কর্মজীবী নারী, একাকী সন্তান: অদেখা বাস্তবতা। মুক্তগদ্য। সামসুন নাহার

by protibimbo
০ মন্তব্য বার পড়া হয়েছে

কর্মজীবী নারী, একাকী সন্তান: অদেখা বাস্তবতা
সামসুন নাহার

রাত সাড়ে আটটা।

নীলা ও তার স্বামী দুজনই কর্মজীবী। সকাল আটটায় বাসা থেকে বের হয়ে ফেরেন সন্ধ্যার পর। সংসারের আর্থিক স্বচ্ছলতা এসেছে, কিন্তু অজান্তেই সন্তানকে দেওয়ার সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটি হারিয়ে যাচ্ছে—সময়।

সারাদিন অফিস শেষে বাসায় ফিরেই সোফায় বসে পড়লেন অভির বাবা। হাতে মোবাইল ফোন। দিনের ক্লান্তি কাটানোর জন্যে এটুকু ব্যক্তিগত সময় যেন তার খুব প্রয়োজন। অন্যদিকে নীলা অফিসের পোশাক না বদলেই দ্রুত রান্নাঘরে ঢুকে রাতের খাবারের আয়োজন গুছিয়ে নিচ্ছেন। অফিসের ক্লান্তি, সংসারের কাজ আর সন্তানের চিন্তা—সবকিছু একই সঙ্গে তার কাঁধে এসে জমা হয়েছে।

Banner

কিছুক্ষণ পর তিনি ছেলের ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন।

দরজাটা আধখোলা।

টেবিলের ওপর বই খোলা থাকলেও চোখ আটকে আছে মোবাইলের পর্দায়। কয়েকবার ডাকলেও কোনো সাড়া নেই। অনলাইন গেমের একটি ম্যাচ যেন এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সারাদিন পর বাসায় বাবা-মা এসেছে, এই ব্যাপারে তার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।

মা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজা থেকে ফিরে এলেন।

দৃশ্যটি নীলার কাছে নতুন নয়।

বরং এই দৃশ্যই ধীরে ধীরে তার বুকের ভেতরে এক অদৃশ্য উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

অভি এখন দশম শ্রেণির ছাত্র। কয়েক বছর আগেও সে ছিল প্রাণবন্ত, কৌতূহলী এবং পরিবারকেন্দ্রিক একটি শিশু। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তার ভেতরে পরিবর্তন এসেছে। পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমেছে, পরিবারের সঙ্গে কথাবার্তা কমেছে, নিজের ঘরে একা থাকার প্রবণতা বেড়েছে। খাবারের টেবিলে, অবসরের মুহূর্তে, এমনকি গভীর রাতেও তার সঙ্গী হয়ে উঠছে একটি স্ক্রিন। নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে এক অদৃশ্য জগতে। অন্তর্মুখী হয়ে পড়ছে, বাস্তব জীবনের সম্পর্ক ও দায়িত্ব থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

নীলা অনেকদিন থেকেই বিষয়গুলো লক্ষ্য করছিলেন।

মনে পড়ে কয়েক বছর আগে, অভির আবদারে তার বাবা একটি দামি স্মার্টফোন কিনে দিয়েছিলেন। নীলা তখন আপত্তি করেছিলেন। তার মনে হয়েছিল, অল্প বয়সে প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার সন্তানের মনোযোগ ও মানসিক বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে। ব্যক্তিগত স্মার্টফোন সন্তানের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং নতুন এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

কিন্তু মায়ের আপত্তি গুরুত্ব পায়নি।

বাবার যুক্তি ছিল সহজ—সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়া জরুরি।

কথাটি ভুল ছিল না। কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহারের স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধের শিক্ষা না থাকলে সেই স্বাধীনতাই কখনো কখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

ধীরে ধীরে অভি বুঝে গেল, কোনো বিষয়ে মায়ের আপত্তি থাকলেও বাবাকে রাজি করানো সম্ভব। মা যখন পড়াশোনার কথা বলেন, সময়মতো ঘুমানোর কথা বলেন কিংবা মোবাইল ব্যবহারে সীমা টানতে চান, কোনো ভুল আচরণ সংশোধনের চেষ্টা করেন, তখন সে বিরক্ত হয়। আর বাবা যখন বিষয়গুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে এড়িয়ে যান, নিজেই মোবাইলের জগতে ডুবে থাকেন, তখন সন্তানের চোখে মায়ের অবস্থান ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।

এই অদৃশ্য বিভাজনটি সাধারণত কেউ গুরুত্ব দেয় না।

কিন্তু সন্তান মানুষ করার ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের সমন্বয়ের অভাব অনেক সময় নীরব সংকট তৈরি করে।

