সৌদি-বাংলাদেশ সম্পর্ক: ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
ড. শেখ আকরাম আলী
১৯৭৫ সালে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার বহু শতাব্দী আগে থেকেই বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে গভীর ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় সম্পর্ক বিদ্যমান। ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে সতর্ক কূটনৈতিক স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সৌদি-বাংলাদেশ সম্পর্ক পরবর্তীতে শ্রমিক অভিবাসন, ধর্মীয় সদ্ভাব এবং ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপ নিয়েছে।
দুই দেশের বর্তমান সম্পর্কের গভীরে যাওয়ার আগে চলুন ইতিহাসের পাতাগুলোতে একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। মধ্যযুগীয় আমলে বাংলার সালতানাতের শাসকেরা হিজাজ অঞ্চলে (বর্তমান সৌদি আরব) ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন। সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ মক্কা ও মদিনায় ‘বাঙালিয়া মাদ্রাসা’ নামে পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের অর্থায়ন করেছিলেন। সুলতান জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ মক্কার শরীফের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন এবং পবিত্র দুই নগরীর অধিবাসীদের জন্য প্রচুর উপহার ও সম্মানসূচক পোশাক পাঠাতেন। এই সময়ে বাংলা তার ধন-সম্পদের জন্য সুখ্যাত ছিল।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের পর, আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু হয় ১৯৭৫ সালে সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর—যা ওআইসি (OIC)-র আলোচনার মাধ্যমে আরও সুদৃঢ় হয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ সৌদি আরবের সাথে একটি বিশেষ গুরুত্ব সংযুক্ত করে, যা ইসলামের জন্মভূমি। যৌথ ইসলামিক মূল্যবোধ এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সহজতর করেছে, যার মূলে রয়েছে বার্ষিক হজ পালন এবং ধর্মীয় পণ্ডিতদের শিক্ষাসংক্রান্ত আদান-প্রদান।
১৯৭৭ সালের জুলাই মাসে জিয়াউর রহমানের সফরের মাধ্যমে সৌদি আরবের সাথে সম্পর্কের ভীত আরও মজবুত হতে শুরু করে এবং তা দ্রুত এশিয়ার দুই মুসলিম দেশের মধ্যে এক অর্থপূর্ণ বন্ধুত্বে পরিণত হয়। বর্তমানে ২৫ লক্ষেরও বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি বছরে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন; যার মাধ্যমে সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সুসংগঠিত করতে সৌদি আরব বিশাল বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে এসেছিল। রিয়াদ বিগত দশকগুলোতে অবকাঠামো, কৃষি ও রেলওয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অর্থায়ন, অনুদান ও ঋণ প্রদান করেছে। পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মুসলিম দেশও বাংলাদেশকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করে।
সৌদি আরবের নেতৃত্বে পুরো মুসলিম বিশ্বের আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। দেশটি বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি নেওয়া শুরু করে এবং তা বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের একমাত্র বড় উৎসে পরিণত হয়। জিয়াউর রহমানের নানামুখী উদ্যোগে এই খাতে দ্রুত অগ্রগতি সাধিত হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের অনেক মুসলিম দেশ বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি নিয়োগে এগিয়ে আসে।
সৌদি-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব একটি সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং সময়ের সাথে সাথে তা দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়েছে। বর্তমানে ত্রিশ লক্ষেরও বেশি মানুষ সৌদি আরবে কর্মরত আছেন এবং এই শ্রমিকেরা বাংলাদেশের জন্য রেমিট্যান্সের একটি বিরাট উৎস। বাংলাদেশের মানুষ সৌদি আরবের সাথে এই ক্রমবর্ধমান সম্পর্ককে অত্যন্ত আনন্দের সাথে স্বাগত জানায়। শুরু থেকে আজ অবধি তারা বাংলাদেশের একজন প্রকৃত বন্ধু হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে।
দ্বিপাক্ষিক এই সম্পর্ক এখন আর কেবল প্রথাগত জনশক্তি রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সৌদি নেতৃত্ব বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত দেশ হিসেবে বিবেচনা করছে। সৌদি প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশনগুলো বাংলাদেশের জ্বালানি অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য শক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগে ব্যাপক আগ্রহ দেখাচ্ছে।
অতীতের প্রতিটি সরকারই সৌদি আরবের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে, বিশেষ করে এরশাদ এবং খালেদা জিয়ার শাসননামলে। এরশাদ এবং খালেদা জিয়া দুজনকেই সৌদি সরকার যথাযথ সম্মানে ভূষিত করেছিল। তাঁরা উভয়ই একাধিকবার দেশটিতে সফর করেন এবং এই দুই ভ্রাতৃপ্রতীম মুসলিম দেশের সম্পর্ককে সর্বোচ্চ চূড়ায় উন্নীত করেন। এরশাদের আমন্ত্রণে যুবরাজ মোহাম্মদ সুলতান বিন আব্দুল আজিজ বাংলাদেশ সফর করেছিলেন এবং সেই সফরকালে তিনি বিএমএ (বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি) পরিদর্শন করেন। লেখক সৌভাগ্যবশত সে সময় বিএমএ-তে অবস্থান করায় যুবরাজের সাথে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পেয়েছিলেন।
