শরিফ ওসমান হাদি ইস্যুতে বহুল আলোচিত ১১ সহিংসতা নিয়ে যা জানা গেল

by protibimbo
০ মন্তব্য ১৩৫ বার পড়া হয়েছে

রাজধানীর পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হন। এরপর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়। হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে রাতভর দেশের বিভিন্ন স্থানে ভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিপ্রেক্ষিতে ১৯ ডিসেম্বর সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি পোস্ট ভাইরাল হয়, যাতে হাদির মৃত্যু সংবাদ পরবর্তী সময়ে ১১টি ঘটনার তথ্য দেওয়া হয়।

ফেসবুকের উক্ত তথ্য সম্বলিত পোস্টগুলো দেখুন এখানে—

একই তথ্যগুলো উল্লেখ করে বিএনপির সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও দেখুন এখানে। পোস্ট দেখুন এখানে—

ফ্যাক্টচেক

Banner

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, ওসমান হাদির হত্যার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ঘটা ১১ ঘটনা সংক্রান্ত দাবিগুলোর সবকটি সত্য নয়। প্রকৃতপক্ষে এগুলোর মধ্যে ২, ৩, ৪, ৯, ১০ ও ১১নং দাবি সত্য, ৫ ও ৭নং দাবিগুলো মিথ্যা, ১ ও ৬ নং দাবিগুলো আংশিক মিথ্যা ও ৮নং দাবিটি বিভ্রান্তিকর হিসেবে প্রমাণ পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার।

এ সংক্রান্ত দাবির সূত্রপাত অনুসন্ধানে ফেসবুকে আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জয়দেব নন্দীর প্রোফাইলে ১৯ ডিসেম্বর সকাল ৯ টা ৪৬ মিনিটে প্রকাশিত একটি পোস্টে একই তথ্য পাওয়া যায়। পোস্টটির এডিট হিস্টোরি যাচাই করে দেখা যায়, মোট পাঁচবার পোস্টটি সম্পাদনা করা হয়েছে। প্রথম ভার্সনে ৮টি ঘটনার উল্লেখ ছিল। পরবর্তীতে আরও ৩টি ঘটনার তথ্য যুক্ত করা হয় এতে।

এ পোস্টটিই পরবর্তীতে দুপুর ০১.৪৭ মিনিটে সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের হুবহু পোস্ট করলে, সেখান থেকে এটি ব্যাপক ভাইরাল হয়ে যায়। পরবর্তীতে তা উল্লেখ করা হয় বিএনপির সংবাদ সম্মেলনেও।

দাবিগুলো নিয়ে পৃথকভাবে অনুসন্ধান করেছে রিউমর স্ক্যানার।

দাবি ১:  খুলনা ও চট্টগ্রামে ভারতের হাইকমিশনের কার্যালয় ও বাসভবনে হামলা।

যা জানা যাচ্ছে: খুলনায় ইন্ডিয়ান সহকারী হাইকমিশনে হামলার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সেখানে ১৮ ডিসেম্বর বিকালে হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিতের খবর (১, ২) পাওয়া যায়। অন্যদিকে হাদির মৃত্যুর খবর আসে সেদিন রাতে। তবে চট্টগ্রামে ভারতের সহকারি হাইকমিশনারের বাসভবনে বিক্ষোভ থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপের তথ্য পাওয়া যায়।

অর্থাৎ, এই দাবিটি আংশিক মিথ্যা।

দাবি ২: প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ঢাকার প্রধান কার্যালয় ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ।

যা জানা যাচ্ছে: জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর ২০ ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ১৮ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে সন্ত্রাসীরা কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ও কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউতে ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। পরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয় কার্যালয় দুটি। ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদন থেকেও একই তথ্য জানা যায়।

অর্থাৎ, দাবিটি সত্য।

দাবি ৩: ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারে আবারও অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর।

