“কবিকে কেউ সৃষ্টি করতে পারে না, কবিরা নিজে নিজে সৃষ্টি হয়।”
জাতীয় কবিতা পরিষদের নিয়মিত কবিতাপাঠ ও আলোচনা অনুষ্ঠানের ৫৩তম আয়োজনে ৪ঠা নভেম্বর, মঙ্গলবার, বিকাল ৫ টায়, ২৬ ইস্কাটন গার্ডেন রোডের ‘কাজল মিলনায়তন’-এ একথা বলেন কবি মাহমুদ শফিক।
অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করেন জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান। ”কবিতা: ভিতরে বাইরে” বিষয়ে আলোচনা করেন কবি, গবেষক ও সাংবাদিক মাহমুদ শফিক। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিতি ছিলেন সত্তর দশকের বিশিষ্ট কবি জাতীয় কবিতা পরিষদের উপদেষ্টা সদস্য কবি মতিন বৈরাগী।
কবি মতিন বৈরাগী বলেন, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হানের যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্বে জাতীয় কবিতা পরিষদ এগিয়ে যাচ্ছে দুর্বার গতিতে। ইতোমধ্যে জাতীয় কবিতা পরিষদ খুব ভালো ভালো কাজ করেছে এবং নিয়মিত সাপ্তাহিক কবিতাপাঠ ও আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করছেন-যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। আজকের আলোচক কবি, গবেষক ও সাংবাদিক মাহমুদ শফিকের সাথে মোহন রায়হানের গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল সেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তারা দুজন খুব ভালো বন্ধু। আজকের আলোচনা বিষয় “কবিতা : ভিতরে বাইরে” যা খুবই সুন্দর একটা বিষয়। যা আমার খুব ভালো লেগেছে।”
কবি, লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক মাহমুদ শফিক তাঁর আলোচনায় বলেন, আজকের জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি, আমার প্রিয় বন্ধু, আন্দোলনের তুখোড় নেতা কবি মোহন রায়হান এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সম্মুখ সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আমিও তখন সাংবাদিকদের সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছি। এরশাদ পতন ও আওয়ামী লীগ পতন এটা একটা রাজনীতির অপরিহার্য ফল। এটা কেউ ইচ্ছা করে করেনি। তবে, রাজনৈতিক আলোচনা করা আমার উদ্দেশ্য নয়, আজকের উদ্দেশ্য কবিতা নিয়ে আলোচনা। কবিতা কি? আমরা যত মানুষ কবিতা লিখি তত মানুষ ততভাবে চিন্তা করি এবং বৈচিত্রপূর্ণ চিন্তার অভিধাই হচ্ছে কবিতা। মানুষের এমন ক্ষমতা রয়েছে সেই ক্ষমতা পৃথিবীর আর কোনো প্রাণীর নেই। আমরা চৈতন্যের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর সাথে মহাবিশ্বকে সংযুক্ত করতে পারি। কবিতা বাইরের কোনো চাপে সৃষ্টি হয় না, কবিরা সৃষ্টি করেন। এজন্য কবিরা শ্রষ্টা। দুর্ভাগা যেমন প্রকৃতির জন্য প্রয়োজন তেমন দুর্বল কবিতা, নগন্য কবিতা নগন্য ইতিহাস লেখার জন্য, কবিতার ইতিহাসের জন্য এবং সেরা ইতিহাস লেখার জন্য প্রয়োজন। এখানে যারা উপস্থিত হয়েছেন তারা সবাই আমার মতে কবি এবং তাদের সবার আন্তরিকতার পরশ আছে বলেই এমন একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা সম্ভব হয়েছে। বিশিষ্ট থেকে তরুণ কবি আপনারা যারা এখানের উপস্থিত হয়েছেন তারা সবাই সমাজ পরিবর্তনের জন্য সমাজের বিভিন্ন দিক নিয়ে কবিতা লিখছেন। আপনারাই সমাজের আলোকবর্তিকা। আপনাদের দিক নির্দেশনায় সমাজ এগিয়ে যাবে। এভাবে সমাজ থেকে দেশ আর দেশ থেকে রাষ্ট্রযন্ত্র সবকিছুই একদিন সঠিক পথে পরিচালিত হবে। পৃথিবী একটা আশ্চর্য জয়গা। আমরা আমাদের চিন্তা-চেতনায় ও মননে মহাবিশ্বকে ধারণ করতে পারি বা যুক্ত করতে পারি কিন্তু ক্ষুদ্র পৃথিবীর লোভ-লালসাকে দমন করতে পারি না। অন্যদিকে কবিরা এতটা আত্মঘাতি, এতটা পরপ্রেমী যে নিজেকেও চিহ্নিত করে দিতে পারে এবং সমস্ত পৃথিবীকে অবজ্ঞা করে নিজেও নিঃশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। এমনকি খুনির সাথেও কোলাকুলি করতে পারে। কবিকে কেউ সৃষ্টি করতে পারে না, কবিরা নিজে নিজে সৃষ্টি হয়।”
সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান বলেন, আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত যে আজকের কবিতাপাঠ ও আলোচনা অনুষ্ঠানে আমার অত্যন্ত প্রিয় কবি, অনেক স্মৃতি বিজড়িত মানুষ, বাংলাদেশের প্রথিতযথা কবি, লেখক গবেষক ও সাংবাদিক মাহমুদ শফিককে উপস্থিত করতে পেরেছি। তিনি অত্যন্ত সৎ, দেশ প্রেমিক, সাহসী ও একনিষ্ঠ মানুষ। আমি তাকে যখন থেকে চিনি, তিনি কবিতায় যেমন সৎ ছিলেন তেমন জীবন-যাপনেও সৎ ছিলেন। স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও আলোচিত ম্যাগাজিন ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’র চীফ রিপোর্টার ছিলেন। তিনি কোনো শাসক-শোষকের রক্তচক্ষুকে ভয় করেন নাই। শাসক-শোষকদের চোখে চোখ রেখে কথা বলেছেন। সেজন্য তিনি অনেক নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছেন। যারা তার কবিতা পড়েছেন তারা জানেন কী অসাধারণ রূপমায়তা তার কবিতায়! তার কবিতার উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও শব্দচয়ন এক কথায় অসাধারণ। শুধু বাংলাসাহিত্যে নয় বিশ্বসাহিত্যেও তার অগাধ পাণ্ডিত্য রয়েছে।”
আলোচনা শেষে কবি মতিন, বৈরাগী, কবি মাহমুদ শফিক, কবি মোহন রায়হান, কবি এবিএম সোহেল রশিদ, কবি নূরুন্নবী সোহেল, কবি আসাদ কাজল, কবি ক্যামেলিয়া আহমেদ, কবি ইউসুফ রেজা, কবি মনিরুজ্জামান রোহান, কবি শিমুল পারভীন, কবি নিপু মল্লিক, কবি জামিল জাহাঙ্গীর, কবি কৌমুদী নার্গিস, কবি টিমুনী খান রীনো, কবি তাসকিনা ইয়াসমিন, কবি গাজী আব্দুল আলীম, কবি এস. এস. রুশদী, কবি কাব্য রাসেল, কবি মিঠু কবির, কবি রাসেল আহম্মেদ, কবি নীপা চৌধুরী, কবি আতিকুজ্জামান খান, কবি হানিফ রাশেদীন, কবি শরীফ খান দীপ, কবি প্রভাবতী চক্রবর্তীসহ পঞ্চশাধিক কবি স্বরচিত কবিতাপাঠ করেন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন কবি মনিরুজ্জামান রোহান, কবি কব্য রাসেল ও কবি তাসকিনা ইয়াসমিন।
____________________
মনিরুজ্জামান রোহান
প্রচার সম্পাদক
জাতীয় কবিতা পরিষদ
