পরিত্যক্ত শৈশব থেকে জনমানুষের আস্থার প্রতীক: সেনবাগের ছালেহা বেগমের মানবসেবার অজানা গল্প
নোয়াখালীর সেনবাগ পৌরসভার বাবুপুর গ্রামে দীর্ঘদিন ধরেই একটি নাম মানুষের মুখে মুখে—ছালেহা বেগম। বঞ্চনার জন্ম, অভাবের বেড়ে ওঠা আর শিক্ষাজীবনের বাধাগুলো তাকে থামাতে পারেনি। বরং ঠিক সেই জায়গা থেকেই শুরু হয়েছে জনমানুষের আস্থাভাজন হয়ে ওঠার গল্প। অনুসন্ধানে জানা যায়, মানুষের সেবাকে পেশা নয়, বরং দায়িত্ব মনে করেই এগিয়ে গেছেন এই নারী। জন্মের আগেই বাবাহারা, পৈতৃক সম্পত্তি থেকেও বঞ্চিত স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ছালেহা বেগম জন্মের আগেই হারান তার বাবা। বাবা-হারা সন্তানের প্রতি পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি সে সময় ছিল আরও কঠিন। পৈতৃক সম্পত্তির ন্যূনতম অংশটুকুও তার ভাগ্যে জোটেনি। ফলে বেড়ে উঠতে হয়েছে নানাবাড়ির আশ্রয়ে। তবে বিষয়টি অভাব–বঞ্চনা না হয়ে ওঠে দৃঢ়তার পাঠ।
নানাবাড়ি ও মা জাহানারা বেগমের সংগ্রামই পরবর্তী জীবনে তাকে মানবসেবার পথে ঠেলে দেয়। মায়ের খামার, মেয়ের স্বপ্ন—সংগ্রাম ছিল প্রতিটি ধাপে অনুসন্ধানে উঠে আসে আরেকটি তথ্য—মা জাহানারা বেগম একাই চালাতেন জীবিকার লড়াই। নিজের হাতে গড়ে তোলা ছোট খামার—মোটে দুটি বাছুর, চারটি ছাগল, দশটি হাঁস ও দশটি মুরগি—এতেই চলত পুরো সংসার এবং মেয়ের পড়াশোনার খরচ। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অর্থাভাবে পড়াশোনা বহুবার বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলেও ছালেহা বেগম হাল ছাড়েননি। কষ্টের মাঝেও ১৯৯৭ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ভাল ফল করেই এসএসসি পাস করেন। উচ্চশিক্ষা থেমে গেলেও মানুষের সেবার পথ খুলে যায় গভীরতর অনুসন্ধানে জানা যায়—অর্থাভাবই বাধা হয়ে দাঁড়ায় তার উচ্চশিক্ষার সামনে। কিন্তু এখানেই গল্প মোড় নেয়। অনেকেই যেখানে হতাশ হন, সেখানে ছালেহা বেছে নেন অন্য পথ—মানুষকে সেবা করার পথ। LMAF ও DMA কোর্স সম্পন্ন করে শুরু করেন গ্রামে গ্রামে চিকিৎসা–সহায়তা প্রদান। এলাকার লোকজনের বক্তব্য অনুযায়ী— “রাত হোক বা ভোর, ডাক দিলেই ছুটে যেতেন ছালেহা। অসুখ-বিসুখে আগে ডাকতাম লোক ডাক্তার, এখন ডাকি ছালেহাকে।” স্থানীয় গর্ভবতী নারীদের জন্য তার সেবা ছিল বিশেষ ভরসা। নরমাল ডেলিভারিতে তার অভিজ্ঞতা ও দায়িত্বশীলতা ইতোমধ্যে বহু পরিবারকে ঝুঁকিমুক্ত করেছে। বিয়ে—আরও এক ধাপ শক্ত ভিত্তি ২০১০ সালের ১৯ মে মো. ফখর উদ্দিনকে বিয়ে করার পর পরিস্থিতি আরও বদলায়। স্বামীর সহযোগিতা ছালেহার কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করে দেয়। তদন্তে জানা যায়, সেবামূলক কর্মকাণ্ডে তার স্বামীর সহযোগিতা ছিল দৃশ্যমান। প্রচারণা ছাড়াই কাউন্সিলর—অস্বাভাবিক কিন্তু সত্যি বিয়ের মাত্র সাত মাস পর ছালেহা বেগম সেনবাগ পৌরসভা নির্বাচনে মহিলা কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
আশ্চর্যের বিষয়—তিনি কোনো প্রচারণাই করেননি। স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, “প্রচারণা লাগেনি। কাজই ছিল তার প্রচারণা।” ফলাফল—সরাসরি জয়। দায়িত্ব পাওয়ার পর সামাজিক সুরক্ষা ভাতার তালিকা হালনাগাদ ও সঠিক প্রাপকদের নিশ্চিতে তিনি কাজ করেন সরেজমিনে ঘুরে ঘুরে। বয়স্কভাতা, বিধবাভাতা, প্রতিবন্ধীভাতা ও মাতৃত্বভাতা—সব ক্ষেত্রেই তিনি অনিয়ম রোধে কঠোর ছিলেন। মানুষের আস্থা—যা অর্থ দিয়ে কেনা যায় না তদন্তে পাওয়া তথ্যগুলো বলছে—মানুষের প্রতি আন্তরিকতা, সহজলভ্যতা এবং রাত–দিন সেবা দিতে প্রস্তুত থাকার কারণেই তিনি এলাকায় আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তার নিজের ভাষায়— “মানুষই আমার শক্তি। তাদের ভালোবাসার চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছু নেই।” শেষ কথা নয়—এ শুধু পথচলার শুরু অনুসন্ধানের শেষাংশে পাওয়া যায় ছালেহা বেগমের ভবিষ্যৎ ভাবনা— সমাজের প্রতিটি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। মানবসেবাকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ধরে রাখা। তার জীবনকথা শুধু সংগ্রামের নয়; এটি এমন এক নারীর গল্প, যিনি নিজের কষ্ট ভুলে মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে দায়িত্ব নয়—অভ্যাসে পরিণত করেছেন।
