জিনাত মলি’র কলাম। রাগ: এক মুহূর্তের আগুন, আজীবনের ক্ষয় —

by protibimbo
০ মন্তব্য ১৮৬ বার পড়া হয়েছে

জিনাত মলি’র কলাম। রাগ: এক মুহূর্তের আগুন, আজীবনের ক্ষয় — মন, সমাজ ও অর্থনীতির নীরব হত্যাকারী
জিনাত মলি

রাগ মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি, কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন রাগ হয়ে ওঠে ধ্বংসের কারণ। এতে ভেঙে যায় পরিবার, ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজ, ভেঙে পড়ে মননের ভারসাম্য।
ডাক্তার, মনোবিজ্ঞানী এবং ধর্ম—সবাই একবাক্যে বলেন, “রাগ নিয়ন্ত্রণই মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার মূল চাবিকাঠি।”
রাগ কী ও কেন হয়
রাগ কোনো অপরাধ নয়; এটি মানুষের স্বাভাবিক মানসিক প্রতিক্রিয়া।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, রাগ (Anger) হলো এক ধরনের ইমোশনাল রেসপন্স—যখন কেউ অবিচার, অবমূল্যায়ন বা অপমানের মুখোমুখি হয়, তখন শরীরে অ্যাড্রেনালিন হরমোন বেড়ে যায়।
ফলে রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন, এবং মানসিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়।
রাগ কখনো আত্মরক্ষার প্রতিক্রিয়া, আবার কখনো আত্মবিধ্বংসের কারণও হতে পারে।
সমাজ ও পরিবারে রাগের প্রভাব
“এক মুহূর্তের রাগ—আজীবনের আফসোস।”
একটি তর্কে ভেঙে যেতে পারে দাম্পত্য সম্পর্ক, পরিবারে ছড়িয়ে পড়ে মানসিক দূরত্ব, সন্তান হয় অনিরাপদ ও ভীত।
অফিসে বা সমাজে, রাগী আচরণ একজন মানুষকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে।
অনেকে রাগের মাথায় নোংরা ভাষা ব্যবহার করে, এমনকি অন্যের গায়ে হাতও তোলে—পরে ‘সরি’ বলে নেয়। কিন্তু সত্যিই কি শুধু ‘সরি’ বললে সব ঠিক হয়ে যায়?
না, কারণ রাগের আঘাতে ক্ষত হয় হৃদয়ে, যা ক্ষমা পেলেও ভুলে যাওয়া যায় না।
“রাগ করলে মন ভালো হয়”—এ ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
রাগ সাময়িক স্বস্তি দিলেও পরে সৃষ্টি করে অপরাধবোধ, অনুশোচনা ও মানসিক চাপ।
চিকিৎসা ও মনোবিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে রাগ
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা রাগ মানসিক চাপ ও শারীরিক অসুস্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অতিরিক্ত রাগে কর্টিসল হরমোন বেড়ে যায়, যা তৈরি করে নানা জটিলতা—
উচ্চ রক্তচাপ
হৃদরোগ
ঘুমের সমস্যা
মাইগ্রেন
হজমের সমস্যা
যাদের রাগ অতিরিক্ত বা অনিয়ন্ত্রিত, তারা অবশ্যই মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সেলরের শরণাপন্ন হতে পারেন।
বর্তমানে “Anger Management Therapy” নামক চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণ বহু দেশে অত্যন্ত কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে রাগ
রাগকে সব ধর্মেই আত্মবিধ্বংসী বলা হয়েছে।
ইসলাম:
রাসুল (সা.) বলেছেন —
“শক্তিশালী সেই ব্যক্তি নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে হারায়; বরং শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।”
(সহিহ বুখারি)
বৌদ্ধধর্ম:
রাগকে মানুষের তিনটি বিষের একটি বলা হয়েছে—যা আত্মশুদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে।
হিন্দুধর্ম:
“রাগ থেকে জন্ম নেয় অজ্ঞানতা, আর অজ্ঞানতা ধ্বংস ডেকে আনে।”
অর্থাৎ, ধর্মের দৃষ্টিতেও রাগ নিয়ন্ত্রণ করা নৈতিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধির একটি অপরিহার্য অংশ।
