২৫ ডিসেম্বর ও আগামীর রাজনীতি: তারেক রহমানকে ঘিরে জনমানুষের প্রত্যাশা: মতামত। রিপন চন্দ্র ভৌমিক

by protibimbo
০ মন্তব্য ৪২৫ বার পড়া হয়েছে

২৫ ডিসেম্বর আগামীর রাজনীতি: তারেক রহমানকে ঘিরে জনমানুষের প্রত্যাশা
রিপন চন্দ্র ভৌমিক

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু কিছু মুহূর্ত থাকে, যা কেবল একটি ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না—বরং তা হয়ে ওঠে একটি সময়ের প্রতীক ও পরিবর্তনের সূচনাবিন্দু। তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মুহূর্তের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। দীর্ঘ ১৭ বছর প্রবাস জীবন শেষে ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার দেশে ফেরা নয়; এটি গণতন্ত্রকামী মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি ঘটনা।

তারেক রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকা পরিণত হতে পারে এক বিশাল জনসমুদ্রে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শুরু করে নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে লাখো মানুষের উপস্থিতি প্রত্যাশিত। শুধু ঢাকাই নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও মানুষ ছুটে আসবে প্রিয় নেতাকে এক নজর দেখার জন্য। এই বিপুল জনস্রোত রাজনৈতিকভাবে একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে—দীর্ঘ অনুপস্থিতির পরও তারেক রহমান এখনও দেশের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক এবং একটি বড় অংশের জনগণের কাছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন।

এই জনসমাগম কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা রাজনৈতিক অসন্তোষ, ভোটাধিকার এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির দাবির প্রতিফলন হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এমন মুহূর্ত অনেক সময় নতুন করে রাজনৈতিক সক্রিয়তা ও সংগঠনের অনুপ্রেরণা জোগায়, যা দেশের রাজনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করতে সক্ষম।

Banner

বর্তমান বাংলাদেশ একাধিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। রাজনৈতিকভাবে রয়েছে গভীর মেরুকরণ, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির ঘাটতি। নির্বাচনব্যবস্থা, সংসদের কার্যকারিতা এবং বিরোধী রাজনীতির ভূমিকা—সবকিছুই জনআলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি সরকার ও বিরোধী—উভয় পক্ষের জন্যই বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, দুর্নীতি দমন ও সুশাসনের প্রশ্ন।

এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন নতুন করে নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রগঠনের আলোচনা সামনে এনেছে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দলীয় পুনর্গঠন, নীতিনির্ধারণ এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে কথা বলে আসছেন। কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন—এসব বিষয় তার রাজনৈতিক বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

বিশেষভাবে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, প্রবাসী আয়কে টেকসইভাবে কাজে লাগানো এবং শিল্প ও কৃষিখাতের ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন—এসব বিষয় ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সুসংহত নীতি, দক্ষ প্রশাসন এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।

এই প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক গভীর মানবিক অধ্যায়ও। অসুস্থ মা, তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পাশে দাঁড়াতে দীর্ঘদিন পর তারেক রহমানের দেশে ফেরা রাজনীতির কঠোরতার বাইরে গিয়ে সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধের এক শক্তিশালী বার্তা দেয়। অনেকের দৃষ্টিতে, এটি রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ত্যাগ, সংগ্রাম এবং ব্যক্তিগত বেদনার দীর্ঘ ইতিহাসকেও সামনে নিয়ে আসে।

আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দেশব্যাপী রাজনৈতিক কার্যক্রম বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তাকে জনগণের বাস্তব সমস্যা, চাহিদা ও প্রত্যাশা ঘনিষ্ঠভাবে অনুধাবনের সুযোগ করে দিতে পারে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ও নতুন ভোটারদের কর্মসংস্থান, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে পারলে তার রাজনৈতিক ভূমিকা নতুন মাত্রা পেতে পারে।

তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন তাই কেবল অতীতের সঙ্গে সংযোগ নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্যও একটি বড় পরীক্ষা। তিনি কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি চর্চা করতে পারেন, রাজনৈতিক সহনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারেন এবং জাতীয় ঐকমত্যের পথে অগ্রসর হতে পারেন—সেটিই নির্ধারণ করবে এই প্রত্যাবর্তনের বাস্তব ফলাফল।

অনেকে মনে করেন, ভবিষ্যতে দেশের কান্ডারি হিসেবে তিনি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও গ্রহণযোগ্য ও সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারেন। আবার সমালোচকদের মতে, সেই পথ সহজ নয় এবং এর জন্য প্রয়োজন হবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আচরণে বাস্তব পরিবর্তন।

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন এবং সম্ভাব্য দেশব্যাপী রাজনৈতিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো তার নিরাপত্তা। মতভেদ যাই থাকুক না কেন, একজন রাজনৈতিক নেতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। বর্তমান সরকারের ওপর এই দায়িত্ব আরও বেশি গুরুত্ব বহন করে, কারণ নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ ছাড়া অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র সম্ভব নয়।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে কেবল একজন ব্যক্তিকে রক্ষা করা নয়; এটি রাজনৈতিক সহনশীলতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতি রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। এই জায়গায় রাষ্ট্রের ভূমিকা ভবিষ্যৎ রাজনীতির বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

২৫ ডিসেম্বর ২০২৫—এই দিনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে। সেদিন কেবল বিমানবন্দর নয়, পুরো দেশ যেন পরিণত হবে প্রত্যাশা, প্রশ্ন ও সম্ভাবনার এক মিলনস্থলে। বাংলার মানুষ দেখতে চাইবে—এই প্রত্যাবর্তন কি কেবল আবেগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এটি সত্যিই গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সুশাসনের পথে নতুন দিশা দেখাবে।

ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির আগমনে নয়, বরং তার নীতি, কর্মপন্থা এবং বাস্তব প্রভাবেই রায় দেয়। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সেই ঐতিহাসিক বিচারেরই এক নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে—যেখানে তরুণ প্রজন্ম ও নতুন ভোটারদের আশা-আকাঙ্ক্ষার পথিক হয়ে ওঠাই হবে সবচেয়ে বড় সাফল্যের মানদণ্ড।

কলাম লেখক
রিপন চন্দ্র ভৌমিক
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
📧 ripon.lawyers@gmail.com

সম্পর্কিত খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল খায়ের 

নির্বাহী সম্পাদক: 
বার্তা প্রধান:

অফিস: বাড়ি ০৭, সড়ক ১৪/সি, সেক্টর ৪,

উত্তরা, ঢাকা-১২৩০।

যোগাযোগ: ০১৭১৫৩৬৩০৭৯

বিজ্ঞাপন: ০১৮২৬৩৯৫৫৪৯

Email: khair.hrm@gmail.com

info@dainikprotibimbo.com

protibimboprokash.com

ফেসবুকে আমরা

©2025 Dainik Protibimbo – All Right Reserved. Designed and Developed by Bangla Webs