সমকালীন বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য আলোকবর্তিকা: ড. ওমাতি অ্যান মারি হ্যানসরাজ:
— রি হোসাইন
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বসাহিত্য যখন যান্ত্রিকতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর দ্রুতগতির জীবনের করাল গ্রাসে নিজের আত্মিক রূপ হারাতে বসেছে, ঠিক তখনই ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র ত্রিনিদাদ ও টোবাগো থেকে এক জাদুকরী কণ্ঠস্বর আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কবিতা এখনো মরে যায়নি, কবিতা এখনো মানুষের আত্মার স্পন্দন। তিনি ড. ওমাতি অ্যান মারি হ্যানসরাজ (Dr. Omatee Ann Marie Hansraj)। একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ এবং বিশ্বসাহিত্যকে এক সুতোয় বাঁধার কারিগর। তাঁর সৃষ্টিশীলতা কেবল সমকালীন সাহিত্যকে সমৃদ্ধই করেনি, বরং বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এক অবিশ্বাস্য ও অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
সৃষ্টিশীলতার এক অতিপ্রাকৃতিক মহাবিস্ময়:
ড. ওমাতি অ্যান মারি হ্যানসরাজের সাহিত্যিক জীবনের দিকে তাকালে প্রথম যে শব্দটি মাথায় আসে, তা হলো ‘মহাবিস্ময়’। ২০২০ সাল, যখন পুরো পৃথিবী কোভিড-১৯ মহামারীর ভয়ে গৃহবন্দী, স্থবির ও আতঙ্কগ্রস্ত, ঠিক তখন এই কবি তাঁর লেখনীকে বানিয়েছিলেন মানবমুক্তির হাতিয়ার। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে—মাত্র ৯ মাসে—তিনি ২৫টি বই প্রকাশ করেন, যার মধ্যে ছিল ১২টি উপন্যাস এবং ১৩টি অনন্য কাব্যগ্রন্থ (যাতে অন্তর্ভুক্ত ছিল ৬৩৬টি কবিতা)।
এটি কেবল একটি সংখ্যার খতিয়ান নয়, এটি মানুষের ভেতরের অফুরন্ত সৃজনী শক্তির এক জীবন্ত প্রমাণ। এই অবিশ্বাস্য কীর্তির জন্য তিনি আন্তর্জাতিক স্তরে “ফিমেল নভেলিস্ট অব দ্য ইয়ার” এবং সাহিত্যিক শ্রেষ্ঠত্ব পুরস্কারে ভূষিত হন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা অর্ধশত ছাড়িয়ে গেছে। ড. ওমাতির এই সৃষ্টিশীলতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন প্রকৃত লেখকের ভেতরের জগত যখন বিশ্বজনীন বেদনায় আলোড়িত হয়, তখন তাঁর লেখনী থেকে অবিরাম ধারায় শব্দের ঝর্ণা নামতে বাধ্য।
কাব্যদর্শন: আধ্যাত্মিকতা, একাকীত্ব ও মহাজাগতিক নীরবতা:
ড. ওমাতির লেখার প্রধান শক্তি এর সরলতা ও গভীর আত্মিক সংযোগ। তাঁর কবিতায় কোনো কৃত্রিম অলঙ্কারের বাহুল্যতা নেই, বরং আছে জীবনের গভীর সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস। তাঁর কাব্যের মূল উপাদান তিনটি—প্রেম, বিরহ এবং আধ্যাত্মিক রূপান্তর।
তাঁর সাম্প্রতিক সৃষ্টিগুলোতে (যেমন—Where Stars Speak Softly) এক ধরনের ধ্যানমগ্ন বা মেডিটেশনাল আবহ লক্ষ্য করা যায়। তিনি মানুষকে কেবল এই পৃথিবীর ধুলোবালির জীব হিসেবে দেখেন না, বরং মানুষের আত্মাকে মেলাতে চান মহাবিশ্বের নক্ষত্রমণ্ডল আর অনন্ত নীরবতার সাথে। জীবনের দুঃখ, বার্ধক্য, অসুস্থতা কিংবা একাকীত্বকে তিনি নেতিবাচকভাবে দেখেননি; বরং দেখিয়েছেন কীভাবে এই নিঃসঙ্গতার মধ্য দিয়েই মানুষ তার ভেতরের ‘ঈশ্বরত্ব’ বা পরম শান্তির খোঁজ পেতে পারে। তাঁর রোমান্টিক ধারার কবিতাগুলোতেও (যেমন—Morning Temptations) দূরত্বের বিরহ ছাপিয়ে এক ধরণের পবিত্র, শাশ্বত ভালোবাসার জয়গান গাওয়া হয়েছে।