রাগ নিয়ন্ত্রণের কার্যকর উপায়:
– চুপ থাকা ও নিজেকে সময় দেওয়া
রাগের সময় নীরব থাকুন। কোনো প্রতিক্রিয়া বা সিদ্ধান্ত দেবেন না।
– গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস নিন
শ্বাস ধীরে টেনে নিয়ে ছাড়ুন—এটি শরীর ও মনকে শান্ত করে।
– পানি পান করুন ও স্থান পরিবর্তন করুন
শরীরের প্রশান্তি রাগ কমাতে সাহায্য করে।
– ধ্যান, নামাজ বা প্রার্থনায় মন দিন
আত্মিক শান্তি রাগের আগুন নেভায়।
– আলোচনা করুন, ঝগড়া নয়
সম্পর্ক রক্ষায় কথোপকথনই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
– মনোবিজ্ঞানীর সহায়তা নিন
যদি রাগ নিজের নিয়ন্ত্রণে না থাকে, পেশাদার সাহায্য নিন।
রাগের অর্থনৈতিক ক্ষতি ও প্রভাব
রাগ শুধু মন বা সমাজ নয়—এটি অর্থনীতিকেও নিঃশেষ করে।
অদৃশ্যভাবে এটি উৎপাদন, সম্পর্ক ও জীবিকার ক্ষয় ঘটায়।
কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতার ক্ষতি:
রাগী আচরণ টিমওয়ার্ক নষ্ট করে, সিদ্ধান্তে ভুল আনে, ফলে কর্মদক্ষতা ও প্রতিষ্ঠানের মুনাফা কমে।
চাকরি হারানো ও কর্মী বদল:
এক মুহূর্তের রাগে চাকরি হারানো বা সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়া মানে নতুন নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও প্রশাসনিক ব্যয়ের চাপ বৃদ্ধি।
চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি:
রাগ-জনিত মানসিক চাপ ও অসুস্থতা বাড়ায় চিকিৎসা ব্যয় ও কর্মঘণ্টার অপচয়—যা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অর্থনীতির জন্য বড় বোঝা।
পারিবারিক অর্থনীতির ভাঙন:
রাগের কারণে দাম্পত্য কলহ, বিবাহবিচ্ছেদ বা আইনি লড়াইয়ের ফলে পরিবারে আর্থিক ক্ষতি ও মানসিক ভাঙন ঘটে।
সমাজ ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভার:
রাগ-জনিত সহিংসতা, ভাঙচুর, বা অপরাধ রাষ্ট্রের আইনব্যবস্থা, চিকিৎসা, ও সামাজিক নিরাপত্তায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে, যা জাতীয় অর্থনীতিকে দুর্বল করে তোলে।
রাগ নিয়ন্ত্রণের সুফল:
* মানসিক প্রশান্তি ও স্থিরতা আসে
* পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হয়
* সম্পর্কের প্রতি সম্মান বাড়ে
* আত্মসম্মান ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায়
* কর্মক্ষেত্রে উন্নতি ঘটে
* শরীর ও মন—দুটোই সুস্থ থাকে।
রাগ কোনো অপরাধ নয়, কিন্তু রাগের সময় সংযমই মানুষের প্রকৃত শক্তি।
ভালো মানুষ রাগী হয়—এই প্রচলিত ধারণা একেবারেই ভুল।
ভালো মানুষ সেই, যে রাগের মুহূর্তেও বিবেক, ভদ্রতা ও মানবিকতা হারায় না।
একটু ধৈর্য, একটু নীরবতা—এই দুই-ই পারে সম্পর্ক, পরিবার ও সমাজকে রক্ষা করতে।
তাই এখন সময় এসেছে স্কুলের পাঠ্যক্রমে “রাগ নিয়ন্ত্রণ ও আবেগ ব্যবস্থাপনা” বিষয়টি যুক্ত করার—
যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শেখে: রাগ নয়, সংযমই শক্তি।

সম্পর্কিত খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল খায়ের 

নির্বাহী সম্পাদক: 
বার্তা প্রধান:

অফিস: বাড়ি ০৭, সড়ক ১৪/সি, সেক্টর ৪,

উত্তরা, ঢাকা-১২৩০।

যোগাযোগ: ০১৭১৫৩৬৩০৭৯

বিজ্ঞাপন: ০১৮২৬৩৯৫৫৪৯

Email: khair.hrm@gmail.com

info@dainikprotibimbo.com

protibimboprokash.com

Facebook

©2025 Dainik Protibimbo – All Right Reserved. Designed and Developed by Bangla Webs