সু-শিক্ষা গ্রহণে অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষালয়ের নীতি-নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতায় রূপরেখা: মুক্তগদ্য। নাসরীন খান

by protibimbo
০ মন্তব্য বার পড়া হয়েছে

জাতীয় উন্নয়নে প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীকে বৈষম্যহীন, নৈতিকতা সমৃদ্ধ, সহনশীল পাঠদান,কু কারিকুলাম শিক্ষা সহায়ক হতে পারে সঠিক শিক্ষাদান।এর মাধ্যমে সু-শিক্ষা গ্রহণে অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষালয়ের নীতি-নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতায় রূপরেখা
জাতীয় উন্নয়নে সঠিক দিক নির্দেশক হত পারে।

শুধু বড় বড় ভবন, রাস্তা বা প্রযুক্তির অগ্রগতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় সঠিক শিক্ষা ব্যাবস্থা। প্রকৃত উন্নয়ন গড়ে ওঠে একটি শিক্ষিত, নৈতিক ও মানবিক জাতি তৈরির মাধ্যমে। আর সেই জাতি গঠনের মূল ভিত্তি হলো বৈষম্যহীন সু-শিক্ষা।একটি বৈষম্য হীন শিক্ষা ব্যবস্থাই পরিবর্তন আনতে পারে পরিবার, সমাজ, রাস্ট্রের। যেখানে প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রী সমান সুযোগ, সমান মর্যাদা এবং নিরাপদ পরিবেশে জ্ঞান অর্জন করতে পারে।প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে হবে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য নিরাপদ।
আজকাল বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষক দ্বারা ছাত্র -ছাত্রীদের নির্যাতন এর খবর প্রকাশিত হচ্ছে। যা রীতিমতো ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করছে। কোমলপ্রাণ শিক্ষার্থী সহ অভিভাবকও হতাশ।শুধু বেত্রাঘাত নয় মানষিক চাপও আগের তুলনায় শিক্ষার্থীদের বহুগুণ বেড়ে গেছে। যা রীতিমতো ভাবনার বিষয়।

আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক, বিজ্ঞানী,ডাক্তার, শিক্ষক, উদ্যোক্তা ও সৎ নাগরিক হওয়ায় দাবি রাখে। তাই শিক্ষাক্ষেত্রে সামান্য অবহেলাও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এই কারণে অভিভাবক, শিক্ষক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—তিন পক্ষের দায়িত্বশীলতা ও নৈতিক আচরণ নিশ্চিত করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
অভিভাবক এর প্রসঙ্গে বলতে গেলে তাদের দায়িত্বশীলতা সবচেয়ে বেশি। একটা শিশু জন্মের পর থেকে প্রথম চার থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত
অভিভাবক হচ্ছেন শিক্ষার্থীর জীবনের প্রথম শিক্ষক। শিশুর শারীরিক স্বাস্থ্য ও মানষিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখা অভিভাবক এর প্রথম কাজ।সন্তানটি জন্মের পর যদি প্রাণহীন এক পরিবারে বেড়ে উঠে তাহলে তার মানষিক ও শারীরিক চাপ দুটোই হুমকির সম্মুখীন হয়।শিশুর মস্তিষ্কে চাপ পরে এমন কোন কাজ কোন অভিভাবক এর করা উচিৎ নয়।মানষিক বিকাশ শুরু হয় যখন থেকে শিশু বেড়ে উঠতে থাকে, সবকিছু একটু একটু করে শিশু বুঝতে পারে।তাকে সুন্দর ও নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করতে হবে মা-বাবা সহ পরিবারে যারা থাকেন সকলকে। যখন যা চায় শিশু তা তার সামনে হাজির করার নামও শিশুকে যথাযথ মানুষ হতে সহায়তা করবে না। সঠিক নিয়মানুবর্তিতাও শিখাতে হবে পরিবার থেকে।
তাকে বেড়ে ওঠার পাশাপাশি তার সাথে কথা বলা,সময় দেয়া এগুলো নিশ্চিত করতে হবে। বাচ্চা চাচ্ছে বলে তাকে সারাক্ষণ কার্টুন বা মোবাইল দিয়ে বসিয়ে রাখা কোন ভালো কাজ নয়।একটা শিশু প্রাথমিক ভাবে মানষিক অবস্থা গঠিত হয় পরিবার, পরিজনের মাধ্যমে।

