ইসলাম মানুষের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে জীবনঘনিষ্ঠ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। এমন কিছু কাজ রয়েছে, যা বিশেষ পরিস্থিতিতে বৈধ হলেও ইসলামে তা নিরুৎসাহিত ও নিন্দনীয় হিসেবে বিবেচিত। প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) উম্মতের দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের কথা বিবেচনা করেই এসব কাজ থেকে দূরে থাকতে উৎসাহিত করেছেন। নিচে তেমন তিনটি বৈধ কিন্তু নিন্দনীয় কাজ নতুনভাবে উপস্থাপন করা হলো—
১. ভিক্ষাবৃত্তি
ইসলামে ভিক্ষাবৃত্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়; বরং চরম অভাবগ্রস্ত, গরিব, মিসকিন ও অসহায়দের জন্য এটি বৈধ রাখা হয়েছে। তবে অযথা ভিক্ষাবৃত্তিকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
لَأَنْ يَأْخُذَ أَحَدُكُمْ حَبْلَهُ فَيَحْتَطِبَ عَلَى ظَهْرِهِ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَسْأَلَ النَّاسَ
‘তোমাদের কেউ যদি দড়ি নিয়ে বনে গিয়ে কাঠ কেটে তা পিঠে বহন করে জীবিকা নির্বাহ করে, তা মানুষের কাছে ভিক্ষা চাওয়ার চেয়ে উত্তম।’ (বুখারি ১৪৭১)
হাদিসে আরও এসেছে—
الْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى
‘উপরের হাত (দাতা) নিচের হাত (গ্রহীতা) থেকে উত্তম।’ (বুখারি ১৪২৭)
অন্য হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে—
مَنْ سَأَلَ النَّاسَ تَكَثُّرًا فَإِنَّمَا يَسْأَلُ جَمْرًا
‘যে ব্যক্তি সম্পদ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে মানুষের কাছে ভিক্ষা করে, সে আসলে আগুনের কণা ভিক্ষা করে।’ (মুসলিম ২২৮৯)
২. ঋণগ্রহণ
প্রয়োজনে ঋণ নেওয়া বৈধ হলেও এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। ইসলাম ঋণ পরিশোধকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে, কারণ এটি বান্দার হক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
مَنْ مَاتَ وَهُوَ بَرِيءٌ مِنَ الْكِبْرِ وَالْغُلُولِ وَالدَّيْنِ دَخَلَ الْجَنَّةَ
‘যে ব্যক্তি অহংকার, খেয়ানত ও ঋণমুক্ত অবস্থায় মারা যায়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (তিরমিজি ১৫৭২, ইবনে মাজাহ ২৪১২)
হাদিসে পাকে আরও এসেছে—
يُغْفَرُ لِلشَّهِيدِ كُلُّ شَيْءٍ إِلَّا الدَّيْنَ
‘শহীদের সব গুনাহ ক্ষমা করা হয়, কিন্তু ঋণ ক্ষমা করা হয় না।’ (মুসনাদ আহমদ ২২৪৯৩)
এ থেকে বোঝা যায়, ঋণগ্রহণ বৈধ হলেও তা অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পরিশোধ করা আবশ্যক।
৩. বিবাহবিচ্ছেদ (তালাক)
ইসলামে চরম প্রয়োজনে তালাকের অনুমতি থাকলেও এটি অত্যন্ত অপছন্দনীয়। সংসার টিকিয়ে রাখা ও সম্পর্ক রক্ষা করাকেই ইসলাম বেশি গুরুত্ব দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا
‘তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা চাইলে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন বিচারক নিয়োগ করো।’ (সুরা নিসা: আয়াত ৩৫)
কুরআনুল কারিমে আরও বলা হয়েছে—
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
‘তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।’ (সুরা নিসা: আয়াত ১৯)
হাদিসে পাকে এসেছে—
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ
‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।’ (মেশকাতুল মাসাবিহ)
হাদিসে আরও বর্ণিত আছে—
مَا أَحَلَّ اللَّهُ شَيْئًا أَبْغَضَ إِلَيْهِ مِنَ الطَّلَاقِ
‘আল্লাহর কাছে হালাল বিষয়গুলোর মধ্যে তালাক সবচেয়ে অপছন্দনীয়।’ (আবু দাউদ)
ইসলাম মানুষের জীবনকে সুন্দর, সুষম ও কল্যাণময় করতে বৈধতার পাশাপাশি নৈতিক দিকেও গুরুত্ব দেয়। ভিক্ষাবৃত্তি, ঋণগ্রহণ ও তালাক—এই তিনটি কাজ প্রয়োজনের কারণে বৈধ হলেও তা থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকার নির্দেশনা এসেছে। তাই একজন সচেতন মুসলিমের উচিত এসব বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য উত্তম পথ বেছে নেওয়া। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নিন্দনীয় কাজ থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।

