জাতির শত্রু ও মিত্র– ড. শেখ আকরাম আলী

by protibimbo
0 মন্তব্য 40 বার পড়া হয়েছে

জাতির শত্রু ও মিত্র
ড. শেখ আকরাম আলী

বাংলাদেশ এই মুহূর্তে শত্রু মুক্ত নয় এবং এর কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুও নেই। প্রতিটি দেশের শত্রু থাকতে পারে, তবে একই সাথে কিছু ভালো বন্ধুও থাকতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন; সীমানার খুব কাছে বাংলাদেশের কোনো প্রকৃত বন্ধু নেই। বিশ্বের একমাত্র মুসলিম দেশ বাংলাদেশ, যার প্রতিবেশী হিসেবে কোনো মুসলিম দেশ নেই। দেশের মানুষই এখানকার প্রকৃত বন্ধু এবং তারা এখন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে রয়েছে।

স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের যাত্রা শুরুর পর থেকে বর্তমান অবস্থা এবং এর প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করা যাক। দুর্ভাগ্যবশত, আমরা এমন একটি দেশ দ্বারা পরিবেষ্টিত যারা আমাদের পরম বন্ধু বলে ভান করে কিন্তু শত্রুর মতো আচরণ করে এবং সূচনা থেকেই বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নিতে পারে না। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করার কারণে ভারত বাংলাদেশকে তাদের নিজস্ব সম্পত্তি বলে মনে করে।

ভারত বিশ্বাস করে যে তাদের সমস্ত চাহিদা ও চাওয়া বাংলাদেশকে পূরণ করতে হবে এবং তারা বাংলাদেশকে সবকিছুর জন্য অনির্দিষ্টকালের জন্য তাদের ওপর নির্ভরশীল করে রাখতে চায়। ভারতের মতে, নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশের চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নেই, কারণ ভারত একটি বন্ধুভাবাপন্ন দেশ এবং তাদের কাছ থেকে কোনো নিরাপত্তার হুমকি নেই। তারা চায় বাংলাদেশ নিজস্ব স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ছাড়া ভারতের একটি নির্ভরশীল অনুগত রাষ্ট্র (Client State) হয়ে থাকুক। তারা সবসময় বাংলাদেশকে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে নিরুৎসাহিত করে। সাম্প্রতিক ‘মক্কা চুক্তি’ এর একটি জলন্ত উদাহরণ, এবং তারা চায় না বাংলাদেশ এই চুক্তিতে যোগ দিক।

Banner

ভারত একটি পরিকল্পিত উপায়ে বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় যাতে এর অর্থনীতি কখনো স্বনির্ভর হতে না পারে এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে না পারে। সমুদ্র আইন লঙ্ঘন করে তারা নদীগুলো নিয়ন্ত্রণ করে এবং বাংলাদেশের সাথে পানি বণ্টন করে না। তিস্তা ব্যারেজ চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে এবং তিস্তা প্রকল্পে চীনকে এগিয়ে আসতে দিচ্ছে না। দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এক চরম বাধা হিসেবে বিবেচিত।

তারা পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসীদের উসকানি বা সমর্থন দেয়, যা সেখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সর্বদা অস্থির করে রাখে। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অনুপ্রবেশের পেছনেও তাদের হাত ছিল এবং তারা বাংলাদেশের বিপরীতে মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে সমর্থন করে। অতীতে বাংলাদেশের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কখনোই বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না, অথচ তারা নিজেদের সবচেয়ে বন্ধুভাবাপন্ন দেশ বলে দাবি করে।

বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান অনেক দূরে থাকা সত্ত্বেও এবং তারা কোনোভাবেই বাংলাদেশের মানুষের ক্ষতি করার মতো কোনো পদক্ষেপ নিতে না পারা সত্ত্বেও, তারা সমাজে পাকিস্তানকে বাংলাদেশের স্থায়ী শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করার একটি পরিবেশ তৈরিতে সফল হয়েছে। তারা বাংলাদেশের একদল মানুষের মধ্যে ভারতপন্থী মানসিকতা তৈরিতেই কেবল সফল হয়নি, বরং নিজেদের সরাসরি এজেন্টও তৈরি করেছে যারা তাদের হয়ে কাজ করছে।