সন্তানকে শুধু ভালো ফল করার জন্য চাপ দেওয়া ঠিক নয় এতে বাচ্চার ভিতরে হিংসাত্মক মানসিকতা গড়ে ওঠে। অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা বা ভালোবাসা জন্মে না।অসুস্থ এক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত মানুষ তৈরি হয়।অন্যায় ভাবেও সে যেন সবার উপরে থাকে সেই চেষ্টায় সারাক্ষণ থাকে। শুধু ক্লাসে প্রথম হওয়া নয় বরং তাকে সৎ, দায়িত্ববান ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই অভিভাবকের প্রধান দায়িত্ব। সন্তানকে সময় দেওয়া, তার মানসিক অবস্থা বোঝা, তার পড়াশোনায় সহযোগিতা করা এবং অসৎ পথে বা অন্যায় কাজে উৎসাহ না দেওয়া অভিভাবকের কর্তব্য। একইসাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে, সন্তানকে শৃঙ্খলাবোধ ও নৈতিকতা শেখানো প্রয়োজন।

Banner

শিক্ষকের ভূমিকা =

শিক্ষক জাতি গঠনের প্রধাণ কারিগর। একজন শিক্ষক যদি বৈষম্য করেন, পক্ষপাত দেখান বা দায়িত্বে অবহেলা করেন, তাহলে তা শুধু একজন শিক্ষার্থী নয়, পুরো সমাজের জন্য ক্ষতিকর। কারণ সমাজ গঠনে,রাষ্ট্র গঠনে এই কোমলমতি শিক্ষার্থীরাই একদিন এগিয়ে আসবে। ভবিষ্যত প্রতিনিধি হবে তারা। শিক্ষকদের অনুকরণ, অনুসরণ করে ছাত্র-ছাত্রীরা।তাঁরা হন শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা। শিক্ষককে হতে হবে স্নেহশীল, ধৈর্যশীল এবং ন্যায়পরায়ণ। ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি সমান আচরণ, দুর্বল শিক্ষার্থীদের বিশেষ সহায়তা, নৈতিক শিক্ষা প্রদান এবং পড়াশোনার পাশাপাশি জীবনমুখী শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা একজন আদর্শ শিক্ষকের দায়িত্ব।
শিক্ষকের আচরণ ও কথাবার্তায় যেন কখনো অপমান, নিরুৎসাহ বা মানসিক আঘাত না থাকে।শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখাও শিক্ষকদের দায়িত্ব। মানসিক চাপে অনেক শিক্ষার্থীরা স্কুল বিমুখ হয়ে যায় এবং পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়।একধরনের ভীতি তৈরি হয় তাদের মনে ফলে স্কুল থেকে ঝরে যায় বা ড্রপ আউট হয়। কারণ একজন শিক্ষকের একটি বাক্য একজন শিক্ষার্থীকে জীবনভর গড়ে দিতে পারে বা ভেঙে দিতে পারে।পড়ার ভীতি নয় সহজ,বোধগম্য পাঠদান হতে পারে শিক্ষাদানের প্রকৃষ্ট মাধ্যম। কু কারিকুলাম শিক্ষা সহায়ক হতে পারে এইক্ষেত্রে।

