বিশ্বের পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশকে কৌশলগত অবস্থান নিতে হবে: এম সাখাওয়াত হোসেন

by protibimbo
0 মন্তব্য 57 বার পড়া হয়েছে

বিশ্বের পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে আরও কৌশলগত ও যুক্তিনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত সমীকরণে লোহিত সাগরের মোচা (Mocha) বন্দর, সৌদি আরব, পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ভূমিকা এবং তুরস্ককে ঘিরে নতুন নতুন কৌশলগত অক্ষ তৈরি হচ্ছে। এসব পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেরও নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান ও জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের মাওলানা আকরাম খান হলে সেন্টার অব মিলিটারি হিস্ট্রির আয়োজনে এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক সম্পর্কের প্রসঙ্গে এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ভুল তথ্য ও পররাষ্ট্রনীতির কিছু ত্রুটির কারণে সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদারের একটি সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জটিল বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের ব্যবহারের জন্য ১৩টি সংযোগ বা ট্রানজিট দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রামগড় সংযোগ ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অন্যতম বড় ও স্পর্শকাতর পরিবর্তন। একই সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা, মস্কো সফর এবং মিসরকে আহ্বান জানানোসহ মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। কিন্তু বিশ্বমঞ্চের এসব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও জোটে বাংলাদেশকে ডাকা হচ্ছে না।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত অবস্থান, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে, চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশ্বে বর্তমানে তিনটি প্রধান শক্তিকেন্দ্র—যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া—গড়ে উঠছে। তার মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ মূলত ইউরেশিয়ায় ভূকৌশলগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই। এ প্রসঙ্গে তিনি জবিগনিউ ব্রজেজিনস্কির ‘দ্য গ্র্যান্ড চেসবোর্ড’ বই এবং হ্যালফোর্ড ম্যাকিন্ডারের ভূকৌশলগত তত্ত্বের কথা উল্লেখ করেন। ইউরেশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র প্রভাব হারালে ইউরোপেও দেশটির অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা প্রসঙ্গে এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দীর্ঘ সময় পর দেশে একটি ড্রোন কারখানা তৈরি করা হচ্ছে। সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে টিকে থাকতে হলে কারিগরি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইরানের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা নিতে পারে।
রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের অন্যতম বড় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বর্তমানে ১৩ থেকে ১৪ লাখ মিয়ানমারের নাগরিক বা রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আবেগের পরিবর্তে যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্র আবেগ দিয়ে চলে না; রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয় র‌্যাশনাল বা যুক্তিসঙ্গত এবং সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে জাতীয় ঐক্যের ঘাটতি রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই-আগস্টের অভিজ্ঞতার আলোকে প্রণীত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া না হলে জাতি বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। জাতীয় প্রতিরক্ষা কেবল সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল নয়। সাধারণ জনগণ যখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের স্বার্থে দাঁড়ায়, তখনই প্রকৃত জাতীয় প্রতিরক্ষা গড়ে ওঠে।
দেশের ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, একপাক্ষিক চিন্তার ভিত্তিতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বিভিন্ন পক্ষের মতামত ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে বহুমাত্রিক আলোচনা করতে হবে। বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নিয়ে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশকে খাপ খাওয়াতে হলে সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। জনগণকে বৈশ্বিক পরিবর্তন, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও নতুন বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন ও দক্ষ করে তোলা জরুরি। পুরোনো ধারার চিন্তা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভবিষ্যতের রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব নয়। শিক্ষা, কারিগরি দক্ষতা, জাতীয় ঐক্য এবং বাস্তবভিত্তিক নীতিনির্ধারণের সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে হবে।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম বলেছেন, মক্কা চুক্তিকে শুধু সামরিক জোট হিসেবে দেখলে এর বহুমাত্রিক কৌশলগত গুরুত্ব অনুধাবন করা যাবে না। বাংলাদেশের জন্য এ চুক্তি প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, সাইবার ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা, জ্বালানি, শ্রমবাজার, বাণিজ্য এবং কূটনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, তুরস্কের বাইরাক্তার ড্রোন, পাকিস্তানের জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান এবং সৌদি আরবের আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির সঙ্গে সহযোগিতা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরব বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ফলে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শ্রমবাজারেও বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
অধ্যাপক লতিফ মাসুম বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘ডিটারেন্স’ বা নিবৃত্তি একটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা। একটি শক্তিশালী কৌশলগত জোটের সঙ্গে যুক্ত থাকলে সম্ভাব্য বহিঃশত্রুর আগ্রাসনের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তবে বাংলাদেশকে শুরুতেই পূর্ণাঙ্গ সদস্য না হয়ে পর্যবেক্ষক বা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অংশীদার হিসেবেও যুক্ত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হলে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জটিল হবে—এমন আশঙ্কাও অমূলক বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় চীনের ভূমিকা এবং সৌদি-ইরান সমঝোতায় চীনের মধ্যস্থতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রেরও এ উদ্যোগের প্রতি ইতিবাচক অবস্থান রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ফলে মক্কা চুক্তিকে কোনো নির্দিষ্ট শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে না দেখে নিজস্ব নিরাপত্তা সক্ষমতা জোরদারের উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঝুঁকি ও সম্ভাবনা উভয় দিক গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত সমীকরণ বিবেচনায় নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করতে হবে।
তিনি বলেন, কোনো কৌশলগত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। মক্কা চুক্তির প্রতিটি শর্ত ও ধারা জাতীয় সংসদ, রাজনৈতিক দল, বিশেষজ্ঞ ও জনগণের আলোচনার মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। একটি জাতির কৌশলগত সিদ্ধান্ত তখনই টেকসই হয়, যখন তা গণতান্ত্রিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে গ্রহণ করা হয়।
অধ্যাপক লতিফ মাসুম আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের সামনে এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। অতীতের নিষ্ক্রিয় নিরপেক্ষতার ধারায় আবদ্ধ না থেকে জাতীয় স্বার্থে কৌশলগতভাবে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সময়ের পরিবর্তিত বাস্তবতা অনুধাবন করে সাহসী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ নিতে পারলেই বাংলাদেশ সংকটকে সম্ভাবনায় রূপ দিতে পারবে।
মক্কা চুক্তি নিয়ে বিভিন্ন সেমিনার ও জনপরিসরে যে আলোচনা হচ্ছে, তা আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিনিময় এবং নীতিনির্ধারকদের কাছে বিষয়টি তুলে ধরা প্রয়োজন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জাতীয় স্বার্থে এর প্রতিটি দিক গভীরভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।