যা জানা যাচ্ছে: মূল ধারার গণমাধ্যম ইনডিপেনডেন্ট টিভির এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯ ডিসেম্বর রাত পৌনে ১টার দিকে একদল বিক্ষুব্ধ জনতা ৩২ নম্বরের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর করে। একপর্যায়ে তারা অগ্নিসংযোগ করে। ১৯ ডিসেম্বর সকালেও উপস্থিত ছাত্র-জনতা ৩২ নম্বরের বাড়ি ভেঙে ফেলা ভবনগুলোর অবশিষ্ট অংশে ভাঙচুর চালায়। অন্যান্য গণমাধ্যম সূত্রেও এ সংক্রান্ত সংবাদ ও ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে।

অর্থাৎ, এ দাবিটিও সত্য।

দাবি ৪: ছায়ানটের কার্যালয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ।

যা জানা যাচ্ছে: জাতীয় দৈনিক সমকাল পত্রিকার ২০ ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯ ডিসেম্বর গভীর রাতে রাজধানীর ধানমন্ডির সাংস্কৃতিক ও সংগীত ঐতিহ্যের ধারক ছায়ানট ভবনে একদল লোক হামলা চালায়। করা হয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ। ভবনটির নিচতলা থেকে শুরু করে ষষ্ঠ তলার লাইব্রেরি পর্যন্ত কোথাও কোনো জিনিসপত্র অক্ষত নেই। এ বিষয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে ছায়ানট কর্তৃপক্ষ।

অর্থাৎ, এই দাবিটিও সত্য।

দাবি ৫: ইন্দিরাগান্ধী কালচালার সেন্টার ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ।

যা জানা যাচ্ছে: রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারে সম্প্রতি হামলা বা অগ্নিসংযোগের কোনো তথ্য, ছবি বা ভিডিও গণমাধ্যম সূত্রে পাওয়া যায়নি। এ সেন্টারে হামলার ঘটনা ঘটেছিল গত বছরের ৫ আগস্ট, শেখ হাসিনার পতনের পর।

অর্থাৎ, এই দাবিটি মিথ্যা।

দাবি ৬: উত্তরায় ৩২ দোকান ভাঙচুর ও আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ।

যা জানা যাচ্ছে: উত্তরায় সম্প্রতি দোকান ভাঙচুরের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে জাতীয় দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, উত্তরায় আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য হাবিব হাসানের বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিসের উত্তরা শাখার পক্ষ থেকেও রিউমর স্ক্যানারকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

অর্থাৎ, এ দাবিটি আংশিক মিথ্যা।

দাবি ৭: রাজশাহীতে ডেইলি স্টার-প্রথম আলোর কার্যালয় ভাঙচুর।

যা জানা যাচ্ছে: দ্য ডেইলি স্টারের প্রধান প্রতিবেদক রিউমর স্ক্যানারকে জানিয়েছেন, রাজশাহীতে তাদের কোনো অফিস নেই। অন্যদিকে, প্রথম আলোর রাজশাহী প্রতিনিধি আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ রিউমর স্ক্যানারকে জানিয়েছেন, রাজশাহীতে প্রথম আলো কার্যালয়ে ভাংচুরের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে গত বছরের ২৫ নভেম্বর রাজশাহীতে দৈনিক প্রথম আলোর কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

অর্থাৎ, এই দাবিটি মিথ্যা।

দাবি ৮: ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে ময়মনসিংহে এক হিন্দু যুবককে গাছে ঝুলিয়ে পিটিয়ে হত্যা!