একজন সন্তান খুব দ্রুত বুঝে যায় কার কাছ থেকে নিজের ইচ্ছা পূরণ করা সহজ। তখন সে নিয়মের চেয়ে প্রশ্রয়কে বেশি পছন্দ করতে শেখে। ধীরে ধীরে শাসন, স্নেহ ও দায়িত্ববোধের মধ্যে যে ভারসাম্য থাকা উচিত, তা নষ্ট হতে শুরু করে।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, মা সমস্যাটি বুঝতে পারেন, কিন্তু একা সমাধান করতে পারেন না।

একজন কর্মজীবী মায়ের অসহায়ত্ব এখানেই। তিনি পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না।

তিনি সন্তানের পরিবর্তন দেখেন, উদ্বিগ্ন হন, সতর্ক করেন; কিন্তু যদি তার সেই উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া না হয়, তাহলে তিনি ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যান। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে তিনি বুঝতে থাকেন, সন্তানের অনেক কিছু বদলে যাচ্ছে।

অভির জীবনে আরেকটি বিষয়ও ছিল।

সে পরিবারের একমাত্র সন্তান।

একসময় ভাই-বোনদের সঙ্গে বেড়ে ওঠার মধ্যে শিশুরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক শিক্ষা পেত। ভাগাভাগি করা, অপেক্ষা করা, মতের অমিল মেনে নেওয়া, ঝগড়া করে আবার মিল হয়ে যাওয়া—এসব ছোট ছোট অভিজ্ঞতাই তাদের সম্পর্কের জগৎকে সমৃদ্ধ করত।

অভির সেই সুযোগ ছিল না।

স্কুল থেকে ফিরে তার সঙ্গে গল্প করার মতো কোনো ভাই বা বোন ছিল না। নিজের আনন্দ, কষ্ট কিংবা অভিমান ভাগ করে নেওয়ারও কেউ ছিল না। ফলে অজান্তেই সে নিজের ভেতরে একটি আলাদা জগৎ তৈরি করে নিল।

সেই শূন্য জায়গাটি ধীরে ধীরে দখল করে নিল মোবাইল ফোন ও ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব।

অবশ্য একমাত্র সন্তান হওয়া কোনো সমস্যা নয়। অসংখ্য একমাত্র সন্তান অত্যন্ত সুন্দর ও সুস্থভাবে বেড়ে ওঠে। কিন্তু যখন একমাত্র সন্তান হওয়ার সঙ্গে যুক্ত হয় দীর্ঘ সময় একা থাকা, কর্মব্যস্ত বাবা-মা, সীমিত সামাজিক যোগাযোগ এবং অতিরিক্ত স্ক্রিননির্ভরতা, তখন নিঃসঙ্গতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

আজকের সমাজে এই বাস্তবতা ক্রমশ বেড়েই চলেছে।

এক সময় শিশুরা মাঠে খেলত, প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিশত, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে সময় কাটাত। পরিবার শুধু একটি ঘর ছিল না; ছিল সম্পর্কের বিস্তৃত পরিসর। নানা জনের পদচারণায় একটি সামাজিক পরিমণ্ডল।

বর্তমান নগরজীবনে সেই পরিবেশ অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে। পাশের ফ্ল্যাটের মানুষকেও চেনা হয় না। ফলে তারা অন্তর্মুখী হয়ে পড়ে। নিজের অনুভূতি প্রকাশে সংকোচ বোধ করে।

অনেক বাবা-মা অভিযোগ করেন, সন্তান এখন কারও সঙ্গে মিশতে চায় না। আত্মীয়-স্বজন বাসায় এলে ঘর থেকে বের হয় না। পারিবারিক অনুষ্ঠানে যেতে আগ্রহ দেখায় না।

আচ্ছা বলুন, এই পরিবর্তনগুলো হঠাৎ করেই কি তৈরি হয়েছে?

না। সময়ের পর সময় ধরে জমে ওঠা একাকীত্ব, অবহেলা এবং সম্পর্কের ঘাটতি থেকেই এগুলোর জন্ম হয়।

কৈশোর এমন একটি সময়, যখন একজন সন্তানের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দিকনির্দেশনা, মনোযোগ এবং মানসিক নিরাপত্তা। কিন্তু দিনের বড় একটি অংশ যখন সে একা কাটায়, তখন সেই শূন্যস্থান পূরণ করে প্রযুক্তি, ভার্চুয়াল বিনোদন কিংবা কখনো কখনো অনাকাঙ্ক্ষিত সঙ্গ।

আরও গভীর সংকট দেখা দেয় যখন বাবা-মায়ের নিজেদের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে।

একটি সন্তান শুধু উপদেশ শুনে শেখে না; সে তার বাবা-মাকে দেখে শেখে।

তাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা, বোঝাপড়া এবং ভালোবাসা থেকেই সে সম্পর্কের ভাষা শেখে। আবার তাদের দ্বন্দ্ব, দূরত্ব কিংবা অবহেলা থেকেও শিক্ষা নেয়।