প্রধান আলোচকের বক্তব্যে বিশিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহি আকবর বলেছেন, দেশের স্বার্থে মক্কা প্যাক্ট থেকে বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন থাকা ঠিক হবে না। বর্তমান সরকার এ বিষয়ে যে আগ্রহ দেখাচ্ছে, তা বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় স্বার্থ ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক বক্তব্য ও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এসব বক্তব্যে বিভ্রান্ত না হয়ে বিষয়টির বাস্তবতা ও সম্ভাব্য সুফল নিয়ে জনগণকে সচেতন করা প্রয়োজন। একজন সাবেক সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য ও নাগরিক হিসেবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে মক্কা প্যাক্টকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।
মক্কা প্যাক্টে যোগদানের বিষয়ে আর্টিকেল ৫ নিয়ে যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ফজলে এলাহি আকবর। তিনি বলেন, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ হলে বাংলাদেশ এতে জড়িয়ে পড়বে—এ ধরনের আশঙ্কাকে ভিত্তি করে চুক্তি থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া যুক্তিসংগত নয়। ন্যাটোর ইতিহাস উল্লেখ করে তিনি বলেন, আর্টিকেল ৫ নিয়ে যে ধরনের ভয় দেখানো হচ্ছে, বাস্তবতার সঙ্গে তার মিল রয়েছে কি না, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দেশের রাজনৈতিক ঐক্যের প্রসঙ্গে ফজলে এলাহি আকবর বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার আন্তরিকভাবে উদ্যোগ নিলে পুরো জাতি ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। মক্কা প্যাক্টকে কেন্দ্র করে জাতীয় ঐক্য জোরদারের ক্ষেত্রে বিএনপির সামনে একটি ‘সুবর্ণ সুযোগ’ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে সরকারকেও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কমোডর জসিমউদ্দীন বলেছেন, মক্কা চুক্তির আওতায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের সামুদ্রিক ও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা সম্ভব। বিপুল অর্থ ব্যয়ে এককভাবে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে দক্ষ জনবল, নৌসম্পদ, জ্বালানি অবকাঠামো ও কৌশলগত সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে এ ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরাসরি মক্কা চুক্তির সদস্য না হয়েও পর্যবেক্ষক হিসেবে এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে সৌদি আরবসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে পারে। বাংলাদেশের নৌসম্পদ ও দক্ষ জনবল এ সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। তার মতে, বাংলাদেশে নৌখাতে দক্ষ প্রায় দুই হাজার টেকনিশিয়ান রয়েছে। এসব দক্ষ জনবল সৌদি আরবের সঙ্গে সহযোগিতার আওতায় কাজে লাগানো গেলে উভয় পক্ষই উপকৃত হতে পারে।
মক্কা চুক্তির সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তাকেও যুক্ত করার প্রস্তাব দেন কমোডর জসিমউদ্দীন। তিনি বলেন, মাতারবাড়ীতে বড় আকারের কৌশলগত জ্বালানি মজুদাগার গড়ে তোলা যেতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের জ্বালানি মজুদের সক্ষমতা সীমিত হলেও দীর্ঘমেয়াদি রিজার্ভ গড়ে তুলতে পারলে সংকটের সময় এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে। এ ধরনের সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরির সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সৌদি আরবের মতো জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ জ্বালানি মজুদ ও সরবরাহ অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারে। এর বিনিময়ে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে সহযোগিতা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে আধুনিক সাবমেরিন সংগ্রহ ও বঙ্গোপসাগরে নজরদারি সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এ ধরনের কৌশলগত সহযোগিতা কাজে লাগানো যেতে পারে।