ভারত সাধারণ জনগণকে বিশ্বাস করে না বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলকে তাদের বন্ধু বলে মনে করে না। তারা বাংলাদেশের মানুষের সাথে নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সাথে বন্ধুত্ব রাখতে পছন্দ করে। আর এটিই বাংলাদেশের জন্মের পর থেকে তাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল নীতি।

শেখ হাসিনার পতন এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও তারা বাংলাদেশের প্রতি তাদের পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তন করেনি। এর বদলে, তারা ভারতে অবস্থানরত পরাজিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনাকে নোংরা রাজনীতি চালিয়ে যেতে ইন্ধন দিয়ে যাচ্ছে। এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল হলেও তারা সেটিকে পরোয়া করে না। বাংলাদেশের সার্বভৌম মর্যাদা উপেক্ষা করে নিজেদের স্বার্থ প্রতিষ্ঠা করাই তাদের এই ‘বড় ভাইয়ের মতো’ (Big Brotherly) আচরণের প্রকাশ।

এটি এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে এবং বাংলাদেশে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে ভারত সম্ভাব্য সবকিছুই করবে। বাংলাদেশের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে পাহাড়ের মানুষকে তাদের আন্দোলন জোরদার করতে উৎসাহিত করতেও তারা দ্বিধা করবে না। তারেক রহমানের বর্তমান সরকারের উদ্যোগকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্য নিয়ে পাহাড়ে, সমতলে এবং তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডের ভেতরে স্পষ্ট আলামত দেখা যাচ্ছে—অথচ পররাষ্ট্রনীতির দিক থেকে তারেক রহমান এ পর্যন্ত সঠিক পথেই হাঁটছেন বলে প্রমাণিত হয়েছে।

সরল ও আবেগপ্রবণ বাঙালি মুসলমানরা প্রকৃত, পরিপক্ক ও দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাবে খুব সহজেই বিভ্রান্তির শিকার হন। সাধারণ মানুষ তাদের বন্ধু ও শত্রুদের চিনতে পারলেও, রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতারা বাংলাদেশের আসল শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হন; ফলে তারা ভুল পথে চালিত হন এবং জেনে বা না জেনে শত্রুর উদ্দেশ্য সাধন করে বসেন।

সম্প্রতি ডাকসু (DUCSU) কার্যালয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বাংলাদেশের মানুষকে একটি ভুল বার্তা দিচ্ছে যে, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব দেশের সঠিক ইতিহাস প্রতিষ্ঠার মূল চেতনার বিষয়ে সমাজে বিভ্রান্তি তৈরির এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের পুরনো বয়ান বা ন্যারেটিভ কোনোভাবেই ফিরে আসা উচিত নয় এবং দেশের সঠিক ইতিহাস জানার ও অধ্যয়ন করার অধিকার থেকে জনগণকে বঞ্চিত করা যাবে না।

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঐতিহাসিক অবদান নিয়ে কথা বলতে সমস্যা কোথায়? যিনি দ্বিজাতি তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এবং কংগ্রেস নেতাদের যুক্তির বিপরীতে এর ওপর ভিত্তি করে পাকিস্তান সৃষ্টি করেছিলেন। বাংলাদেশে যখন গান্ধী ও নেহরুর জীবন ও রাজনীতি চর্চায় নিরুৎসাহিত করা হয় না, তখন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে গবেষণায় কেবল নিরুৎসাহিতই করা হয় না, বরং একশ্রেণীর লোক তার বিরোধিতাও করে—যারা আর কেউ নয়, বাংলাদেশের বাহ্যিক শত্রুদের অর্থের বিনিময়ে নিয়োজিত এজেন্ট। এটি ভালো কোনো লক্ষণ নয়; জাতীয়তাবাদী শক্তির ভেতরের শত্রুরাই হয়তো দেশ এবং জুলাইয়ের চেতনার বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে। এটি শেখ হাসিনার বিগত ফ্যাসিবাদী শাসন এবং তার প্রভু ভারতের বয়ান। আমরা কি আবারও সেই পেছনের দিকে ফিরে যাব এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক শত্রুদের দেয়া বয়ান মেনে নেব, যারা সাম্প্রতিক জুলাই বিপ্লবের অর্জনকে ধ্বংস করতে সক্রিয়?