১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে যে সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল, তাতে সৌদি আরব কেবল বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য সর্ববৃহৎ বৈশ্বিক গন্তব্যেই পরিণত হয়নি, বরং বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, সৌদি সরকারও দেশের প্রতিটি প্রশাসনের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ের কূটনৈতিক ও কৌশলগত সামঞ্জস্যের অংশ হিসেবে লোহিত সাগরের বাণিজ্য সুরক্ষায় সৌদি নেতৃত্বাধীন সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোটে বাংলাদেশের যোগদান একটি গভীরতর নিরাপত্তা সংলাপ এবং সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন অংশীদারিত্বের ইঙ্গিত দেয়।
উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা, যেমন বাংলাদেশের প্রতিমন্ত্রী এবং সৌদি পররাষ্ট্র নেতৃত্বের মধ্যকার বৈঠকগুলো উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সফর এবং বর্ধিত বাণিজ্য চুক্তির পথ সুগম করে চলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কৌশলগত নির্ভরতা কমানোর উদ্দেশ্যে সৌদি আরবের উদ্যোগে সম্প্রতি ২০২৬ সালের ৭ই আগস্ট স্বাক্ষরিত ‘মক্কা চুক্তি’ তাদের কৌশলগত স্বার্থকে আরও উঁচুতে তুলে ধরেছে। সেই সাথে এটি বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে, যা বিগত কয়েক দশকে ওআইসি (OIC) করতে ব্যর্থ হয়েছিল।
বাংলাদেশকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে ‘মক্কা চুক্তি’ (Makkah Pact) এক সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে ভারতের মতো প্রতিবেশীরা এটিকে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থী বলে মনে করছে। অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই নতুন গঠিত এই জোটে বাংলাদেশ যোগদান করুক—এমনটা সৌদি আরব আশা করবে। তবে ভারতীয় গণমাধ্যম এবং কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মক্কা চুক্তির বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং বাংলাদেশকে এতে যোগ না দেওয়ার জন্য নিরুৎসাহিত করছে। তারা চায় বাংলাদেশ যেন এই চুক্তি থেকে দূরে থাকে, কারণ তারা ভবিষ্যতে এর দূরপ্রসারী ও ইতিবাচক পরিণতির কথা ভালোভাবেই জানে।
বাংলাদেশ আজ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে প্রতিবেশীর আধিপত্যবাদী নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, আর অন্যদিকে মক্কা চুক্তিতে যোগ দিয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা—যার কারণে ভারতের মতো প্রতিবেশী তারেক রহমানের বর্তমান সরকারকে নানাভাবে কোণঠাসা বা হেনস্তা করার চেষ্টা করতে পারে।
ভারতের পক্ষ থেকে আসা যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। তবে এই সুযোগ আমাদের হাতছাড়া করা উচিত নয়; কারণ এটি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করবে। সৌদি আরবভিত্তিক এই প্রতিরক্ষা চুক্তির পাশে দাঁড়াতে এবং যত দ্রুত সম্ভব এতে যোগ দিতে পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকারের প্রতি সমর্থন জানাতে হবে।
আমাদের যখনই সহায়তা ও সমর্থনের প্রয়োজন হয়েছিল, তখন সৌদি আরবের নেতৃত্বে বিশ্বের মুসলিম দেশগুলো এগিয়ে এসেছিল এবং একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পাশে দাঁড়িয়েছিল। এটি জিয়াউর রহমানের সরকারের জন্য বড় সাফল্য এনে দিয়েছিল, যা ভারতের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যেই দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত করেছিল।
বাংলাদেশ এখন সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ককে অন্তর্ভুক্ত করে গড়ে ওঠা এই বৃহৎ নিরাপত্তা কাঠামোতে নিজের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করছে। মধ্যপ্রাচ্য ও আঞ্চলিক অংশীদারদের সাথে এই ধরণের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা ভারতের মতো প্রতিবেশী শক্তির সাথে কূটনৈতিক ভারসাম্যের এক বড় পরীক্ষা। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোন দিকে যাবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে সরকারের আসন্ন সিদ্ধান্ত এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের জন্য তাঁর দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এখন সময় এসেছে তারেক রহমানের—সাহস ও দূরদর্শিতা প্রদর্শন করে মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে বিষয়টিকে আরও এগিয়ে নেওয়ার। এখন ঘোষণা দেওয়ার উপযুক্ত সময় যে, *“আমরা কোনো দেশ বা পরাশক্তির বিরুদ্ধে নই; বরং মুসলিম ভ্রাতৃপ্রতীম দেশগুলোর সাথে হাত মিলিয়ে কেবল দেশের মানুষ ও জাতীয় স্বার্থের রক্ষায় আমরা বদ্ধপরিকর।”
এটি নিশ্চিতভাবেই আমাদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাকে শক্তিশালী করবে, পাশাপাশি ভবিষ্যতে আমাদের অর্থ ও জ্বালানি খাতের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটাবে।
লেখক: ড. শেখ আকরাম আলী, অধ্যাপক (আইন বিভাগ) ও সম্পাদক, মিলিটারি হিস্ট্রি জার্নাল
৩০ আগস্ট ২০২৬

