জাহাঙ্গীর বাবু’র কলাম, রাত জাগা মানুষেরা: নিরাপত্তার নীরব প্রহরী

by protibimbo
০ মন্তব্য বার পড়া হয়েছে

রাত জাগা মানুষেরা: নিরাপত্তার নীরব প্রহরী
জাহাঙ্গীর বাবু

রাত গভীর হলে শহর ঘুমিয়ে পড়ে। আলো নিভে যায় অফিস-আদালতে, থেমে যায় যন্ত্রের শব্দ, স্তব্ধ হয়ে আসে ব্যস্ততার কোলাহল। কিন্তু এই নিস্তব্ধতার আড়ালে জেগে থাকে কিছু মানুষ—নিরাপত্তা কর্মী। তাদের চোখের পাতা ভারী হয়, কিন্তু দায়িত্বের ভার তার থেকেও বেশি। তারা রাতের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকে হাজার কোটি টাকার সম্পদের পাহারায়, অথচ নিজেদের জীবনের আলোটা থাকে অনেকটাই ম্লান।
সম্প্রতি আমার অধীনে নতুন যোগ দেওয়া এক সিকিউরিটি সুপারভাইজারের সঙ্গে প্রথম দেখা। দেশের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে চার বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। স্বাভাবিক কথোপকথনের অংশ হিসেবে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা জানতে চাইলে সে বলল—এসএসসি পাশ। যখন তাকে জিজ্ঞেস করলাম “SSC-এর পূর্ণরূপ কী?”, সে একটু ভেবে উত্তর দিল—“সিনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট।” পাশে থাকা এক প্রবীণ সহকর্মী ঠিক করে দিলেন—“সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট।” চারপাশে কিছুটা হাসির রোল উঠল। সেই হাসির ভেতরেই স্পষ্ট হয়ে উঠল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতা—যেখানে সনদ আছে, কিন্তু জ্ঞান অনেক সময় অগভীর থেকে যায়।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৮-১০ লাখ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে নিরাপত্তা পেশার সঙ্গে যুক্ত। বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, গার্মেন্টস, নির্মাণ প্রকল্প—সব জায়গাতেই নিরাপত্তা কর্মীরা একটি অপরিহার্য অংশ। অথচ তাদের মাসিক বেতন গড়ে ৮,০০০ থেকে ১৬,০০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই অল্প আয়ে ৪-৬ জনের সংসার চালানো কতটা কঠিন—তা সহজেই অনুমেয়।
নিরাপত্তা কর্মীদের জীবন কেবল আর্থিক সংকটেই সীমাবদ্ধ নয়। তাদের উপর থাকে বিশাল দায়িত্ব। একটি বড় প্রকল্প, একটি শিল্পকারখানা কিংবা একটি গুদামের নিরাপত্তা—যেখানে কোটি কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে—সেটি রক্ষার দায়িত্ব তাদের কাঁধে। কোনো ভুল হলে দায়ভারও তাদেরই নিতে হয়। একদিকে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, অন্যদিকে নিরাপত্তা কোম্পানি, আর তৃতীয়দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—সব পক্ষের চাপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তারা অনেকটা অসহায়।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো বেতন প্রদানে অনিয়ম। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিয়োগ হওয়ায় ওয়ার্ক অর্ডার, বিল পাস, অনুমোদন—এসব জটিলতার কারণে প্রায়ই বেতন বিলম্বিত হয়। তখন নিরাপত্তা কর্মীদের মুখের দিকে তাকানো যায় না। তাদের অসহায়তা আমাদের লজ্জিত করে। অনেক সময় তারা বাধ্য হয়ে চাকরি ছেড়ে দেয়, কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী শেষ মাসের বেতনটুকুও আর পায় না।
এই পেশায় আরেকটি ঝুঁকিপূর্ণ দিক হলো নিয়োগ প্রক্রিয়া। কম বাজেটের কারণে অনেক কোম্পানি যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই লোক নিয়োগ করে। ফলে ভালো মানুষের সঙ্গে মিশে যায় কিছু অসৎ ব্যক্তি। এতে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঝুঁকি বাড়ে। আবার অনেকে এই কাজকে গুরুত্ব না দিয়ে দায়িত্বে অবহেলা করে—বিশেষ করে রাতের শিফটে। দিনের নিরাপত্তা কর্মীরা সবার নজরে থাকলেও, রাতের কর্মীরা অনেকটাই অদৃশ্য। আর সেখানেই তৈরি হয় বড় ঝুঁকি।
বাস্তবতা হলো—এই পেশার অধিকাংশ মানুষই অত্যন্ত বিশ্বস্ত। তাদের সততা আর দায়িত্ববোধের কারণেই বড় বড় প্রকল্প নিরাপদ থাকে। না হলে এত কম বেতনে, এত প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা বছরের পর বছর এই দায়িত্ব পালন করতে পারত না।
নিরাপত্তা খাতে একটি সুসংগঠিত নীতিমালা, ন্যায্য বেতন কাঠামো, প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা অত্যন্ত জরুরি। উন্নত দেশগুলোতে নিরাপত্তা কর্মীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ, বীমা সুবিধা এবং আইনগত সুরক্ষা থাকে। আমাদের দেশেও এই বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সবশেষে আবার ফিরে আসি সেই “SSC”-এর কথায়। শিক্ষার সনদ হয়তো তাদের সীমিত, কিন্তু দায়িত্ববোধ, সততা এবং পরিশ্রম—এই গুণগুলোতেই তারা অনেক শিক্ষিত মানুষের চেয়ে এগিয়ে। এই রাতজাগা মানুষগুলোর কারণেই আমাদের শিল্পকারখানা, অফিস, প্রকল্প—সবকিছু নিরাপদ থাকে।
তারা হয়তো আলোয় আসে না, খবরের শিরোনাম হয় না, কিন্তু তাদের নীরব উপস্থিতিই আমাদের নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় ভরসা।
লেখক:
প্রজেক্ট ম্যানেজার
সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং
এ সি আই লিমিটেড (কনজ্যুমার ব্র্যান্ড)

সম্পর্কিত খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল খায়ের 

নির্বাহী সম্পাদক: 
বার্তা প্রধান:

অফিস: বাড়ি ০৭, সড়ক ১৪/সি, সেক্টর ৪,

উত্তরা, ঢাকা-১২৩০।

যোগাযোগ: ০১৭১৫৩৬৩০৭৯

বিজ্ঞাপন: ০১৮২৬৩৯৫৫৪৯

Email: khair.hrm@gmail.com

info@dainikprotibimbo.com

protibimboprokash.com

ফেসবুকে আমরা

©2025 Dainik Protibimbo – All Right Reserved. Designed and Developed by Bangla Webs