হিরোশিমা-নাগাসাকি থেকে মানবতার আলোর পাথে। আশফাকুজ্জামান

by protibimbo
0 মন্তব্য 56 বার পড়া হয়েছে

হিরোশিমা-নাগাসাকি থেকে মানবতার আলোর পাথে…
কিছু দিন ক্যালেন্ডারে আসে না। কিছু দিন ইতিহাস হয়ে আসে। কিছু তারিখ শুধু মনে রাখার নয়। বুকের ভেতর ধারণ করার। ৬ আগস্ট। ৯ আগস্ট। হিরোশিমা। নাগাসাকি। দুটি শহরের নাম। অথচ তার ভেতর লুকিয়ে আছে পুরো মানবসভ্যতার কান্না। আজও সেই কান্না থামেনি। আজও বাতাসে ভেসে আসে একটি প্রশ্ন—মানুষ কি সত্যিই সভ্য হয়েছে?
এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়েই অনুষ্ঠিত হলো ‘স্মরণে ও শঙ্কায় হিরোশিমা–নাগাসাকি’ শীর্ষক এক গভীর ও ব্যতিক্রমী আলোচনা অনুষ্ঠান। আজ ৯ আগস্ট। নাগাসাকির সেই ভয়াল দিনের স্মরণে শান্তিনগরের সিডেশ্বরী লেনের লালন কেন্দ্রে বসেছিল এই মানবিক আয়োজন। আয়োজন করেছিল বেনুভিটা অ্যাস্ট্রো অবজারভেটরি। বিষয় ছিল পারমাণবিক শক্তি। কিন্তু আলোচনার গভীরে ছিল মানুষ। ছিল মানবসভ্যতা। ছিল পৃথিবীর ভবিষ্যৎ।

সন্ধ্যার আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। কিন্তু আলোচনার বিষয় ছিল অন্ধকার। সেই অন্ধকারের নাম যুদ্ধ। সেই অন্ধকারের নাম পারমাণবিক অস্ত্র। আর তার বিপরীতে ছিল মানুষের অমর আকাঙ্ক্ষা। শান্তি। সহাবস্থান। ভালোবাসা।
ব্যানারের দিকে তাকালেই যেন পুরো অনুষ্ঠানের দর্শনটি চোখে পড়ে। একটি পৃথিবী। চারপাশে মানুষ। হাতে কাগজের সারস (শান্তির প্রতীক)। আর স্মৃতির ভেতর দাঁড়িয়ে আছে পারমাণবিক ধ্বংসের প্রতীক। কী অদ্ভুত বৈপরীত্য! একদিকে পরমাণুর শক্তি। অন্যদিকে কাগজের সারস। একদিকে ধ্বংসের ক্ষমতা। অন্যদিকে শান্তির স্বপ্ন। মানুষই দুটির স্রষ্টা। তাই আজকের আলোচনা শুধু বিজ্ঞানের আলোচনা ছিল না। ছিল মানুষের আলোচনা। মানুষের বিবেকের আলোচনা। মানুষের ভবিষ্যতের আলোচনা।

সভাপতির আসনে ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান মৃধা বেনু। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন রুশো তাহের। তাঁর সাবলীল সঞ্চালনায় একের পর এক উঠে আসে ইতিহাসের নানা অধ্যায়। উঠে আসে বিজ্ঞানের বিস্ময়। উঠে আসে তার ভয়ংকর সম্ভাবনাও। কথা হয় হিরোশিমা নিয়ে। কথা হয় নাগাসাকি নিয়ে। কথা হয় সেই সকালগুলোর কথা। যে সকাল আর কখনো স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি।
১৯৪৫ সালের আগস্ট। পৃথিবী তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত বয়ে চলেছে। তারপর আকাশ থেকে নেমে এলো আগুন। একটি বোমা। একটি বিস্ফোরণ। আর মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল একটি শহরের ইতিহাস। হিরোশিমা যেন মানুষের তৈরি এক প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়াল। কয়েক দিন পর নাগাসাকি। আরও একটি শহর। আরও একটি বিস্ফোরণ। আরও অসংখ্য মানুষের জীবন।
তারপর পৃথিবী বুঝল। মানুষ এমন অস্ত্র বানিয়েছে, যা মানুষকেই শেষ করে দিতে পারে।
এখানেই আজকের আলোচনার সবচেয়ে বড় বেদনা। বিজ্ঞান আমাদের দিয়েছে আগুন। সেই আগুনে আমরা আলোও জ্বালাতে পারি। আবার পৃথিবীও পুড়িয়ে দিতে পারি। তাই বিজ্ঞানকে দোষী করে লাভ নেই। বিজ্ঞান নিরপেক্ষ। মানুষের হাতেই তার দিক নির্ধারিত হয়।
একই পরমাণু থেকে বিদ্যুৎ আসতে পারে। চিকিৎসায় জীবন বাঁচতে পারে। কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। শিল্প ও গবেষণায় খুলে যেতে পারে অজানা দরজা। আবার সেই শক্তিই হয়ে উঠতে পারে মৃত্যুর অস্ত্র। সেই দ্বৈততার কথাই উঠে এসেছে আজকের আলোচনায়।
আলোচনায় অংশ নেওয়া বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা বলেছেন শক্তির কথা। বলেছেন তার সম্ভাবনার কথা। বলেছেন তার কল্যাণকর ব্যবহারের কথা। আলোচনায় উঠে এসেছে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের নানা দিক। উঠে এসেছে চিকিৎসা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি, শিল্প ও গবেষণায় এর সম্ভাবনার কথা।

