দারুননাজাত তাখসীসি মাদরাসা: ইসলামী রেনেসাঁর আলোকবর্তিকা
সুবহে সাদিক শেষ হওয়ার পথে, নদীবন্দর শীতলক্ষ্যা তীরের মিলগুলো থেকে ক্রমাগত বের হওয়া ধোঁয়ার কুন্ডলি এখন হালকা হয়ে এসেছে। আকাশের চাঁদ-তারা দৃষ্টি গোচর হচ্ছে। সেই দীপ্যমান আকাশের নিচে একদল শিক্ষার্থী জায়নামাজে বসে প্রাণভরে সৃষ্টিকর্তাকে স্বরণ করছে! দোয়া করছে দেশ ও জাতির কল্যানে। বাদ ফজর একে একে বসছে তাদের মুখস্থ করা কুরআনের পুনরাবৃত্তি করতে। এরপর তারা এক রাশ সতেজতা নিয়ে শিখছে বাংলা-ইংরেজি ও গনিত। বাংলাদেশের যেসব ছেলেদের বুকে খাঁটি দেশপ্রেমিক ও যোগ্য আলেম হওয়ার সুপ্ত বাসনা আছে তাদেরকে সফলতার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছানোর মত দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকা ডেমরার “দারুননাজাত তাখসীসি মাদরাসা”। শিক্ষার্থীরা এখান থেকে পড়াশোনা শেষে পাড়ি দিচ্ছে বহিঃবিশ্বের বড় বড় ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে।
একবিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলাদেশের মাদরাসা শিক্ষা নানামুখী চ্যলেঞ্জে দিনপার করছে। এ থেকে উত্তোরণের জন্য বেশ কয়েকজন খাঁটি ও যোগ্য মানুষ নিরলস কাজ করছে। তাদের একজন আ. খ. ম আবু বকর সিদ্দিক। তিনিই তাখসীসি মাদরাসার মহা দিকপাল। এই সিপাহসালারের গভীর দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে, ঝিমিয়ে পরা মুসলিম বিশ্বের জ্ঞান গরিমা আজ নিভু নিভু । তাদের শান-শওকতের সাথে মিশে গেছে লোক দেখানোর মত আত্মঘাতী বিষয়। যেই দুনিয়াকে গুরুত্ব দিয়ে ধর্মীয় জ্ঞানকে হেয় করছে সেই দুনিয়ার দৌড়েও সবার পিছনে অভাগা মুসলিমরা। তিনি এর উত্তোরণের জন্য ওহীর জ্ঞানে গুরুত্ব দেন।কারণ শিকরের জ্ঞান তথা ওহীর জ্ঞান মজবুত হলেই শুদ্ধ মননে এমন দুর্নিবার শক্তি খোদা তায়ালা দিবেন, যার উপর ভর করে তাবৎ পৃথীবির দিকবিদিক ছোটা পথ হারা মানুষের পাশে দাড়ানোর যোগ্যতা তৈরী হবে।
উপমহাদেশে এই যোগ্য মুসলিম গড়ার কাজটা করে আসছিলো মাদ্রাসা শিক্ষাঙ্গন। তবে নিউ স্কিমের আলিয়া মাদ্রাসা এবং নামকাওয়াস্তে কওমি সনদের যাতাকলে শিক্ষার্থী দিকশূন্য হয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই ২০০৮ ঈসায়ী সালে দারুননাজাতের সিদ্দিকী কামিল মাদ্রাসার শাখা হিসেবে মাদরাসারই একটি রুমে সীমিত পরিসরে তাখসীসি নামে একটি যুগান্তকারী শিক্ষাপদ্ধতির শুভ সূচনা হয়। মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে বর্তমানে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ মাদরাসা। ২০২৪ সাল থেকে এটি স্বতন্ত্র নাম ধারণ করে বর্তমানে তার লক্ষ্যপানে এগিয়ে হাটি হাঁটি করে এগিয়ে চলছে। বিশাল এই মাদরাসায় চালু হয়েছে ইলমুল কুরআন বিভাগ (শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম), আলিয়া বিভাগ (দাখিল ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে থেকে আলিম) এবং কিতাব বিভাগ (আসাসিয়্যাহ, ই’দাদিয়্যাহ, মুতাওয়াসসিতাহ, স্থানাভিয়্যাহ, দাওরা হাদিস, ইফতা ও উলুমুল হাদিস)। বর্তমানে এর শিক্ষার্থী সংখ্যা দুই হাজার ছুঁই ছুঁই। যার মধ্যে ৯০% পবিত্র কুরআনের হাফেজ।
তাকওয়া-তায়াক্কুল এবং হুব্বে রাসূল (সা.) কে সামনে রেখে একজন যোগ্য যুগের হাদী তৈরির কারখানা এ মাদরাসা। মাদরাসার প্রিন্সিপালের স্বপ্ন এই মাদরাসা একদিন স্বপ্নের চেয়েও বড় হবে। তার জন্য শক্ত হাল তিনি ধরে আছেন। তার ভাবনায় এই প্রতিষ্ঠান একদিন বাগদাদের ‘বায়তুল হিকমা’, কায়রোর আল-আজহার, কর্ডোভার মাদরাসাগুলোর মত আলো ছড়াবে । উপমহাদেশের মুসলিমরা বিংশ শতাব্দীতে ঔপনিবেশিকের কাছে বৈষম্যের শিকার হয়ে ইলম থেকে ছিটকে পড়েছে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে তাদের ইলম-আমল, আদব-আখলাক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এ সমস্ত ঘাটতি গুলোকে পিছনে ফেলে জাগতিক বিষয়ে পারদর্শী এবং মুহাক্কিক আলিম হিসেবে গড়ে তোলার জন্য নিরলস কাজ করছে তাখসীসি।
বাংলাদেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতার প্রতি গুরুত্ব এবং ফরজ নামায আদায়ের পাশাপাশি সুন্নাত ও নফল আমলে অভ্যস্ত করা হচ্ছে। সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের জন্য হচ্ছে সাপ্তাহিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান , বিতর্ক, নাহু-সরফ এবং শব্দার্থ মুখস্থ করণ প্রতিযোগিতা। আলিম পরীক্ষার পর এখান থেকেই কামিল বা অনার্স-মাস্টার্স করতে পারছে। তাছাড়া দাওরা হাদীস, ইফতা ও তাখাসসুস ফি উলুমিল হাদীস পড়ার মাধ্যমে যোগ্য আলেম হওয়ার সব ব্যবস্থা আছে।
আজকাল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী হলেও মূল আরবী কিতাব মাদরাসার অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা পড়ে না। কিন্তু এখানে সেই আরবি মূল কিতাবগুলো তথা মিশকাত শরীফ, নূরুল আনওয়ার, শরহে বেকায়া, কূদুরি ইত্যাদি মূলআরবি কিতাব পড়ানো হয়।
তাখসীসি মূলত একটি আবাসিক প্রতিষ্ঠান। সার্বক্ষণিক তদারকিতে সদা নিয়োজিত আছেন মেধাবি ও দক্ষ, আমলি ও আখলাকি প্রায় সত্তর জন উস্তাজ। এখানে শিক্ষার্থীদের সবসময় দেখবাল করা হয়। উস্তাজগণ শিক্ষার্থীদের মাঝে সারা বছর বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। এর মাধ্যমে নিজেদের পড়াগুলো আরো শানিত করার সুযোগ পায় তারা। বিশেষত আরবি ব্যাকরণের জটিল বিষয়াবলি শিখে তারা সহিহ ও সাবলীলভাবে কুরআন-হাদিসের বাণী মানুষের মাঝে পৌছিয়ে দেয়। বর্তমানে দুই হাজার শিক্ষার্থী দারুননাজাত তাখসীসি মাদরাসায় তাদের জ্ঞান পিপাসা মিটাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা যোগ্য হয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আল আজহার, উম্মুল কুরা এবং মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এমনকি দেশের বহু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও তাখসীসির শিক্ষার্থীরা সুনাম ও সফলতার সাথে মেধার স্বাক্ষর রাখছে। বাংলাদেশে হাফেজ মাদরাসা গুলোর দুঃখ হলো, তাদের শিক্ষার্থীরা কুরআন মুখস্থ ভুলে যায়। তাই মুখস্থ ধরে রাখার জন্য প্রতিদিন সকালে এক ঘন্টা তেলওয়াত এবং অভিজ্ঞ কারী দ্বারা তেলওয়াতের মাধুর্য বাড়ানো প্রয়াস চলছে।
মাদরাসার অধ্যক্ষ ছাত্র এবং শিক্ষকের আন্তরিকতার উপর জোর দেন। তিনি বলেন ” ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক চিরকালের”। শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা এ প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি নিয়ম-নীতিকে মনে-প্রাণে ভালোবাসে। তারা নিজেদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে প্রতিষ্ঠানের নিয়ম-নীতি মানতে চেষ্টা করেন। মাদরাসায় মাগরিবের পর জিকির, আওয়াবিন, এশার পর দরূদ ফজরের পর তেলওয়াত ও এশরাক নামাজ স্বতস্ফূর্তভাবে আদায় করে। তারা এমন এক পরিবেশে বড় হচ্ছে যেখানকার সবকিছুই ইসলামের সোনালী যুগের আদলে গড়া। তারাই করবে আগামীর ইসলামি রেনেসাঁ। এমনটাই মনে করছে হাল আমলের সমস্ত ইসলামিক পন্ডিতগণ।
আবু জাফর
শিক্ষক, বাংলা বিভাগ
দারুননাজাত তাখসীসি মাদরসা
সারুলিয়া, ডেমরা, ঢাকা
মোবাইল, ০১৩০২০০৪৫৯৪
ইমেইল, abujafor4850@gmail.com

