সাংস্কৃতিক বাজেট: পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে গুরুত্বারোপ

ঢাকা, ২৬ জুলাই ২০২৬:

by protibimbo
0 মন্তব্য 16 বার পড়া হয়েছে
সাংস্কৃতিক খাতের বাজেটের যথাযথ বাস্তবায়ন, শিল্পীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিতকরণ, পাঠাভ্যাস বৃদ্ধি, চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর নিরাপত্তা এবং দেশের সব জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে সম্পৃক্ত করে ঐক্যের বাংলাদেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন দেশের বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, অভিনেতা, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও সরকারি কর্মকর্তারা।
রোববার ২৬ জুলাই, রাজধানীর লেভেল ৩, দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে দ্য ডেইলি স্টার আয়োজিত ‘সাংস্কৃতিক বাজেট: পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন’ শীর্ষক রাউন্ডটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ইমরান মাহফুজ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, এই আয়োজনটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা করেছে দ্য ডেইলি স্টার। এ জন্য তিনি দ্য ডেইলি স্টার, সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম এবং অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অতিথিদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।
তিনি বলেন, মানুষ মনে করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কাজ শুধু গান-বাজনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু সংস্কৃতির যে বিশালতা ও ব্যাপকতা রয়েছে, তা নিয়ে সরকার কাজ শুরু করেছে। “আমরা ঐক্যের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই,” উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমতলের পাশাপাশি দেশে প্রায় ৫০টি নৃগোষ্ঠী রয়েছে। তাদের সংস্কৃতিকে সম্পৃক্ত করে একটি ঐক্যবদ্ধ ও সবার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চান তারা।
নিতাই রায় চৌধুরী আরও বলেন, শিল্পীদের আর ‘দুস্থ শিল্পী’ হিসেবে পরিচয় করাতে চান না। শিল্পীদের এ সমস্যা সমাধানে সৃজনশীল অর্থনীতির দিকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার এগিয়ে যাবে।
দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, মানুষের রুচি ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে, যার পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেরও ভূমিকা রয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সুস্থ শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা ও নির্মাণ জরুরি। তিনি বলেন, আজকের আয়োজনটি শুধু সাংস্কৃতিক খাতের বাজেট নিয়ে নয়, বরং বাজেটের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়েও। তিনি বলেন, তিনি এই অঙ্গনের মানুষ নন; সংশ্লিষ্টরা এ অঙ্গনের বিষয়গুলো জানেন। তাই তাদের কথা শুনে আলোচনার বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবেন।
বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক সংগঠক রামেন্দু মজুমদার বলেন, সাংস্কৃতিক বাজেটের পরিকল্পনা হয়েছে, এখন এর যথাযথ বাস্তবায়নের দিকে নজর দিতে হবে। শিল্পকলা একাডেমির জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন এবং অনুদাননীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। পাশাপাশি শিল্পকলা একাডেমিতে বিনা মূল্যে প্রদর্শনী আয়োজনের ব্যবস্থা বন্ধ করার কথাও বলেন।
নৃত্যশিল্পী, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও গবেষক লুবনা মারিয়ম বলেন, দেশের সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে বাজেটের যথাযথ সম্পর্ক তৈরি হয়নি। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে সাংস্কৃতিক খাতের বাজেটের প্রভাব খুবই সীমিত। গ্রামীণ ও লোকজ সংস্কৃতিকে সাংস্কৃতিক পরিকল্পনায় আরও সম্পৃক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে। দেশের ৬৪ জেলায় কালচারাল অফিসারদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের আওতায় আনার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি ও কবি মোহন রায়হান বলেন, মোট বাজেটের ০.