বইয়ের বাণিজ্য, সাহিত্য ও দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতু: নিষেধাজ্ঞায় কার ক্ষতি?– নূরুল হক

by protibimbo
0 মন্তব্য 34 বার পড়া হয়েছে

বইয়ের বাণিজ্য, সাহিত্য ও দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতু: নিষেধাজ্ঞায় কার ক্ষতি?
— নূরুল হক

মানবজীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, কল্পনা, স্বপ্ন ও বাস্তব অনুভূতির শৈল্পিক প্রকাশই সাহিত্য। সাহিত্য কেবল বিনোদনের উপকরণ নয়, এটি একটি জাতির চিন্তা, চেতনা, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনবোধের অন্যতম প্রধান দলিল। তাই এক দেশের সাহিত্য যখন অন্য দেশের পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়, তখন শুধু একটি বই বিক্রি হয় না, দুই দেশের মানুষের মধ্যে একটি সাংস্কৃতিক যোগাযোগও প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের, বিশেষ করে বাংলা ভাষাভাষী দুই বাংলার বইয়ের আদান-প্রদান একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক বিষয়।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বইকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে নানা ধরনের মেলার আয়োজন করা হয়। এসব বইমেলা লেখক, পাঠক, প্রকাশক ও সংস্কৃতিকর্মীদের মিলনস্থলে পরিণত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সেখানে অংশগ্রহণ করে, নিজেদের বই প্রদর্শন ও বিক্রি করে এবং নতুন পাঠকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পায়। ফলে বইমেলা একই সঙ্গে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রকাশনা ব্যবসার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। দীর্ঘদিন ধরে এই মেলা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একটি বড় আন্তর্জাতিক মিলনমঞ্চ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের লেখক, কবি, প্রকাশক ও পাঠকেরাও এই মেলার সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত। বাংলাদেশের প্রকাশকদের স্টল সেখানে থাকত এবং বাংলাদেশের প্রকাশিত বই ভারতীয় পাঠকদের কাছে বিক্রির সুযোগ পেত। একইভাবে ভারতের বাংলা বই বাংলাদেশের পাঠকদের কাছেও পৌঁছেছে। এই বিনিময়ের ফলে দুই দেশের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।
এখন যদি কোনো সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে প্রকাশিত বই ভারতে বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, অথবা ভারতের প্রকাশিত বই বাংলাদেশে বিক্রির ক্ষেত্রেও অনুরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়, তাহলে বিষয়টি কেবল প্রকাশনা ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব পড়বে লেখক, প্রকাশক, পাঠক এবং সামগ্রিক সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ওপর।
প্রথমত, এর সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন লেখক ও প্রকাশকেরা। একটি বই প্রকাশের পর লেখকের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা থাকে পাঠকের কাছে পৌঁছানো। দেশভেদে বইয়ের বাজার বিভক্ত হয়ে গেলে লেখকের পাঠকসংখ্যা কমে যেতে পারে। একজন বাংলাদেশের লেখক যদি ভারতে তাঁর বই বিক্রির সুযোগ হারান, তাহলে তিনি শুধু একটি বাজার হারাবেন না, বিপুলসংখ্যক সম্ভাব্য পাঠকের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন হবেন।
একইভাবে ভারতের কোনো বাংলা লেখকের বই বাংলাদেশে না এলে বাংলাদেশের পাঠকেরাও সেই সাহিত্য থেকে বঞ্চিত হবেন।

Banner

দ্বিতীয়ত, প্রকাশনা শিল্প আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বই একটি সাংস্কৃতিক পণ্য হলেও এর সঙ্গে একটি বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জড়িত। লেখকের রয়্যালটি, প্রকাশকের বিনিয়োগ, মুদ্রণ ব্যয়, পরিবহন, পরিবেশক, বইয়ের দোকান এবং মেলার বিক্রয় ব্যবস্থা, সবকিছুই বইয়ের বাজারের ওপর নির্ভরশীল। একটি দেশের বই অন্য দেশে বিক্রি হলে লেখক ও প্রকাশক উভয়েই অতিরিক্ত বাজার পান। সেই বাজার বন্ধ হয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই প্রকাশনার অর্থনীতি সংকুচিত হবে।

তৃতীয়ত, সবচেয়ে বড় ক্ষতি হতে পারে পাঠকের। একজন পাঠক তার পছন্দের লেখকের বই কোথায় প্রকাশিত হয়েছে তা দেখে নয়, বইটির বিষয়বস্তু ও সাহিত্যমান বিবেচনা করেই সাধারণত বই কিনতে চান। রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক বা সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের কারণে যদি পাঠক একটি নির্দিষ্ট দেশের বই কিনতে না পারেন, তাহলে তাঁর স্বাধীন পাঠাভ্যাস সীমিত হয়। সাহিত্য যেহেতু মানুষের চিন্তার পরিসরকে বিস্তৃত করে, তাই সাহিত্যিক আদান-প্রদান বন্ধ হওয়া কোনো সমাজের জন্যই ইতিবাচক নয়।
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দুই অঞ্চলের মানুষের ভাষা এক, কিন্তু তাদের ইতিহাস, সামাজিক অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার মধ্যে পার্থক্যও রয়েছে। এই পার্থক্যগুলো বোঝার অন্যতম সহজ মাধ্যম হলো সাহিত্য। কলকাতার একজন লেখকের বই পড়ে বাংলাদেশের পাঠক পশ্চিমবঙ্গের সমাজ সম্পর্কে জানতে পারেন। একইভাবে বাংলাদেশের একজন লেখকের লেখা পড়ে পশ্চিমবঙ্গের পাঠক বাংলাদেশের মানুষের জীবন, সংগ্রাম, আনন্দ, স্বপ্ন ও পরিবর্তনের গল্প জানতে পারেন।
এই বিনিময় দুই দেশের মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা দূর করতেও ভূমিকা রাখতে পারে। সংবাদমাধ্যম বা রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে একটি দেশ সম্পর্কে যে ধারণা তৈরি হয়, সাহিত্য অনেক সময় তার চেয়ে অনেক বেশি মানবিক ও গভীর একটি ছবি তুলে ধরে। একজন কবির কবিতা, একজন ঔপন্যাসিকের চরিত্র কিংবা একজন প্রাবন্ধিকের বিশ্লেষণ পাঠককে অন্য দেশের মানুষের হৃদয়ের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে।