‘ওয়ার্ডস্মিথ ইন্টারন্যাশনাল’: সীমানা পেরিয়ে কবিতার বৈশ্বিক সেতু
একজন মহান লেখকের কাজ কেবল নিজের সৃষ্টিকে প্রকাশ করা নয়, বরং অন্যদের পথ দেখানো। ড. ওমাতি এখানেও অনন্য। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘Wordsmith International Editorial’ এবং সম্পাদনা করছেন অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘O to Be Magazine’-সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সাহিত্য সাময়িকী।
এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের—তা সে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ বা আমেরিকার—উদীয়মান ও প্রতিষ্ঠিত কবি, অনুবাদক, চিত্রশিল্পী এবং সংগীতশিল্পীদের এক ছাদের নিচে নিয়ে এসেছেন। সংস্কৃতির ভৌগোলিক সীমানা, ভাষার প্রাচীর এবং রাজনীতির বিভাজনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, কবিতার কোনো পাসপোর্ট-ভিসা লাগে না। হৃদয়ের ভাষা সব দেশেই এক। তাঁর এই তিতিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বৈশ্বিক সাহিত্যিক আদান-প্রদানকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
দক্ষিণ এশিয়া সফর এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:
বর্তমানে এই মহান সাহিত্যিক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতির দেশ ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁর এই সফর কেবল ব্যক্তিগত ভ্রমণ নয়, এটি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আধ্যাত্মিক ভাবনার এক মেলবন্ধন। ভারতীয় উপমহাদেশের সুফি, বাউল এবং সনাতন আধ্যাত্মিক দর্শনের সাথে ড. ওমাতির নিজস্ব কাব্যদর্শনের যে একটি সহজাত মিল রয়েছে, তা এই সফরের মাধ্যমে আরও বিকশিত হবে বলে আশা করা যায়।
একই সাথে, পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে কবিতার উর্বর ভূমি বাংলাদেশেও তাঁর আগমন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। যে দেশের মানুষ ভাষার জন্য রক্ত দেয়, যে দেশে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের মতো কবিরা জন্মেছেন এবং যেখানে সমকালীন কবিরা প্রতিদিন কবিতার নতুন নতুন ‘অভ্যুত্থান’ ঘটাচ্ছেন, সেই বাংলাদেশে ড. ওমাতির মতো একজন বিশ্বজনীন কবির পা রাখা হবে সাহিত্যের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
ড. ওমাতি অ্যান মারি হ্যানসরাজ কেবল ত্রিনিদাদের কবি নন, তিনি আজ বিশ্বনাগরিক। তাঁর নম্রতা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং অবিরাম সৃষ্টিশীলতা তরুণ প্রজন্মের লেখকদের জন্য এক অন্তহীন অনুপ্রেরণা। জরাজীর্ণ এই পৃথিবীতে শান্তি, ভালোবাসা আর মানবতার যে বাণী তিনি তাঁর শব্দের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন, তা যুগ যুগ ধরে পাঠকদের হৃদয়ে আলো ছড়াবে। বিশ্বসাহিত্যের এই অনন্য আলোকবর্তিকাকে আমাদের অভিবাদন।

