জন্মাষ্টমীর প্রাসঙ্গিক ভাবনা: গীতার আলোকে আজকের সমাজ– রিপন চন্দ্র ভৌমিক

by protibimbo
0 মন্তব্য 49 বার পড়া হয়েছে

জন্মাষ্টমীর প্রাসঙ্গিক ভাবনা: গীতার আলোকে আজকের সমাজ
— রিপন চন্দ্র ভৌমিক

বর্তমান সমাজের দিকে গভীরভাবে তাকালে মনে হয়—আমাদের চারপাশে কেবল মানুষ জন্ম নিচ্ছে না, মানুষের ভেতরেও প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে নানারকম লোভ, হিংসা, প্রতিহিংসা, অহংকার, অসত্য, ক্ষমতার অপব্যবহার ও নৈতিক অবক্ষয়। পরিবারে বিভাজন, সমাজে অসহিষ্ণুতা, রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানে স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং ব্যক্তিজীবনে অস্থিরতা—সব মিলিয়ে মানবিক মূল্যবোধের এক গভীর সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আজ মানুষের হাতে প্রযুক্তি বেড়েছে, সম্পদ বেড়েছে, যোগাযোগের সুযোগ বেড়েছে; কিন্তু সবক্ষেত্রে কি মানুষের বিবেক, সংযম, সহমর্মিতা ও ন্যায়বোধ সমানভাবে বেড়েছে? এই প্রশ্নই আজ আমাদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি।

এই বাস্তবতায় শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব এবং তাঁর জীবনদর্শন নতুনভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

Banner

শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমীর শিক্ষা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবের আনন্দে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর আবির্ভাব আমাদের সামনে এক চিরন্তন সত্য তুলে ধরে—যখন সমাজে অধর্ম, অন্যায় ও অমানবিকতা বেড়ে যায়, তখন ন্যায়, সত্য ও মানবিকতার পক্ষে মানুষকে জেগে উঠতে হয়। তাই শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবকে আমরা শুধু একটি ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক ঘটনা হিসেবে নয়, মানুষের চেতনায় ন্যায়ের পুনর্জাগরণের প্রতীক হিসেবেও দেখতে পারি।

ধর্ম মানে শুধু আচার নয়—ন্যায়ের পথে কর্তব্য

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা আমাদের শেখায়—ধর্ম কেবল আচার-অনুষ্ঠান, বাহ্যিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় নয়; ধর্মের একটি গভীর সামাজিক ও নৈতিক অর্থ রয়েছে। সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, নিজের ন্যায়সঙ্গত কর্তব্য পালন করা, দুর্বল ও অসহায়ের প্রতি সহমর্মী হওয়া এবং অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ না করা—এসবই ধর্মাচরণের বাস্তব রূপ।

গীতার অন্যতম গভীর শিক্ষা হলো কর্ম। মানুষ শুধু ফলের জন্য কাজ করবে না; ন্যায়সঙ্গত ও কর্তব্যনিষ্ঠ কাজ করাই হবে তার প্রধান দায়িত্ব। ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতি, প্রশংসা-নিন্দা বা সাফল্য-ব্যর্থতার ভয়ে যদি মানুষ ন্যায়সঙ্গত কর্তব্য থেকে সরে যায়, তবে সমাজে অন্যায়ের পথ আরও প্রশস্ত হয়।

আজ আমাদের সমাজের অন্যতম সংকট এখানেই। আমরা অনেক সময় অন্যায় দেখি, কিন্তু প্রতিবাদ করি না; দুর্নীতি দেখি, কিন্তু সুবিধার জন্য নীরব থাকি; দুর্বল মানুষের অধিকার লঙ্ঘিত হতে দেখি, কিন্তু বলি—“এটা আমার বিষয় নয়।”

কিন্তু গীতার শিক্ষা আমাদের এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—অন্যায়ের সময় নীরব থাকা কি সত্যিই কর্তব্যপরায়ণতা?

