ধানমন্ডি আড্ডায় ফিরে দেখা- দুই দশকের কবিতা
আশফাকুজ্জামান
কবিতা কখনো পুরোনো হয় না। শুধু তার পাঠ বদলে যায়। সময় বদলায়। মানুষের চোখ বদলায়। আর সেই বদলে যাওয়া চোখে পুরোনো কবিতাও নতুন আলোয় ধরা দেয়।
গতকাল ধানমন্ডি ক্লাবে তেমনই এক আলোকিত সন্ধ্যা তৈরি হয়েছিল। কবিতাকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি হয়েছিল দুটি দশক। আশির দশক। নব্বইয়ের দশক। আলোচনার বিষয়—‘কবিতার দশক : আশির চোখে নব্বই, নব্বইয়ের চোখে আশি।’
ধানমন্ডি আড্ডার এই আয়োজন ছিল দুই প্রজন্মের কবিতার মুখোমুখি দাঁড়ানো। এক দশক অন্য দশককে দেখেছে। প্রশ্ন করেছে। ব্যাখ্যা করেছে। আবার নিজের সময়কেও নতুন করে আবিষ্কার করেছে।
কবিতার ইতিহাস সময়েরও ইতিহাস। আশির দশকের কবিতায় যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্বৈরাচারবিরোধী চেতনা, প্রেম, দ্রোহ ও ব্যক্তিমানসের টানাপোড়েন ছিল। নব্বইয়ের কবিতায় তাই অনেকটাই নতুন ভাষা পেয়েছে। বদলেছে উচ্চারণ, নির্মাণ ও নিজেকে দেখার ভঙ্গি।
কিন্তু নদী বদলায় না। তার স্রোত বদলায়। বাঁক বদলায়। তবু নদী থেকে যায়। কবিতার দশকও তেমন। একটি দশকের ভেতর থেকেই পরের দশকের জন্ম হয়। এই জায়গাটিই যেন ধরতে চেয়েছিল ধানমন্ডি আড্ডার সন্ধ্যাটি।
আলোচনায় অংশ নেন ফরিদ কবির, জুয়েল মাজহার, রেজাউদ্দিন স্টালিন, গৌরাঙ্গ মোহান্ত, কুমার চক্রবর্তী, চঞ্চল আশরাফ, সাখাওয়াত টিপুসহ আরও অনেকে। তাঁদের আলোচনায় উঠে আসে দুই দশকের কবিতার ভিন্ন স্বর, নির্মাণশৈলী, সময়চেতনা ও কবির নিজস্ব অবস্থান।
এ ছাড়া ছিল সম্পূরক আলোচনা। এতে অংশ নেন জাহিদ হায়দার ও আহমদ শরীফ। তাঁদের কথায় আলোচনাটি আরও বিস্তৃত হয়। কবিতা শুধু কী বলেছে, তা নয়। কেন বলেছে। কোন সময়ের ভেতর থেকে বলেছে। সেই প্রশ্নও সামনে আসে। তারপর কবিতা নিজেই কথা বলে।
আশির দশকের আমন্ত্রিত কবিরা কবিতা পড়েন। নব্বইয়ের দশকের আমন্ত্রিত কবিরাও পাঠ করেন নিজেদের কবিতা। ফলে সন্ধ্যাটি হয়ে ওঠে কবিতার এক জীবন্ত সেতু।
এক পাশে আশি। অন্য পাশে নব্বই। মাঝখানে সময়। আর সেই সময়ের ওপর দিয়ে হেঁটে যায় কবিতার শব্দ। কখনো মনে হয়, দশক বদলেছে। কবিতা বদলায়নি। আবার কখনো মনে হয়, কবিতাই সময়কে বদলে দিয়েছে। এই দ্বন্দ্বই কবিতার সৌন্দর্য।
ধানমন্ডি আড্ডার সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই। এটি শুধু একটি সাহিত্যসভা নয়। এটি মানুষের সঙ্গে মানুষের ভাব, ভালোবাসা, আবেগ বিনিময়ের জায়গা। কবির সঙ্গে কবির দেখা হওয়ার জায়গা। পুরোনো অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন প্রশ্নের দেখা হওয়ার জায়গা।
তাই অনুষ্ঠানে থাকে আলোচনা, স্মৃতি, তর্ক ও আত্মজিজ্ঞাসা। কবিতার প্রতি ভালোবাসা। অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন হাসান মাহমুদ। তাঁর গানের সুর যেন অনুষ্ঠানকে আরও সুন্দর করে তোলে।
এ অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন ধানমন্ডি আড্ডার সভাপতি কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল। সঞ্চালনা ও সার্বিক আয়োজনে ছিলেন সাধারণ সম্পাদক নূর কামরুন নাহার।
ধানমন্ডি আড্ডা দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্যের নানা বিষয়কে ঘিরে নিয়মিত আয়োজন করে আসছে। কবিতা, গল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা প্রসঙ্গ এখানে আলোচনায় আসে। তবে প্রতিটি আয়োজনের থাকে আলাদা সৌন্দর্য। এবারের সৌন্দর্য ছিল সময়কে ফিরে দেখা।
কারণ আশি ও নব্বই এ দুটি দশক বাংলা কবিতার স্মৃতির জানালা। এক জানালা দিয়ে দেখা যায় এক অস্থির সময়। অন্য জানালা দিয়ে দেখা যায় পরিবর্তনের সময়। দুই জানালার মাঝখানে দাঁড়িয়ে কবিতা আমাদের দেখায় মানুষের মুখ। শেষ পর্যন্ত কবিতার কোনো দশক নেই। কবিতার আছে সময়। আছে মানুষ। আছে অনুভব।
আশি তার চোখে নব্বইকে দেখেছে। নব্বই তার চোখে আশিকে দেখেছে। আর ধানমন্ডি আড্ডার সেই সন্ধ্যায় আমরা দেখেছি—কবিতা আসলে সময়কে পেরিয়ে যাওয়ার এক আশ্চর্য সেতু।
আশফাকুজ্জামান
কবি, প্রবন্ধিক, সাংবাদিক ও সংগঠক