যা জানা যাচ্ছে: ফেসবুকে ১৮ ডিসেম্বর রাত ৯টা ৫ মিনিটের এক ফেসবুক পোস্ট থেকে জানা যায়, হযরত মুহাম্মদকে (সা.) নিয়ে কটুক্তি করায় স্কয়ার মাস্টার বাড়ি ডুবালিয়া পাড়াই গণপিটুনিতে একজনের মৃত্যু হয়েছে। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনেও একই তথ্য পাওয়া যায়। বলা হয়, ময়মনসিংহের ভালুকার এ ঘটনায় পোশাক কারখানার ওই শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যার পর কারখানার সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের জামিরদিয়া ডুবালিয়াপাড়া এলাকায় লোকজন বিক্ষোভ করে তার লাশে আগুন ধরিয়ে দেন। নিহত দিপু চন্দ্র দাস (২৭) জামিরদিয়া ডুবালিয়াপাড়া এলাকার পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেডের কারখানার শ্রমিক ছিলেন। তিনি তারাকান্দা উপজেলার বানিহালা ইউনিয়নের মোকামিয়াকান্দা গ্রামের রবি চন্দ্র দাসের ছেলে। অন্যদিকে ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর আসে এরও প্রায় ৪০ মিনিট পরে।

অর্থাৎ, এ দাবিটি বিভ্রান্তিকর।

দাবি ৯: চট্রগ্রামের প্রয়াত মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাসায় ফের অগ্নি-সংযোগ, ভাঙচুর।

যা জানা যাচ্ছে: অনলাইন সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ২৪ সূত্রে জানা যায়, হাদি হত্যার প্রতিবাদে চট্টগ্রামে বিক্ষোভ থেকে সাবেক সিটি মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাসায় আগুন দিয়েছে একদল মানুষ। ১৮ ডিসেম্বর রাত সোয়া ১১টার দিকে নগরীর ষোলশহর এলাকায় চশমা হিলের মেয়র গলিতে যান বিক্ষুব্ধরা। বাড়িটিতে থাকতেন প্রয়াত মহিউদ্দিন চৌধুরীর বড় ছেলে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।

অর্থাৎ, এ দাবিটি সত্য।

দাবি ১০: সাবেক মন্ত্রী বীর বাহাদুরের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ।

যা জানা যাচ্ছে: জাতীয় দৈনিক সমকাল সূত্রে জানা যায়, বান্দরবানে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিংয়ের বাড়িতে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। আগুনে দুটি গাড়িসহ বিভিন্ন দামি আসবাবপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ১৮ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১২টার দিকে বীর বাহাদুর উশৈসিংয়ের বাসভবনে আগুন দেওয়া হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা ও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

অর্থাৎ, এ দাবিটিও সত্য।

দাবি ১১: নিউজ এজ সম্পাদক নুরুল কবিরের উপর হামলা।

যা জানা যাচ্ছে: ইংরেজি দৈনিক নিউ এজের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯ ডিসেম্বর ভোরে ঢাকার ফার্মগেটের কাছে দ্য ডেইলি স্টার অফিসের সামনে নিউ এজের সম্পাদক এবং সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নুরুল কবিরকে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কবিরকে উদ্ধার করেন।

অর্থাৎ, এ দাবিটিও সত্য।

সবমিলিয়ে, আলোচিত পোস্টগুলোতে যে ১১টি ঘটনার দাবি করা হয়েছে তার মধ্যে ছয়টি দাবি সত্য, দুইটি মিথ্যা, দুইটি আংশিক মিথ্যা ও একটি বিভ্রান্তিকর হিসেবে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

 

সম্পর্কিত খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল খায়ের 

নির্বাহী সম্পাদক: 
বার্তা প্রধান:

অফিস: বাড়ি ০৭, সড়ক ১৪/সি, সেক্টর ৪,

উত্তরা, ঢাকা-১২৩০।

যোগাযোগ: ০১৭১৫৩৬৩০৭৯

বিজ্ঞাপন: ০১৮২৬৩৯৫৫৪৯

Email: khair.hrm@gmail.com

info@dainikprotibimbo.com

protibimboprokash.com

ফেসবুকে আমরা

©2025 Dainik Protibimbo – All Right Reserved. Designed and Developed by Bangla Webs