শিক্ষালয়ের ভূমিকা =

শিক্ষালয়ের নীতি ও দায়িত্ব
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু পরীক্ষার ফলাফল তৈরির জায়গা নয়; এটি চরিত্র গঠনের কেন্দ্র। জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ানো হয় পিটিতে কিন্তু এর মর্মার্থ শিখানো হয় না। দেশপ্রেমের বোধ তৈরি হয় বিদ্যােপীট থেকে সমবেত ভাবে। তা শুধু তোতাপাখির বুলি আওড়ানোর মধ্যে থাকে। সঠিক ভাবে উপস্থাপন হলে তা হয় হৃদয়গ্রাহী। যা জীবনে কেউ ভুলতে পারে না।এজন্য দেশপ্রেমের অভাব ঘটে পরবর্তী জীবনে অর্থাৎ কর্মক্ষেত্রে। দূর্নীতি গ্রস্ত হয়। ফলে দেশের সেবা তো দূরে জনজীবনে দুর্ভোগ নেমে আসে। সঠিক দেশপ্রেম মানুষকে সত থাকতে সহায়তা করে।
শিক্ষালয়ের উচিত এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা যেখানে কোনো শিক্ষার্থী তার অর্থনৈতিক অবস্থা, পরিবার, লিঙ্গ, ধর্ম, অঞ্চল বা শারীরিক দুর্বলতার কারণে বৈষম্যের শিকার না হয়। বৈষম্যের কথা আমরা মুখে বলি কিন্তু তা দূর করার পদক্ষেপ নেই কোথাও। বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যাবস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষালয়ে নিরাপদ পরিবেশ, শৃঙ্খলা, নৈতিক শিক্ষা, নিয়মিত কাউন্সেলিং ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার কার্যকর উদ্যোগ থাকা জরুরি। কোন স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই মানষিক অবস্থা ঠিক রাখার জন্য কোন ডাক্তার। সঠিক কাউন্সিলিং এর মাধ্যমে মাদক থেকেও শিক্ষার্থীদের দূরে রাখা সম্ভব। আজ মাদকে আসক্ত অনেক শিক্ষার্থীরা।কি ভয়াবহ এক পরিস্থিতি চারদিকে তা না জানলে বিশ্বাস করা কঠিন।
একইসাথে শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা ও সততা নিশ্চিত করা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন পরিচালনা করা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতিভা বিকাশে সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও সৃজনশীল কার্যক্রম চালু রাখা শিক্ষালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
বৈষম্যহীন সু-শিক্ষার রূপরেখা
জাতীয় উন্নয়নের জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় এমন রূপরেখা তৈরি করতে হবে যেখানে
প্রতিটি শিক্ষার্থী সমান সুযোগ পাবে
শিক্ষা হবে মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধভিত্তিক
পাঠদান হবে আধুনিক, বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক
শিক্ষক-অভিভাবক-প্রতিষ্ঠান একসাথে কাজ করবে
শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত থাকবে
ঘুষ, অনিয়ম, প্রশ্নফাঁস, কোচিং নির্ভরতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা থাকবে।
সবশেষে বলতে হয়
আজ আমরা যদি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক এবং দায়িত্বশীল করে তুলতে পারি, তাহলে জাতির ভবিষ্যৎ হবে আলোকিত।
আজকাল ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে কিন্ডারগার্টেন স্কুল।সেখানে নেই কোন পরিবেশ, নেই দেখবাল করার মতন দক্ষ পরিচালক। অল্প টাকায় নেয়া হয় অদক্ষ শিক্ষক। ব্যাবসা হচ্ছে রমরমা। এমনকি সরকারি কোন নিবন্ধনও নেই। একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি শুধু টাকা দিয়ে হয় না। শিক্ষার্থী,অভিভাবক সবাই মানসিক চাপে দিন পার করছ।পূণঃভর্তির নামে প্রতিবছর অভিভাবকদের পকেট শূন্য হচ্ছে। আমার মতে একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সপল তখনই বলা যায় যখন সেখানে শিশুদের ক্লাসে প্রথম হওয়া নয় সঠিক মানসিক ও শারীরিক বিকাশ নিশ্চিত থাকে। শুধু শিক্ষার্থী নয় শিক্ষকদের আচরণেরও শারীরিক ও মানষিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য ডাক্তার থাকতে হবে। আজকাল শিক্ষক দ্বারা শিক্ষার্থী বুলিং চলছে বেশি।
আজকাল চারিদিকে চলছে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেউ বাদ নেই। আর তাদের অসুস্থ প্রতিযোগিতার বলি হচ্ছে কোমলপ্রাণ শিক্ষার্থীরা।এই প্রতিযোগিতায় কি সুস্থ, সুন্দর, স্বাভাবিক কোন জাতি তৈরি হতে পারে? আমরা এ প্রশ্ন কাকে করব? কোথায় করব?তারপরও আশায় বুক বাঁধতে চাই সুন্দর এক জাতি গঠনে সকলের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। জাতীয় উন্নয়নে তারা হবে আদর্শ সৈনিকের মতন।দেশ হব সম্মৃদ্ধ।

একজন শিক্ষার্থীকে সুশিক্ষিত করা মানে একটি পরিবারকে শক্তিশালী করা, একটি সমাজকে উন্নত করা এবং একটি দেশকে এগিয়ে নেওয়া।
আসুন আমরা সবাই অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করি।
বৈষম্যকে না বলি, নৈতিকতাকে শক্ত করি, শিক্ষাকে মানবিক করি।
কারণ সু-শিক্ষিত প্রজন্মই জাতীয় উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শক্তি।
এই হোক আমাদের অঙ্গীকার ও আহ্বান।

নাসরীন খান
স্বপ্ন নগর আবাসিক এলাকা ১
মিরপুর ৯
বিল্ডিং ৭,৬/ ই
পল্লবী,ঢাকা

সম্পর্কিত খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল খায়ের 

নির্বাহী সম্পাদক: 
বার্তা প্রধান:

অফিস: বাড়ি ০৭, সড়ক ১৪/সি, সেক্টর ৪,

উত্তরা, ঢাকা-১২৩০।

যোগাযোগ: ০১৭১৫৩৬৩০৭৯

বিজ্ঞাপন: ০১৮২৬৩৯৫৫৪৯

Email: khair.hrm@gmail.com

info@dainikprotibimbo.com

protibimboprokash.com

ফেসবুকে আমরা

©2025 Dainik Protibimbo – All Right Reserved. Designed and Developed by Bangla Webs