনারেল জীবন কানাই দাস (অব.), কান্ট্রি ডিরেক্টর স্যার উইলিয়াম ভেভারিজ ফাউন্ডেশন। জনাব মাসুদ কামাল, সাবেক চেয়ারম্যান বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। ড. জাহাঙ্গীর আলম, অধ্যাপক ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ড. মো. কবীর হোসেন, প্রকল্প পরিচালক রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন প্রকল্প। শাহজাহান মৃধা বেনু, বিজ্ঞানভিত্তিক লেখক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। অনুষ্ঠান পরিকল্পনা, গ্রন্থনা ও সঞ্চালনায় ছিলেন—বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা ও অনুষ্ঠান পরিকল্পক বিটিভি, রূশো তাহের।
বিশেষজ্ঞরা তাঁদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের আলোকে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে পরমাণবিক প্রযুক্তির বৈজ্ঞানিক দিক, নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা এবং এ খাতে দক্ষ জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলার গুরুত্ব। এমন আলোচনা মানুষের মনে জমে থাকা সংশয় দূর করতে পারে, যদি তার সঙ্গে থাকে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও জবাবদিহি।
এ ছাড়াও আমন্ত্রিত অতিথি ও প্রাজ্ঞ আলোচকদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক শরীফ আহমেদ লেখক, শিক্ষাবিদ ও শিশু সংগঠক। অধ্যাপক হীরেন্দ্র শেখর রায় চৌধুরী,। অধ্যাপক আফজাল রহমান, সহ-সভাপতি ব্রতচারী বাংলাদেশ। ড. গোলাম মোর্শেদ বিজ্ঞান-অনুরাগী। রিপন কুমার দেবনাথ, নির্বাহী পরিচালক বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন, অধ্যাপক ভূ-তাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। । ড. মো. ইকবাল হোসেন, সহকারী অধ্যাপক নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ড. শোভন কুমার কুন্ডু, সহকারি অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ। রবীন্দ্র কুমার রায়, গবেষক। মিজানুর রহমান প্রামাণিক, সাবেক পরিচালক প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি), লেখক ও গবেষক। শফিকুল ইসলাম, প্রাক্তন মহাব্যবস্থাপক বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড। আশরাফুজ্জামান কবি, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক। আতিকুল ইসলাম প্রামাণিক, উন্নয়নকর্মী। স্বপন আচার্য কবি ও সাংস্কৃতিক কর্মী।
উন্নয়নের আলো তখনই সত্যিকার অর্থে উজ্জ্বল হয়, যখন সেই আলোয় মানুষের ভয় কমে, জ্ঞানের পরিধি বাড়ে এবং নিরাপত্তার প্রতি আস্থা দৃঢ় হয়। রূপপুরকে ঘিরে বাংলাদেশের প্রত্যাশাও হোক তেমন—প্রযুক্তিতে অগ্রগতি, নিরাপত্তায় আপসহীনতা এবং মানুষের কাছে স্বচ্ছ জবাবদিহি।
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও সংগঠক

