শব্দের ছুরিতে আর কত মৃত্যু, মানসিক নির্যাতনের দায় কি সমাজ এড়াতে পারে
জিনাত মলি।
একটি ছুরি শরীরে ঢুকলে রক্ত ঝরে—মানুষ তা দেখে ভয় পায়।
কিন্তু কথা, সেই অদৃশ্য ছুরি, মানুষের ভেতরে ঢুকে রক্তক্ষরণ ঘটায় চোখে দেখা যায় না।
তাই হয়তো আমরা বুঝতেই পারি না—শব্দের ধার কতটা মারাত্মক হতে পারে।
ঢাকার এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থী সম্প্রতি আত্মহত্যা করেছে। তার ঘর থেকে পাওয়া একটি নোটে লেখা ছিল—
“মানুষের কথার আঘাতে বাঁচতে পারলাম না।”
সে কথাগুলো ছিল কী? ব্যঙ্গ, কটূক্তি, অপমান—সব মিলিয়ে মানসিক আঘাতের এক দীর্ঘ ইতিহাস। বন্ধুরা বলছে, সে অনেকদিন ধরেই ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যাচ্ছিল।
এই মৃত্যু কি শুধুই “ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত”?
না।
এটা সমাজের প্রতিদিনের নির্মম ভাষার পরিণতি—যেখানে শব্দ দিয়ে মানুষকে আঘাত করা আজ সহজ, স্বাভাবিক, এমনকি বিনোদনও হয়ে গেছে।
অদৃশ্য আঘাতেও মৃত্যু হয়
মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞরা বলেন—কথার আঘাত শারীরিক নির্যাতনের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর।
শারীরিক ক্ষত সারে; মানসিক ক্ষত বছরের পর বছর জেগে থাকে।
অপমান, ব্যঙ্গ, অবহেলা, character assassination—এসব মানুষের আত্মমর্যাদা ধ্বংস করে।
কেউ শক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ায়, কেউ পড়ে যায় অন্ধকারে।
আর এই তরুণটি দ্বিতীয় দিকটিতে পড়ে গেল।
কিন্তু সমাজ?
পরিবার?
বন্ধুরা?
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান?
কেউ কি তার শব্দ–রক্তক্ষরণ বুঝতে পেরেছিল?
শব্দের ছুরি কেন এত বিপজ্জনক?
কারণ এর কোন চিহ্ন থাকে না।
কারণ অপরাধী বলে, “আমি তো শুধু মজা করছিলাম।”
কারণ ভুক্তভোগী লজ্জায় কাউকে বলতে পারে না।
কারণ সমাজ এখন “ট্রল”কে বিনোদন মনে করে।
কারণ মানসিক নির্যাতনকে এখনো অপরাধ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
কিন্তু সত্য হলো—
কথার আঘাত মানুষকে আত্মহত্যায় ঠেলে দিচ্ছে।
শুধু খবরের কাগজে নয়, আমাদের চারপাশে, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে, এমনকি পরিবারে।
আমরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই
মৃত্যুর দায় শুধুই সেই তরুণের নয়—
দায় তার ওপর কথার ছুরি চালানো মানুষগুলোর।
দায় সেই পরিবেশের, যেখানে অপমান “মজা”, ব্যঙ্গ “স্বাভাবিক”, আর মানসিক নির্যাতন “তুচ্ছ”।
কেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি জরুরি—
যাতে কেউ আর মনে না করে “শুধু কথা বলে অপরাধ হয় না”
যাতে মানসিক নির্যাতনকে আইনের আওতায় আনা হয়
যাতে বিশ্ববিদ্যালয়, পরিবার ও কর্মক্ষেত্র সক্রিয়ভাবে সুরক্ষা ব্যবস্থা নেয়
যাতে তরুণরা বুঝতে পারে—তাদের মন, মর্যাদা ও নিরাপত্তা রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যবান
আমরা চাই—এই ঘটনার বিচার শুধু একটি মামলার সীমায় না থাকে;
এটা যেন হয় বার্তা,
শব্দ দিয়ে আঘাত করা মানেই অপরাধ—
এবং অপরাধের শাস্তি হবেই।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা
একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু শুধু তার পরিবারের নয়—
এটা প্রতিষ্ঠানেরও ব্যর্থতা।
তাদের কি সক্রিয় কাউন্সেলিং সেন্টার আছে?
অপমান বা বুলিংয়ের অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়?
মানসিক স্বাস্থ্য কি পাঠক্রমের অংশ?
শিক্ষার্থীরা কি নিরাপদ পরিবেশে কথাবার্তা বলতে পারে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন জরুরি।
আমরা কোন সমাজ চাই?
মানুষ এমন একটা সমাজে বাঁচতে চায় যেখানে—
কথা শক্তি দেয়, আঘাত নয়;
কথা আলো বাড়ায়, অন্ধকার নয়;
কথা মানুষকে বাঁচায়, মারে না।
আজকের তরুণটির মৃত্যু আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করছে—
“শব্দের ছুরিতে আর কত মৃত্যু?”
এই প্রশ্নের উত্তর আমরা এখনই না দিলে—
আরও পরিবার ভাঙবে, আরও স্বপ্ন নিভে যাবে,
আরও তরুণ মৃত্যু বেছে নেবে।
তাই আজ দাবি—
কথার নির্মমতায় যে তরুণটির মৃত্যু হলো, সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
এই বিচার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করুক।
__________________________
লেখক: উন্নয়ন কর্মী, নারী উদ্যোক্তা।