যে পরিবারে বাবা-মা পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠেন, সেখানে সন্তানের নিরাপত্তাবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক শিশু তখন নিজের মধ্যে গুটিয়ে যায়, কেউ বিদ্রোহী হয়ে ওঠে, কেউ ভুল বন্ধুত্বে জড়িয়ে পড়ে, আবার কেউ ভার্চুয়াল জগতে আশ্রয় খুঁজে বেড়ায়।

আজ আমাদের সমাজে এমন অসংখ্য অভি রয়েছে। বাইরে থেকে যাদের সবকিছু ঠিকঠাক মনে হয়, কিন্তু ভেতরে তারা নিঃসঙ্গতা, অবহেলা এবং মানসিক অস্থিরতার সঙ্গে লড়াই করছে।

আমরা প্রায়ই সন্তানের জন্য ভালো স্কুল বেছে নিই, দামি পোশাক কিনি, আধুনিক প্রযুক্তি দিই এবং ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করি।

কিন্তু অনেক সময় ভুলে যাই, একজন শিশুর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি প্রশান্তিময় পরিবার—একটি নিরাপদ আশ্রয়।

সে এমন একজন বাবাকে চায়, যিনি তার কথা মন দিয়ে শুনবেন।

সে এমন একজন মাকে চায়, যিনি তার অনুভূতি বুঝবেন।

আর সে এমন একটি ঘর চায়, যেখানে বাবা-মা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নন, বরং সহযোগী। এমন একটি পরিবেশ, যেখানে ভালোবাসা ও সম্মান প্রতিদিনের জীবনের অংশ।

একজন কর্মজীবী মায়ের সংগ্রাম শুধু সময়ের সঙ্গে নয়; পরিস্থিতির সঙ্গেও। তিনি অফিস সামলান, সংসার সামলান, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন, আবার তার পরিবর্তনও সবার আগে অনুভব করেন। আবার তার ব্যক্তিগত জীবনেও নানা টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। কী এক করুণ অসহায়ত্ব! এটাই অনেক কর্মজীবী মায়ের বুকের ভেতর চাপা চিনচিনে কষ্ট।

এতকিছুর মধ্যেও সন্তান মানুষ করার দায়িত্ব যদি একা মায়ের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেই সংগ্রাম অসম হয়ে যায়। তাই নয় কি?

সন্তান মানুষ করার ক্ষেত্রে শুধু মায়ের ভূমিকা নয়, বাবার ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একজন কর্মজীবী মা যদি ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফেরেন, তবে একজন দায়িত্বশীল বাবার উচিত সেই দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া। আবার একজন বাবা কর্মব্যস্ত থাকলে মায়ের উচিত সন্তানের পাশে দাঁড়ানো।

আজ আমাদের নিজেদের কাছে একটি প্রশ্ন করা দরকার—আমরা কি সত্যিই সন্তানদের জন্য সময় দিচ্ছি, নাকি শুধু তাদের জন্য ব্যস্ত থাকছি?

একটি শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শুধু বই, প্রযুক্তি কিংবা আর্থিক স্বচ্ছলতায় নয়; গড়ে ওঠে পরিবারের উষ্ণতা, বাবা-মায়ের ঐক্য, সামাজিক সংযোগ এবং প্রতিদিনের ছোট ছোট আন্তরিক মুহূর্তে।

একজন কর্মজীবী মায়ের জীবন শুধু অফিস ও সংসারের দায়িত্বের সমষ্টি নয়; এটি প্রতিনিয়ত ভারসাম্য রক্ষার এক কঠিন সংগ্রাম। তিনি পরিবারের জন্য কাজ করেন, সন্তানের ভবিষ্যতের জন্যও স্বপ্ন দেখেন।

এখন সময় এসেছে নতুন করে ভাবার। সন্তানের জন্য আমরা কী রেখে যাচ্ছি—শুধু অর্থ ও প্রযুক্তি, নাকি সময়, মূল্যবোধ, ভালোবাসা এবং একটি সুস্থ পারিবারিক পরিবেশ?

সম্পর্কিত খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল খায়ের 

নির্বাহী সম্পাদক: 
বার্তা প্রধান:

অফিস: বাড়ি ০৭, সড়ক ১৪/সি, সেক্টর ৪,

উত্তরা, ঢাকা-১২৩০।

যোগাযোগ: ০১৭১৫৩৬৩০৭৯

বিজ্ঞাপন: ০১৮২৬৩৯৫৫৪৯

Email: khair.hrm@gmail.com

info@dainikprotibimbo.com

protibimboprokash.com

ফেসবুকে আমরা

©2025 Dainik Protibimbo – All Right Reserved. Designed and Developed by Bangla Webs