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাহিত্যকে যদি কেবল বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তার বৃহত্তর সামাজিক ভূমিকা উপেক্ষিত হয়। বই বিক্রি অবশ্যই প্রকাশনা শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি বই যখন সীমান্ত অতিক্রম করে, তখন তার সঙ্গে অতিক্রম করে ভাষা, সংস্কৃতি, চিন্তা ও মানবিকতার সীমারেখাও। সে কারণে বইয়ের চলাচল যত বেশি উন্মুক্ত হবে, দুই দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্কও তত বেশি সমৃদ্ধ হতে পারে।
অবশ্যই কোনো দেশের বই আমদানি বা বিক্রির ক্ষেত্রে আইনগত, বাণিজ্যিক বা প্রশাসনিক কিছু নিয়ম থাকতে পারে। কপিরাইট, শুল্ক, সেন্সরশিপ, প্রকাশনা আইন কিংবা মুদ্রণ ও বিতরণসংক্রান্ত বিধিবিধান থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু এসব নিয়ম যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে এক দেশের বৈধভাবে প্রকাশিত বই অন্য দেশের পাঠকের কাছে পৌঁছানোর পথই বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ সাংস্কৃতিক বিনিময় বন্ধ করার চেয়ে স্বচ্ছ ও ন্যায্য নিয়মের মাধ্যমে তা পরিচালনা করা অনেক বেশি ফলপ্রসূ।

বাংলাদেশের পাঠকেরাও যদি প্রতিক্রিয়া হিসেবে ভারতে প্রকাশিত বই কেনা বন্ধ করে দেন, তাহলে হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পক্ষ নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী মনে করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর ক্ষতি হবে দুই দেশেরই। কারণ একটি বাজার হারালে প্রকাশক ক্ষতিগ্রস্ত হন, লেখক ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং শেষ পর্যন্ত পাঠকও ক্ষতিগ্রস্ত হন। সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক নিষেধাজ্ঞা সাধারণত কোনো স্থায়ী সমাধান তৈরি করে না।
বরং দুই দেশের প্রকাশকদের মধ্যে আলোচনা, বইমেলায় পারস্পরিক অংশগ্রহণ, বই আমদানি-রপ্তানির সহজ ব্যবস্থা এবং লেখক-অনুবাদকদের সহযোগিতা বাড়ানো উচিত। বিশেষ করে বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের বৃহত্তর পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। বাংলা ভাষার সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য দুই বাংলার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতা একটি বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র।

সবশেষে বলা যায়, বইয়ের কোনো সীমান্ত নেই। রাষ্ট্রের সীমান্ত থাকতে পারে, কিন্তু চিন্তা, কল্পনা, সাহিত্য ও মানবিকতার কোনো কাঁটাতার নেই। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেই মতপার্থক্যের অভিঘাত যদি বই ও সাহিত্যের ওপর পড়ে, তাহলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে সাধারণ পাঠকের।
বাংলা ভাষা দুই দেশের মানুষের একটি গভীর সাংস্কৃতিক বন্ধন। সেই বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করার দায়িত্ব লেখক, প্রকাশক, পাঠক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর। একটি দেশের বই অন্য দেশের বাজারে পৌঁছানো মানে শুধু অর্থনৈতিক লেনদেন নয়, এটি দুই দেশের মানুষের হৃদয়ের মধ্যে একটি সেতু নির্মাণ। সেই সেতু ভেঙে ফেলার পরিবর্তে আরও মজবুত করাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য। কারণ সাহিত্য যত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে, মানুষ তত বেশি মানুষকে চিনবে, বুঝবে এবং কাছাকাছি আসবে।

সম্পর্কিত খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল খায়ের 

নির্বাহী সম্পাদক: 
বার্তা প্রধান:

অফিস: বাড়ি ২৫ (দ্বিতীয় তলা), সড়ক ৫, সেক্টর ৬, উত্তরা, ঢাকা।

যোগাযোগ: ০১৭১৫৩৬৩০৭৯

বিজ্ঞাপন: ০১৮২৬৩৯৫৫৪৯

Email: khair.hrm@gmail.com

info@dainikprotibimbo.com

protibimboprokash.com

ফেসবুকে আমরা

©2025 Dainik Protibimbo – All Right Reserved. Designed and Developed by Bangla Webs