অবহেলিত শৈশব: পারিবারিক ভাঙন ও অসচেতনতায় থমকে যাওয়া স্বপ্ন। প্রবন্ধ। খালেদুল হক 

by protibimbo
0 মন্তব্য 73 বার পড়া হয়েছে

অবহেলিত শৈশব: পারিবারিক ভাঙন ও অসচেতনতায় থমকে যাওয়া স্বপ্ন
খালেদুল হক

একটি শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, তার প্রথম ও প্রধান নিরাপদ আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা ছিল তার পরিবার। কিন্তু সমাজচিত্রের গভীরে তাকালে দেখা যায়, আমাদের প্রান্তিক বা সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সন্তানদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে তাদের নিজস্ব পারিবারিক পরিবেশ। কেবল চরম আর্থিক দারিদ্র্যই নয়, তার চেয়েও বড় সামাজিক ব্যাধি হিসেবে দেখা দিয়েছে পারিবারিক অস্থিতিশীলতা—দাম্পত্য বিচ্ছেদ, পারিবারিক নির্যাতন, পুষ্টিহীনতা এবং অভিভাবকদের সীমাহীন অসচেতনতা।

বাস্তব চিত্র কতটা ভয়ংকর ও নির্মম হতে পারে, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ মেলে সামাজিক উদ্যোগগুলোর দিকে তাকালে। যেমন—‘সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্ট’ (CZM) পরিচালিত লোটাস কামাল গ্রানাডা স্কুলের মতো প্রতিষ্ঠানে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেখানকার বাস্তব অভিজ্ঞতা অত্যন্ত উদ্বেগের। ক্লাসের সিংহভাগ শিক্ষার্থীর বাবা-মায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে গেছে। বাবা বা মা নতুন করে সংসার শুরু করায় তারা সন্তানের দায়িত্ব এড়িয়ে চলেন। ফলে এই পিতৃহীন বা মাতৃহীন শিশুদের ঠাঁই হয় বৃদ্ধ দাদি বা নানির কাছে।

এই নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিয়ার (ছদ্মনাম) গল্পটি ধরা যাক। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর থেকে সে তার দাদির কাছেই থাকত। কিন্তু শিক্ষার আলোবঞ্চিত ও অসচেতন দাদি শিশুটিকে দিয়ে বাসার অমানবিক কাজ করাতেন। একপর্যায়ে সহ্য করতে না পেরে রিয়া সেখান থেকে পালিয়ে তার মায়ের কাছে চলে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু যে মা নিজে মানুষের বাসাবাড়িতে ঝি-এর কাজ করে কোনোমতে বেঁচে আছেন, তার পক্ষে সন্তানকে লালন-পালন করা বা পড়ার খরচ চালানো একপ্রকার অসম্ভব।

Banner

এই জটিল বাস্তবতায় শিক্ষকরাও পড়েছেন চরম বিপাকে। লোটাস কামাল গ্রানাডা স্কুলের মতো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা সকাল ৮:৩০ টা থেকে বিকেল ৪:০০ টা পর্যন্ত নিরলস পরিশ্রম করছেন, বলতে গেলে গাধার খাটুনি খাটছেন এসব শিশুকে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ দেওয়ার জন্য। কিন্তু দিনের বড় একটি সময় স্কুলে হাড়ভাঙা চেষ্টা চালিয়েও কাঙ্খিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ শিশুটি যখন বিকেলে ঘরে ফিরে যায়, সেখানে তার জন্য শিক্ষার কোনো পরিবেশ থাকে না। নেই কোনো অভিভাবকত্ব বা সঠিক পরামর্শ দেওয়ার মানুষ। তদুপরি, মারাত্মক পুষ্টিহীনতার কারণে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ও মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শত চেষ্টা সত্ত্বেও শিশুরা পড়াশোনায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি করতে পারছে না; বরং একসময় পড়াশোনাকে পরম ভীতিকর বস্তু মনে করে গুটিয়ে যাচ্ছে।

