নিষ্ঠুর বাস্তবতায় জীবন বৃত্তায়ন
আব্দুর রাজ্জাক রঞ্জু
শৈশব:
মানুষের যাত্রা শুরু হয় চরম অসহায়ত্ব দিয়ে। জন্মের পর সে এক নিঃস্ব সত্তা—নিজস্ব শক্তি নেই, নেই উপার্জনের ক্ষমতা। তার কান্নাই একমাত্র ভাষা, যা দিয়ে সে জাগতিক প্রয়োজন আর আবেগের জানান দেয়।
যৌবন:
সময় বহমান। শৈশবের সেই স্থবিরতা কাটিয়ে মানুষ একসময় ভরা যৌবনে উপনীত হয়। তখন সে যেন এক খরস্রোতা স্রোতস্বিনী—অদম্য গতি আর পূর্ণতায় টইটম্বুর। অর্থ, প্রতিপত্তি আর প্রভাবের নেশায় তখন রক্তে জাগে আদিম তেজ। এই তেজে কেউ পথ হারায়, কেউবা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে সাফল্যের চরম শিখরে আরোহণ করে।
বার্ধক্য ও নিষ্ঠুর বাস্তবতা:
কিন্তু জীবনের অমোঘ নিয়মে যৌবনের সেই জোয়ার একসময় থমকে যায়। ভাটার টানে মানুষ ফিরে যায় তার আদিম শূন্যতায়। শুরু হয় বার্ধক্য—যেখানে শক্তি ও সামর্থ্য ক্রমেই শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। পবিত্র কোরআনের সূরা ত্বীনে বর্ণিত সেই সত্যের মতোই মানুষ আবার শিশুর মতো অসহায় হয়ে পড়ে।
এই অসহায়ত্ব শৈশবের চেয়েও করুণ। কারণ শিশুর কান্নায় মমতা জাগে, কিন্তু বৃদ্ধের কান্নায় সমাজ আজ প্রায়শই ‘বিরক্তি’ খোঁজে। শিশুর নিঃসঙ্গতায় পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা সঙ্গ দেয় এই আনন্দ চিত্তে। কিন্তু বৃদ্ধকালের নিঃসঙ্গতা থাকে সঙ্গহীন। কেউ তাকে সঙ্গ দিতে চায় না।
যে মানুষটি নিজের রক্ত-জল করা পরিশ্রমে পুরো পরিবারকে একটি সুশোভিত বাগানের মতো সাজিয়েছিলেন, আজ সেই বাগানের ফুলের ঘ্রাণ নেওয়ার অধিকারটুকুও যেন তাঁর থাকে না। মালি আজ তাঁর নিজের বাগানেই এক অনাকাঙ্ক্ষিত আগাছা! পরিবার ও সমাজের চোখে তিনি তখন এক ‘বোঝা’ কিংবা অবহেলার ‘আপদ’। তাঁর স্থান হয় সাধারণত ঘরের এক নিভৃত কোণে অথবা দূর কোনো বৃদ্ধাশ্রমে।
শৈশব থেকে বার্ধক্যের এই যে ফিরে আসা—এই জীবন বৃত্তায়ন বড় বেশি নির্মম। যারা বার্ধক্যের এই অস্ফুট যাতনা স্পর্শ করার আগেই পৃথিবী ছেড়ে যান, তাঁরা হয়তো এক ধরণের মুক্তি পান। এ কারণেই স্রষ্টা মা-বাবার সেবার ওপর এত তাগিদ দিয়েছেন। আমাদের মনে রাখা উচিত, আজকের প্রবীণরাই আমাদের শেকড়; তাদের প্রতি সদয় হওয়াই মনুষ্যত্বের শ্রেষ্ঠ পরিচয়।
[সহ-অধ্যাপক মহাস্থান মাহীসওয়ার ডিগ্রি কলেজ বগুড়া ও সভাপতি পুণ্ড্র সাহিত্য সংসদ বগুড়া।