১৬% বরাদ্দ রাখা হয়েছে সাংস্কৃতিক খাতে, এটা বিশাল মহাসমুদ্রের মাঝে এক ফোটা জলের মতো। এই ভূখণ্ডে ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০-এর এরশাদবিরোধী গণআন্দোলন এবং ‘২৪-এর ছাত্র-জনতার বৃহত্তর গণ-আন্দোলন হয়েছে, কিন্তু আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারিনি। বর্তমানে আমরা একটি ভয়ংকর মব-অপসংস্কৃতির মধ্যে বসবাস করছি। সরকারকে এই মব-অপসংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। কবি মোহন রায়হান সংস্কৃতিমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান, প্রতিবছর নামেমাত্র বরাদ্দ না নিয়ে, ৬৪টি জেলায় সাংস্কৃতিক খাতে দশ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত দিতে, এটার লভ্যাংশ দিয়ে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন মনে করেন, শিল্প-সংস্কৃতির বর্তমান অবক্ষয়ের জন্য সরকারের পাশাপাশি সংস্কৃতিকর্মীদেরও নিজেদের দায় স্বীকার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার একা কোনো কার্যকর পরিবর্তন আনতে পারবে না; শিল্প-সংস্কৃতির উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব নিতে হবে।
লেখক ও সাহিত্যিক সাদাত হোসাইন বলেন, আমরা শিল্প-সংস্কৃতিকে মূলত উপভোগের বিষয় হিসেবে দেখি; কিন্তু এর প্রয়োগ ও বিস্তারের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম ও উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, বইপড়ার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে এবং প্রজন্মের বৃহত্তর অংশকে বইপড়ার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষক ও সংগীতশিল্পী প্রিয়াংকা গোপ বলেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময় মানুষ যখন গৃহবন্দি ছিল, তখন শিল্পীরাই সবার আগে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং মানুষকে পাশে দাঁড়িয়েছেন। অথচ শিল্পীদের জন্য বরাদ্দকৃত প্রণোদনা তারা সমানভাবে পাননি; বরং এর একটি অংশ নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর হাতে চলে গেছে।
কণ্ঠশিল্পী ফারজানা ওয়াহিদ সায়ান বলেন, মবের কারণে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী যেগুলো বন্ধ হয়ে যায়, সরকারকে সেগুলো পুনরায় প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার এ দায়িত্ব নিলে মববাজরা পুনরায় এসব সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ করার সাহস পাবে না। একই সঙ্গে সমতলের বাইরের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শিল্পীদেরও সমান গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অভিনেত্রী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আজমেরী হক বাঁধন বলেন, নারী সংস্কার কমিশনকে নিয়ে গালিগালাজ ও অপমানজনক বক্তব্য দেওয়া হলেও সরকার এর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নারীরা বিভিন্ন সময়ে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি এসব হয়রানি ও হেনস্তার বিরুদ্ধে সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
চলচ্চিত্র অভিনেতা হেলাল খান বলেন, চলচ্চিত্র শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তাই চলচ্চিত্রকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মহাপরিচালক আফসানা বেগম বলেন, মানুষের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে ও বই পড়ায় উৎসাহিত করতে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি প্রকাশকদের রাইটার্স ক্যাটালগ তৈরিতে সহযোগিতা করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
কণ্ঠশিল্পী ফাহমিদা নবী বলেন, সংকুচিত মন নিয়ে প্রগতিশীল চিন্তা করা কঠিন। শিল্পীদের ‘দুস্থ শিল্পী’ হিসেবে পরিচয় করানো হলেও তারা দুস্থ হিসেবে পরিচিত হতে চান না; তারা সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চান।
অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবু বলেন, সংস্কৃতি নদীর মতোই বহমান, কিন্তু এখন এর স্রোত কেবলই উল্টো দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। “আমরা আসলে অনুদান চাই না, চাই নিরাপত্তা,” উল্লেখ করে তিনি সারা বাংলাদেশে কাজ করার নিরাপত্তা এবং শিল্প-সংস্কৃতির অনুষ্ঠান ও প্রদর্শনী সর্বত্র আয়োজনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
জাতীয় কবিতা পরিষদের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির সভাপতি ও কবি মোহন রায়হান, সাধারণ সম্পাদক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন এবং কার্যনির্বাহী
সদস্য কবি রাসেল আহম্মেদ।
বার্তা প্রেরক:
রাসেল আহম্মেদ
কার্যনির্বাহী সদস্য
জাতীয় কবিতা পরিষদ

সম্পর্কিত খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল খায়ের 

নির্বাহী সম্পাদক: 
বার্তা প্রধান:

অফিস: বাড়ি ০৭, সড়ক ১৪/সি, সেক্টর ৪,

উত্তরা, ঢাকা-১২৩০।

যোগাযোগ: ০১৭১৫৩৬৩০৭৯

বিজ্ঞাপন: ০১৮২৬৩৯৫৫৪৯

Email: khair.hrm@gmail.com

info@dainikprotibimbo.com

protibimboprokash.com

ফেসবুকে আমরা

©2025 Dainik Protibimbo – All Right Reserved. Designed and Developed by Bangla Webs