অর্জুনের দ্বিধা এবং আজকের মানুষের সংকট

মহাভারতের যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুন দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছিলেন। তিনি যুদ্ধের ধ্বংস, আপনজনের মৃত্যু এবং ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়ে মানসিক সংকটে পড়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে কেবল যুদ্ধের আহ্বান জানাননি; বরং তাঁর বিবেক, কর্তব্যবোধ ও নৈতিক দায়িত্বকে জাগ্রত করেছিলেন।

আজকের সমাজেও আমরা এক ধরনের অর্জুনের দ্বিধায় বাস করছি।

আমরা জানি কোনটি অন্যায়, কিন্তু অনেক সময় নিজের নিরাপত্তা, চাকরি, ব্যবসা, সামাজিক সম্পর্ক বা ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে প্রতিবাদ করতে সাহস পাই না। আমরা জানি দুর্নীতি ক্ষতিকর, কিন্তু নিজের সুবিধা হলে নীরব থাকি। আমরা জানি ঘৃণা সমাজকে ধ্বংস করে, তবুও ঘৃণার ভাষাকে সমর্থন করি।

অতএব, আজকের প্রাসঙ্গিক শিক্ষা হলো—অন্যায় প্রতিরোধের আগে নিজের ভেতরের ভয়কে জয় করতে হবে।

তবে অন্যায় প্রতিরোধ মানে কখনোই হিংসা, প্রতিশোধ বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া নয়। আধুনিক সভ্য সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথ হতে হবে আইনসম্মত, শান্তিপূর্ণ, সংগঠিত ও মানবিক।

অন্যায় প্রতিরোধের বাস্তব ও নিরাপদ পথ

শ্রীকৃষ্ণের আদর্শে অন্যায় প্রতিরোধ মানে প্রতিহিংসা নয়; বরং বিবেক, বুদ্ধি, সংযম ও ন্যায়বোধের মাধ্যমে অধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান।

আজকের বাস্তব সমাজে আমরা নিম্নলিখিতভাবে সেই শিক্ষা কার্যকর করতে পারি—

প্রথমত—নিজে অন্যায় না করা।
ঘুষ, প্রতারণা, মিথ্যা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্বলকে শোষণ না করার মধ্য দিয়েই ন্যায়ভিত্তিক সমাজের প্রথম ভিত্তি তৈরি হয়।

দ্বিতীয়ত—অন্যায়ের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক ও আইনসম্মত অবস্থান নেওয়া।
প্রমাণ সংরক্ষণ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ, আইনগত সহায়তা গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে ন্যায়বিচারের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হওয়া নাগরিকের শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

তৃতীয়ত—হিংসার পরিবর্তে যুক্তির শক্তি ব্যবহার করা।
সামাজিক মতভেদকে মারামারি, ঘৃণা ও প্রতিশোধে নয়; আলোচনা, যুক্তি, সহনশীলতা ও আইনের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।

চতুর্থত—পরিবার থেকেই নৈতিক শিক্ষার শুরু করা।
সন্তানকে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার শিক্ষা দিলেই চলবে না; তাকে সত্যবাদিতা, মানবিকতা, নারী-পুরুষের প্রতি সম্মান, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক সাহসের শিক্ষাও দিতে হবে।

পঞ্চমত—সমাজে অন্যায়ের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
অসহায়, নির্যাতিত ও বঞ্চিত মানুষকে সাহায্য করা কেবল দান নয়; এটি মানবিক ও সামাজিক দায়িত্ব।

নিজের ভেতরের কংসকে দমন

শ্রীকৃষ্ণের জীবনকে যদি প্রতীকী দৃষ্টিতে দেখি, তবে কংস কেবল একজন ব্যক্তি নন; কংস আমাদের ভেতরেও বাস করতে পারে—লোভের মধ্যে, ক্ষমতার অহংকারে, হিংসায়, অন্যের ক্ষতিতে আনন্দ পাওয়ার প্রবণতায় এবং দুর্বল মানুষের ওপর অত্যাচারে।

তাই সমাজ পরিবর্তনের আগে আমাদের প্রত্যেককে নিজের কাছে প্রশ্ন করতে হবে—

আমি কি সত্যের পক্ষে দাঁড়াই?
আমার লাভের জন্য কি আমি অন্যের ক্ষতি করি?
আমি কি অন্যায় দেখে নীরব থাকি?
আমার কথায় বা আচরণে কি অন্য মানুষ অপমানিত হয়?
আমি কি নিজের ক্ষমতা ও অবস্থানকে ন্যায়ের জন্য ব্যবহার করি?

শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা গ্রহণের প্রথম শর্ত হলো—অন্যের ভেতরের অন্ধকার দেখার আগে নিজের ভেতরের অন্ধকারকে চিনতে শেখা।

ভক্তি, কর্ম ও জ্ঞান—সমাজ পরিবর্তনের তিন শক্তি

গীতার শিক্ষা কেবল একমাত্রিক নয়। সেখানে ভক্তি আছে, কর্ম আছে, জ্ঞান আছে।

ভক্তি মানুষকে অহংকার থেকে মুক্ত করে এবং হৃদয়ে প্রেম ও মানবিকতা সৃষ্টি করে।
জ্ঞান মানুষকে সত্য ও মিথ্যা, ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্য বুঝতে শেখায়।
কর্ম মানুষকে সেই উপলব্ধিকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে শেখায়।

এই তিনটির সমন্বয় ছাড়া ব্যক্তি বা সমাজের প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

শুধু প্রার্থনা করলেই সমাজ বদলাবে না, যদি আমাদের কর্মে অন্যায় থাকে।
শুধু জ্ঞান থাকলেই চলবে না, যদি সেই জ্ঞান মানবকল্যাণে ব্যবহার না করি।
আবার শুধু কর্ম করলেও চলবে না, যদি সেই কর্মের মধ্যে নৈতিকতা ও মানবিকতা না থাকে।

আজকের সমাজে শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা

আজ শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা আমাদের আহ্বান জানায়—

অহংকারের পরিবর্তে বিনয়।
হিংসার পরিবর্তে সহমর্মিতা।
প্রতিশোধের পরিবর্তে ন্যায়বিচার।
অসত্যের পরিবর্তে সত্য।
দুর্নীতির পরিবর্তে সততা।
নীরবতার পরিবর্তে আইনসম্মত ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান।
বিভেদের পরিবর্তে মানবিক ঐক্য।

মনে রাখতে হবে, ধর্মের নামে ঘৃণা ধর্ম নয়; ধর্মের নামে হিংসা ধর্ম নয়; ধর্মের নামে অন্য মানুষের অধিকার হরণও ধর্ম নয়। প্রকৃত ধর্ম মানুষকে উন্নত, সংযমী, ন্যায়পরায়ণ ও মানবিক করে।

জন্মাষ্টমীর প্রকৃত শিক্ষা তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন আমরা ঘরে ঘরে কেবল ধর্মীয় উৎসব পালন করব না, বরং ঘরে ঘরে নৈতিকতা, মানবতা, ন্যায়বোধ ও সহমর্মিতার জন্ম দেব।

আজকের সমাজে হয়তো শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের সবচেয়ে বড় অর্থ এটাই—
যখন অন্যায়ের অন্ধকার ঘনীভূত হয়, তখন মানুষের বিবেককেই জাগ্রত হতে হয়।

আসুন, জন্মাষ্টমীর এই পবিত্র দিনে আমরা অঙ্গীকার করি—

নিজের ভেতরের লোভ, হিংসা ও অহংকারকে দমন করব;
অন্যায় করব না এবং অন্যায়ের কাছে মাথা নত করব না;
আইনসম্মত, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক উপায়ে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াব;
দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে থাকব;
নিজ নিজ কর্তব্য সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করব;
এবং শ্রীকৃষ্ণের কর্ম, জ্ঞান, ভক্তি ও ন্যায়ের আদর্শে একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে কাজ করব।

ধর্মের পথে চলুক মানবতা,
ন্যায়ের আলোয় আলোকিত হোক সমাজ,
মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত হোক সত্য, প্রেম ও সহমর্মিতা।

শুভ জন্মাষ্টমী।

রিপন চন্দ্র ভৌমিক
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

সম্পর্কিত খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল খায়ের 

নির্বাহী সম্পাদক: 
বার্তা প্রধান:

অফিস: বাড়ি ২৫ (দ্বিতীয় তলা), সড়ক ৫, সেক্টর ৬, উত্তরা, ঢাকা।

যোগাযোগ: ০১৭১৫৩৬৩০৭৯

বিজ্ঞাপন: ০১৮২৬৩৯৫৫৪৯

Email: khair.hrm@gmail.com

info@dainikprotibimbo.com

protibimboprokash.com

ফেসবুকে আমরা

©2025 Dainik Protibimbo – All Right Reserved. Designed and Developed by Bangla Webs