Banner

সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার বলেন, ভারতের পরিচয় সম্পর্কে আলাদা কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই; সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মুসলিম বিশ্বের পালস বা অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করা উচিত। মক্কা চুক্তি বিষয়ে আরও আলোচনা তৈরি করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা লাভবান হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক রুহুল আমিন বলেন, কোনো চুক্তি না থাকার চেয়ে চুক্তি থাকা উত্তম। ৯/১১-এর সময় আমেরিকা মুসলিম নিধনের চেষ্টা শুরু করেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। একটি রাষ্ট্র ছোট না বড়, তা কোনো বিষয় নয়; রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিই রাষ্ট্রকে বড় করে। উদাহরণ হিসেবে কিউবার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিউবা আমেরিকার সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এবং বাংলাদেশও তা পারবে।
সিনিয়র অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী বলেন, মুসলিমবিরোধিতা রয়েছে; হিন্দু, খ্রিস্টান বা অন্য ধর্মের ক্ষেত্রেও এমন প্রবণতা রয়েছে কি না, সে প্রশ্ন রয়েছে। পৃথিবীর সব জায়গায় ইসলামোফোবিয়া রয়েছে। বাংলাদেশকে মক্কা চুক্তিতে নেওয়া হবে কি না, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, দেশের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তথ্য ফাঁস হলে আমাদের নেওয়া হবে না। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নেই’—এটি চরম মিথ্যা কথা। সবার সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকবে। দেশের ঐক্যের জন্য জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে।
নৌবাহিনীর কমান্ডার (অব.) জসিম উদ্দিনও আলোচনায় বক্তব্য দেন।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক লে. কর্নেল (অব.) ড. এস কে আকরাম আলী বলেন, ১৯৯৬ সাল থেকে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। মক্কা চুক্তির নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মক্কা চুক্তিতে ক্ষতির চেয়ে উপকার বেশি। বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি প্রয়োজন। তিনি মক্কা চুক্তির বিষয়ে সরকারকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
ইঞ্জিনিয়ার রেজাউল করিমের সঞ্চালনায় সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার, প্রফেসর মিজানুর রহমান, অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক রুহুল আমিন, তরুণ সংঘের সভাপতি ফজলুল হক, সাবেক সচিব আবুল হোসেন, নুরুল হুদা চৌধুরী, জসিম উদ্দিন, জুলাই আন্দোলনের সংগঠক খমেনি এহসান, ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক ও প্রফেসর তারেক ফজল।

সম্পর্কিত খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল খায়ের 

নির্বাহী সম্পাদক: 
বার্তা প্রধান:

অফিস: বাড়ি ২৫ (দ্বিতীয় তলা), সড়ক ৫, সেক্টর ৬, উত্তরা, ঢাকা।

যোগাযোগ: ০১৭১৫৩৬৩০৭৯

বিজ্ঞাপন: ০১৮২৬৩৯৫৫৪৯

Email: khair.hrm@gmail.com

info@dainikprotibimbo.com

protibimboprokash.com

ফেসবুকে আমরা

©2025 Dainik Protibimbo – All Right Reserved. Designed and Developed by Bangla Webs