সমস্যার এখানেই শেষ নয়। প্রাথমিক স্তরে হয়তো দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কল্যাণে নিখরচে পড়ালেখা চলছে, কিন্তু পঞ্চম শ্রেণি পার হওয়ার পর শুরু হয় আরেক অনিশ্চয়তা। মাধ্যমিক স্তরে কোথায় যাবে, কীভাবে খরচের জোগান আসবে—এই ভাবনায় শিশু ও তার অভিভাবক দিশেহারা হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিক সহায়তার অভাবে এদের বড় একটি অংশ ঝরে পড়ে। পরিণতি হিসেবে মেয়েশিশুদের অল্প বয়সেই ‘বোঝা’ মনে করে বাল্যবিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় এবং ছেলেশিশুরা বেঁচে থাকার তাগিদে বাধ্য হয় ঝুঁকিপূর্ণ দিনমজুরি বা শিশুশ্রমে নামতে।

দারিদ্র্য দূর করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি নানা উদ্যোগ থাকলেও, নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর এই ‘অভ্যন্তরীণ ভাঙন’ এবং প্রাথমিক পরবর্তী শিক্ষাজীবন টিকিয়ে রাখার বিষয়ে কাঠামোগত উদ্যোগ খুবই নগণ্য। শুধু শিশুদের প্রাথমিকে ভর্তি করিয়ে বা বই-খাতা দিলেই রাষ্ট্রের ও সমাজের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, যদি না তাদের পারিবারিক পরিবেশ সুরক্ষিত রাখা যায়।

উত্তরণের সম্ভাব্য পথ:
অভিভাবক সচেতনতা ও পারিবারিক পরিবেশ উন্নত করা:  শুধু শিশুদের পড়ালেই হবে না, সুবিধা-বঞ্চিত এলাকার পরিবার ও অভিভাবকদের নিয়ে নিয়মিত কাউন্সিলিং করতে হবে, যাতে শিশুদের ওপর মানসিক নির্যাতন বন্ধ হয়।

শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা:
প্রাথমিক শেষ করা এই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য মাধ্যমিক স্তরে শতভাগ স্কলারশিপ বা সামাজিক অর্থায়নে পড়াশোনার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি।

পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সাপোর্ট: সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্কুলে পুষ্টিকর খাবারের (School Feeding) স্থায়ী ব্যবস্থা করা, যা তাদের শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ নিশ্চিত করবে।

একক মা ও অভিভাবকদের ক্ষমতায়ন:
যেসব মা এককভাবে সন্তানদের নিয়ে লড়াই করছেন, তাদের কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্র অর্থায়ন দেওয়া উচিত, যাতে তারা সন্তানকে পড়াশোনা করানোর ন্যূনতম সামর্থ্য অর্জন করতে পারেন।

একটি জাতির সুসংহত ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার আজকের শিশুদের ওপর। যে শিশুরা নিজের ঘরে নির্যাতন সহ্য করে, সঠিক পুষ্টি পায় না কিংবা পারিবারিক ভাঙনে পথ হারায়—তাদের কেবল অর্থের অভাবে নয়, বরং পারিবারিক ও সামাজিক সুরক্ষার অভাবে ঝরে পড়তে দেওয়া কোনো সুস্থ সমাজের পরিচয় হতে পারে না। এই অদৃশ্য শিকল ভাঙতে সমাজ, দাতব্য সংস্থা ও রাষ্ট্রকে একই সূত্রে গাথঁতে হবে।

লেখক
খালেদুল হক
শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
এল.কে গ্রানাডা স্কুল, কুমিল্লা।

সম্পর্কিত খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল খায়ের 

নির্বাহী সম্পাদক: 
বার্তা প্রধান:

অফিস: বাড়ি ০৭, সড়ক ১৪/সি, সেক্টর ৪,

উত্তরা, ঢাকা-১২৩০।

যোগাযোগ: ০১৭১৫৩৬৩০৭৯

বিজ্ঞাপন: ০১৮২৬৩৯৫৫৪৯

Email: khair.hrm@gmail.com

info@dainikprotibimbo.com

protibimboprokash.com

ফেসবুকে আমরা

©2025 Dainik Protibimbo – All Right Reserved. Designed and Developed by Bangla Webs