তাঁদের বক্তব্যে একটি সত্য স্পষ্ট হয়েছে। পরমাণু নিজে অভিশাপ নয়। অভিশাপ হতে পারে তার অপব্যবহার। বিজ্ঞান নিজে ধ্বংস চায় না। ধ্বংস চায় মানুষের লোভ। মানুষের ক্ষমতার উন্মত্ততা।
এখানেই সাহিত্য এসে দাঁড়ায় বিজ্ঞানের পাশে। বিজ্ঞান জিজ্ঞেস করে—কীভাবে? সাহিত্য জিজ্ঞেস করে—কেন? বিজ্ঞান বলে—একটি বিস্ফোরণে কত শক্তি উৎপন্ন হয়। সাহিত্য বলে—সেই বিস্ফোরণে কতগুলো মানুষের স্বপ্ন ভেঙে যায়। একটি পরিসংখ্যান বলে—কত মানুষ মারা গেল। একজন কবি দেখতে পান—একটি শিশুর মুখ হারিয়ে গেল। একজন বিজ্ঞানী দেখেন তেজস্ক্রিয়তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। একজন সাহিত্যিক দেখেন—একটি মায়ের বুক খালি হয়ে গেল। এই দুই দৃষ্টির মিলনেই আজকের অনুষ্ঠানটি হয়ে উঠেছিল অনন্য।
হিরোশিমা–নাগাসাকির ইতিহাসকে শুধু যুদ্ধের ইতিহাস হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মানুষের বিবেকের ইতিহাস। একটি শহর ধ্বংস হতে পারে। কিন্তু তার স্মৃতি ধ্বংস হয় না। একটি বাড়ি পুড়ে যেতে পারে। একটি প্রজন্ম হারিয়ে যেতে পারে। একটি শহর ছাই হয়ে যেতে পারে। তবু মানুষের স্মৃতি বেঁচে থাকে।
সেই স্মৃতিই আজ আমাদের সতর্ক করে। বলে—আর নয়। আর কোনো হিরোশিমা নয়। আর কোনো নাগাসাকি নয়।

Banner

আজকের আলোচনা তাই শুধু অতীতের দিকে তাকানো নয়। এটি ভবিষ্যতের দিকে তাকানো। ‘স্মরণ’ আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় পেছনে। ‘শঙ্কা’ আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয় সামনে। এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে মানুষ। তার এক হাতে বিজ্ঞান। অন্য হাতে বিবেক। বিজ্ঞান যদি মানুষের জন্য হয়, তবে তার শেষ গন্তব্যও মানুষ হওয়া উচিত। বোমা যদি মানুষের হাতে থাকে, তবে সেই হাতকে থামাতে হবে মানুষের বিবেক দিয়ে। কারণ পৃথিবী ধ্বংস করার ক্ষমতা অর্জন করাই সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব নয়। পৃথিবীকে ধ্বংস না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারাই সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব।
এখানে হিরোশিমা শুধু একটি শহর নয়। নাগাসাকি শুধু একটি শহর নয়। তারা হয়ে উঠেছে মানবসভ্যতার আয়না। সেই আয়নায় আমরা নিজেদের মুখ দেখি। আমাদের জ্ঞান দেখি। আমাদের অহংকার দেখি। আমাদের সাফল্য দেখি। আবার আমাদের ভয়ংকর ব্যর্থতাও দেখি। হিরোশিমার ছাই যেন আজও বলে—শক্তিমান হও। কিন্তু নিষ্ঠুর হয়ো না।
নাগাসাকির নীরবতা যেন আজও বলে—জ্ঞান অর্জন করো। কিন্তু সেই জ্ঞান দিয়ে মৃত্যুর উৎসব করো না।
মানুষকে ভালোবাসো। পৃথিবীকে ভালোবাসো। কারণ এই পৃথিবী ছাড়া আমাদের আর কোনো পৃথিবী নেই।
ব্যানারের সেই ছোট্ট পৃথিবীটির দিকে তাকালে তাই মনে হয়, পৃথিবী আসলে কত ছোট! মানুষের বিভাজন কত বড়। ধর্মে বিভক্ত। রাষ্ট্রে বিভক্ত। ভাষায় বিভক্ত। মতাদর্শে বিভক্ত। অথচ বিপদের মুহূর্তে সবাই একই পৃথিবীর মানুষ।