জাতীয় স্বার্থের খাতিরে বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস অধ্যয়ন করা ও জানা জনগণের অধিকার, যা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিম জাতীয়তাবাদের উত্থান ও বিকাশে যে মহান নেতারা অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখে গেছেন, তাদের অবদান না জানলে আমাদের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

আজকের বাংলাদেশ হলো দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিম পুনর্জাগরণের ফল, যা ১৮৫৭ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পর শুরু হয়েছিল। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গকে বাংলা অঞ্চলের মুসলমানদের রাজনৈতিক উত্থানের একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নওয়াব সলিমুল্লাহ, যিনি দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করেছিলেন, তার ঐতিহাসিক অবদানকে কেবল শত্রুরাই ছোট করে দেখতে চাইবে; তার অনুপস্থিতিতে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সেই মিশনকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যান এবং পাকিস্তান সৃষ্টির মাধ্যমে তা পূর্ণতা দেন।

তিনি কোনোভাবেই বাঙালিদের বিরুদ্ধে ছিলেন না; বরং তিনি শেখ মুজিব এবং তার রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ বাঙালি নেতাদের নেতা ছিলেন। শেখ মুজিব পাকিস্তানের কারণেই রাজনৈতিক খ্যাতি অর্জন করতে পেরেছিলেন এবং এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছিল। এগুলো ইতিহাসের অংশ এবং বাংলাদেশকে নিজেদের অনুগত রাষ্ট্র (Client State) হিসেবে টিকিয়ে রাখার কুপরামর্শ বা মন্দ উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য কেবল দেশের শত্রুরাই এতে দ্বিমত পোষণ করবে। সঠিক ইতিহাস একটি জাতিকে সঠিক অভিমুখে এগিয়ে যেতে পথ দেখায়।

প্রতিবেশীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই এবং সরকার একা এর মুখোমুখি হতে পারবে না। প্রতিবেশীর আধিপত্যবাদী নকশাকে প্রজ্ঞার সাথে দমন করতে সরকার ও বিরোধী দলকে হাত মেলাতে হবে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ইসলামী শক্তির উত্থানকে ভারতের স্বার্থের জন্য এক বিশাল হুমকি হিসেবে দেখা হয় এবং ভারত একে তাদের চরম শত্রু মনে করে; তাই ভারত জাতীয়তাবাদী শক্তিকে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে তাদের খেলা খেলতে চায়। তাদের বর্তমান লক্ষ্য হলো এদের বিভাজিত রাখা। বিশ্বের অন্যান্য অনেক গণতান্ত্রিক দেশের মতো বাংলাদেশের মানুষও ভবিষ্যতে জাতীয় স্বার্থে দ্বিদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠতে দেখতে আগ্রহী।

সংকটের সময়ে সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় যারা দ্বিধাহীনভাবে এগিয়ে আসবে ও সাহায্য করবে, শত্রুদের বিরুদ্ধে জাতিকে অবশ্যই এমন প্রকৃত বন্ধুদের খুঁজে নিতে হবে। আর কেবল পাকিস্তানই সঠিক সময়ে আমাদের মানসিক ও সামরিক সহায়তা দিতে পারে। চীনের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আমাদের জন্য অপরিহার্য, অন্যদিকে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনে সরাসরি সহায়তার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সমর্থনকেও এই মুহূর্তে উপেক্ষা করা যাবে না।

প্রকৃত বন্ধুদের খুঁজে বের করা এবং আসল শত্রুদের চিহ্নিত করা বর্তমান সরকারকে ভবিষ্যতের সব হুমকি ও চ্যালেঞ্জ সাহসিকতা ও দৃঢ়তার সাথে মোকাবিলা করতে সাহায্য করতে পারে। জাতীয় লক্ষ্য অর্জনের জন্য যেকোনো মূল্যে জনগণের ঐক্য বজায় রাখতে হবে।

লেখক একজন আইনের অধ্যাপক।

১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬।

সম্পর্কিত খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল খায়ের 

নির্বাহী সম্পাদক: 
বার্তা প্রধান:

অফিস: বাড়ি ২৫ (দ্বিতীয় তলা), সড়ক ৫, সেক্টর ৬, উত্তরা, ঢাকা।

যোগাযোগ: ০১৭১৫৩৬৩০৭৯

বিজ্ঞাপন: ০১৮২৬৩৯৫৫৪৯

Email: khair.hrm@gmail.com

info@dainikprotibimbo.com

protibimboprokash.com

ফেসবুকে আমরা

©2025 Dainik Protibimbo – All Right Reserved. Designed and Developed by Bangla Webs