২২ লাখ কোটি টাকা ঋণের দায় নিয়ে নতুন অধ্যায়

by protibimbo
০ মন্তব্য ৩০ বার পড়া হয়েছে

প্রায় ২২ লাখ কোটি টাকার সরকারি ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে যাত্রা শুরু হলো নতুন সরকারের। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা তিন লাখ কোটি টাকা। গত দেড় বছরে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদের শপথ নেওয়ার পর বিশাল অঙ্কের ঋণের দায়ভার সরকারের ওপর চলে এসেছে। বিপুল অঙ্কের মধ্যে অভ্যন্তরীণ (ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র ও কর্মচারীদের ফান্ড) ঋণ প্রায় ১২ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ৯ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা।

তবে ঋণের হিসাবটি খসড়া। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঋণ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য এ ঋণের অঙ্ক বের করা হয়েছে। প্রকৃত ঋণের অঙ্ক কমবেশি হতে পারে। নতুন সরকার কত ঋণ নিয়ে যাত্রা শুরু করছে তার প্রকৃত হিসাবের কাজ শুরু করেছে অর্থ বিভাগ। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক, ইআরডিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে ঋণ তথ্য চেয়েছে অর্থ বিভাগ থেকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। ফলে বড় অঙ্কের ঋণের অর্থনীতিতে কঠিন চাপ সৃষ্টি করছে। কারণ ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধে বছরে ব্যয় হচ্ছে সোয়া লাখ কোটি টাকার ওপরে।

নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য রেখে যাওয়া উত্তরাধিকারী নোটে সদ্য বিদায়ি অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ঋণ প্রসঙ্গে কিছু কথা লিখে গেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি ঋণের ওপর বেশিমাত্রায় নির্ভর করতে হয়েছে। অর্থায়নের চাহিদা মেটাতে পর্যাপ্ত অভ্যন্তরীণ সম্পদ তৈরি হচ্ছে না। ফলে সুদ ব্যয় মেটাতে জিডিপির ২ শতাংশের বেশি অর্থ চলে যাচ্ছে।

Banner

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার আগে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত দেশে পুঞ্জীভূত ঋণের অঙ্ক ছিল ১৮ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। আর গত জানুয়ারি পর্যন্ত ঋণের অঙ্ক বেড়ে প্রায় ২২ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার মতো ঋণ নিয়েছে।

এ পর্যন্ত পুঞ্জীভূত মোট ঋণের মধ্যে ব্যাংক খাতের ঋণের পাহাড় ৮ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়া ৩ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে বিদেশি ঋণের অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। গত ছয় মাসে শুধু বিদেশি ঋণ নেওয়া হয় ১০৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার, দেশীয় মুদ্রায় ১৩ হাজার ১০৩ কোটি টাকা।

ঋণ প্রসঙ্গে অর্থ বিভাগ সম্প্রতি এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, দেশি ও বিদেশি ঋণ নিয়ে ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা আছে। আগামীতে এর মাত্রা আরও বাড়তে পারে। কারণ এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) উত্তরণের পর বাংলাদেশকে উচ্চসুদে ও স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। পাশাপাশি মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ব্যয়কে উসকে দিয়েছে। এতে সামনের দিনগুলোতে মূলধনসহ ঋণের সুদ পরিশোধের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হবে এমন শঙ্কা ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। এছাড়া কম রাজস্ব আহরণ ও ঋণ পরিশোধে বেশি ব্যয় নিয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে সেটিও উল্লেখ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজস্ব আহরণ, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনার পরামর্শ দেওয়া হয়। না হলে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তেই থাকবে এমন পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে সেখানে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক সিনিয়র অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে জানান, জিডিপির অনুপাতে এ ঋণের হার বিশ্লেষণ করলে তা এখনো অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ঋণ মোকাবিলায় নতুন সরকারের আয় বাড়ানো বিরাট চ্যালেঞ্জ হবে। কিছু অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরতে হবে। সরকার ঋণ না নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যয় না মেটালে অর্থনীতি সম্প্রসারণ হবে না। প্রয়োজনে ঋণ নিতে হবে, তবে তা পরিশোধ করতে নিয়মিত আয় থাকতে হবে। সে আয় হচ্ছে রাজস্ব বৃদ্ধি। এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, নতুন ঋণ গ্রহণে একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, সেটি হচ্ছে ঋণটি যেন অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে কাজে আসে।

এদিকে ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে চ্যালেঞ্জে পড়েছে অর্থ বিভাগ। এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য হারে ব্যয় বেড়েছে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের প্রভাবে। কারণ একই পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধ করতে এখন আরও বেশি টাকার প্রয়োজন হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টাকার মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, যা এ সমস্যাকে আরও তীব্র করে তুলছে।

ইআরডি’র সূত্রমতে, বর্তমান মোট বৈদেশিক ঋণের মধ্যে প্রায় ৫৩ শতাংশই নেওয়া হয়েছে মার্কিন ডলারে। অর্থাৎ ঋণের বড় একটি অংশ মার্কিন ডলারে সঞ্চিত আছে। এছাড়া ঋণের ২২ শতাংশ হচ্ছে জাপানিজ মুদ্রা ইয়েনে নেওয়া, চীনের ইউয়ানে আছে ৭ শতাংশ এবং বাকি ৪ শতাংশ অন্যান্য মুদ্রায়।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস (জুলাই-ডিসেম্বর) পর্যন্ত ঋণ ও সুদ পরিশোধ করা হয়েছে ২১৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের আসল পরিশোধে ব্যয় হয় ২৬১ কোটি মার্কিন ডলার। তবে ধারণা করা হচ্ছে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে এ ব্যয় দাঁড়াবে ৩৩৪ কোটি ডলারে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ঋণনির্ভরশীলতা থেকে অর্থনীতিকে বের করার প্রতিশ্রুতি আছে। প্রথম একশ দিনের মধ্যে বড় কাজ হবে বাজেট প্রণয়ন। ঋণনির্ভরতা কমানোর অর্থ বাজেট ঘাটতি কমানো। ফলে বড় ধরনের ঘাটতি বাজেট এ প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নতুন বাজেটের ব্যয় বাড়বে। নতুন সরকার ইশতেহার অনুযায়ী প্রত্যাশা তৈরি করেছে। এর ১০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে গেলে ঋণনির্ভরতা বাড়বে। এজন্য আগ থেকে মানুষকে অবহিত করতে হবে ইশতেহার রাতারাতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা হবে। এটি কেন্দ্রীয়ভাবে নয়, মাঠপর্যায়ে লোকজনকে বোঝাতে হবে।

সম্পর্কিত খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল খায়ের 

নির্বাহী সম্পাদক: 
বার্তা প্রধান:

অফিস: বাড়ি ০৭, সড়ক ১৪/সি, সেক্টর ৪,

উত্তরা, ঢাকা-১২৩০।

যোগাযোগ: ০১৭১৫৩৬৩০৭৯

বিজ্ঞাপন: ০১৮২৬৩৯৫৫৪৯

Email: khair.hrm@gmail.com

info@dainikprotibimbo.com

protibimboprokash.com

ফেসবুকে আমরা

©2025 Dainik Protibimbo – All Right Reserved. Designed and Developed by Bangla Webs