অনুষ্ঠানের আলোচনায় সেই সার্বজনীন মানবিক বোধটিই বারবার ফিরে এসেছে। কেউ বিজ্ঞানের ভাষায় বলেছেন। কেউ ইতিহাসের ভাষায়। কেউ দর্শনের ভাষায়। কেউ সাহিত্যের ভাষায়। কিন্তু সুরটি ছিল এক।
মানুষ বাঁচুক।পৃথিবী বাঁচুক। সভ্যতা বাঁচুক।
বিজ্ঞান এগিয়ে যাক। কিন্তু মানবিকতাকে পেছনে ফেলে নয়। পরমাণুর শক্তি ব্যবহৃত হোক। কিন্তু মানুষের বিরুদ্ধে নয়। গবেষণাগারে আলো জ্বলুক। যুদ্ধক্ষেত্রে আগুন নয়। শিশুর হাতে বই থাকুক। বোমা নয়। আকাশে উড়ুক কাগজের সারস। মৃত্যুর ধোঁয়া নয়। আর পৃথিবী—এই একটিমাত্র নীল পৃথিবী—মানুষের লোভের কাছে নয়, মানুষের ভালোবাসার কাছে নিরাপদ থাকুক।
আজকের ‘স্মরণে ও শঙ্কায় হিরোশিমা–নাগাসাকি’ তাই শেষ হয়নি। বরং আলোচনার শেষ মুহূর্তে যেন তার আসল কথাটি শুরু হয়েছে। পৃথিবীকে ধ্বংস করার মতো শক্তি মানুষ অর্জন করেছে। এখন পৃথিবীকে রক্ষা করার মতো মানবিকতা অর্জন করাই মানুষের সবচেয়ে বড় কাজ।
হিরোশিমার ছাই থেকে। নাগাসাকির নীরবতা থেকে। আমাদের সেই মানবিকতার দিকেই ফিরে তাকাতে হবে।

এ অনুষ্ঠানের আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান জনাব মাসুদ কামাল, বাংলাদেশে পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক পরিচালক ও পরমাণু বিজ্ঞানী ড. মো. সাকিলুর রহমান, এফসিএস, এফঅইপিএম, প্যাকটিসিং চর্টার্ড সেক্রেটারি ও চিফ কনসালট্যান্ট ও এবিসি বাংলাদেশ লিমিটেড-এর এস আব্দুর রশীদ, দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ধীরেন্দ্র শেখর রায় চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক—ড. মো. মনিরুল ইসলাম, এবং অধ্যাপক ড. মো. আবদুল জব্বার, মো. ইসমাত তাকি, ম্যানেজিং পার্টনার, ফ্ল্যক্সেন গ্রুপ ও ফ্ল্যক্সেন ট্রেড প্যাক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন; ছড়াকার ও প্রাবন্ধিক নিজামুর রহমান, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট-এর আপীল বিভাগের অ্যাডভোকেট প্রহ্লাদ দেবনাথ, কবি ও সাংস্কৃতিক কর্মী স্বপন আচার্য। বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হালিম এবং কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও সংগঠক আশফাকুজ্জামানসহ আরও অনেকে।
এতগুলো ভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষের উপস্থিতিই যেন অনুষ্ঠানের মূল ভাবনাটিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছিল। কারণ পরমাণু শুধু পদার্থবিদ্যার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি, নৈতিকতা, দর্শন, সাহিত্য এবং সর্বোপরি মানবজীবন।
কারণ শেষ পর্যন্ত পরমাণুর চেয়েও শক্তিশালী হওয়া উচিত মানুষের বিবেক। আর মানুষের বিবেকের চেয়েও সুন্দর কোনো অস্ত্র পৃথিবী এখনো আবিষ্কার করতে পারেনি।

আশফাকুজ্জামান
কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও সংগঠক

সম্পর্কিত খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল খায়ের 

নির্বাহী সম্পাদক: 
বার্তা প্রধান:

অফিস: বাড়ি ০৭, সড়ক ১৪/সি, সেক্টর ৪,

উত্তরা, ঢাকা-১২৩০।

যোগাযোগ: ০১৭১৫৩৬৩০৭৯

বিজ্ঞাপন: ০১৮২৬৩৯৫৫৪৯

Email: khair.hrm@gmail.com

info@dainikprotibimbo.com

protibimboprokash.com

ফেসবুকে আমরা

©2025 Dainik Protibimbo – All Right Reserved. Designed and Developed by Bangla Webs