বাংলাদেশে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি নিয়ে এবার সরাসরি মুখ খুললেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। সংসদীয় কমিটির বৈঠকে তিনি স্বীকার করলেন, “হ্যাঁ, আমরা জানতাম হাসিনার সরকার টিকবে না। তবে কিছু করার ছিল না। পরিস্থিতি আমাদের হাতের বাইরে চলে গিয়েছিল।”
এই বক্তব্যের ঠিক আগেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ঘোষণা করেছে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি)-তে নিয়ে যাওয়া হবে। এরপরেই দিল্লির প্রশাসনে চলছে তোলপাড়।
গত বছর জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে ছাত্র ও জনতার আন্দোলন দমন করতে গিয়েই হাসিনার সরকার ফাঁদে পড়ে। গুলিতে নিহত হন অন্তত ৬০০ জন, অসংখ্য মানুষ নিখোঁজ হন। তখনই জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক সেনাবাহিনীকে সতর্ক করেছিলেন, “শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বাদ পড়তে পারে।”
তবে ভারতের ভরসায় শেখ হাসিনা সকল সতর্কবার্তা উড়িয়ে দেন। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর শীর্ষ কর্মকর্তা রমনশ্রান্ত আগারওয়াল জানান, “আমরা হাসিনাকে পরামর্শ দিয়েছিলাম, গুলি চালাবেন না। তিনি আমাদের কথা রাখলেন, এবং বুলেট চালালেন। পরবর্তী নির্দেশনার দায়িত্ব নেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। বিশ্বগুরুর সাথে হাসিনার সম্পর্ক এতো গভীর যে, তিনি আমাদের কথা শুনতেন না!”
জয়শঙ্করও বৈঠকে প্রায় একই কথা বলেন, “আমরা পরিস্থিতি সামাল দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু হাসিনা সরকার তখন এমন জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল, যেখানে কেউই তাঁকে বাঁচাতে পারত না। মোদি তবু চেষ্টা করেছিলেন।”
ভারতে হাসিনার আশ্রয় নিয়ে দিল্লীর অস্বস্তি বাড়ছে। আইসিসি-তে বিচার গড়ালে ভারতও কি কোনোভাবে জড়িয়ে যাবে? মুম্বাইভিত্তিক স্বাধীন তদন্ত সংস্থা ‘ট্রু জাস্টিজ’র মুখপাত্র জানিয়েছেন, “শেখ হাসিনার সকল বিতর্কিত কাজে ভারত পাশে ছিল। ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় ভারতও এড়াতে পারে না। বাংলাদেশ শক্ত অবস্থান নিলে ভারতকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)র কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে পারে।”
জয়শঙ্কর স্পষ্ট জানিয়েছেন, “আমরা কোনোভাবেই আইসিসি-তে যাব না, হাসিনার সাথে হেগে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।” বিষয়টি ব্যাখ্যা করে অর্যমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন বলেন, “২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী মোদির ৩৮টি বিদেশ সফরে মোট ২৫৮ কোটি রুপি খরচ হয়েছে। আইসিসি-তে অংশগ্রহণ করতে হলে প্রতি বার ১২ থেকে ১৫ কোটি রুপি ব্যয় হবে, যা প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ ভ্রমণ বাজেটের সঙ্গে সমন্বয় করা সম্ভব নয়। তাছাড়া মোদি বেড়াতে ভালবাসেন, তবে আদালতে নয়।
শেখ হাসিনা দিল্লিতে ‘বিশেষ অতিথি’ মর্যাদায় থাকলেও এখন কার্যত বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ঘনিষ্ঠ সূত্র নিশ্চিত করেছে, “প্রথম দিকে হাসিনাকে বিশেষ অতিথি মর্যাদায় বিভিন্ন সুবিধা দেয়া হলেও, সেসব প্রত্যাহার করা হয়েছে। নিজে রান্না করে খেতে হয় বলে প্রায়ই তিনি দুধ-মুড়ি খেয়ে দিন কাটান। অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে তিনি উৎকণ্টিত।”
গেস্ট হাউজের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপক জয়রাজ মালহোত্রা দাবি করেন, হাসিনা সম্প্রতি জয়শঙ্করকে ফোন করে দেশে ফেরার চাপ দেন। এদিন জয়শঙ্কর ধৈর্য হারিয়ে বলে ফেলেন, “ম্যাডাম, আপনি যদি দেশের মানুষের কথা শুনতেন, তাহলে এমন দুধ-মুড়ি খেয়ে জীবন কাটাতে হতো না, আপনি দেশেই থাকতেন। দেশে নয়, আপনাকে আইসিসিতে পাঠানোর টিকিট কাটা নিয়ে আলোচনা চলছে।”
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনো এ বিষয়ে চুপ রয়েছেন। অপরদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সূত্র জানিয়েছে, “আইসিসি সত্যিই সক্রিয় হলে হাসিনার বাসস্থান দিল্লির গেস্টহাউস নয়, বরং হেগের ট্রাইব্যুনাল হবে!” দেখার বিষয়, ভারত কীভাবে এই ‘কূটনৈতিক সংকট’ সামলায়।
Sources: The New York 24 | Real News, Twisted Truths