স্টেটসম্যানশীপ
সাঈদা আজিজ চৌধুরী
বাংলাদেশে নির্বাচনী আবহ মোটামুটি সৃষ্টি হয়েছে।তারই পরিপ্রেক্ষিতে আমার এই প্রবন্ধটি। আমি রাজনীতিক নই। ছাত্রাবস্থায়ও কখনো কোনো দলে ছিলাম না।তবে বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিকের অভিজ্ঞতা থেকেই এই লেখাটি শেয়ার করলাম।
প্রথমেই বর্ণবাদবিরোধী ও বিখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক নেলসন ম্যান্ডেলার একটি উক্তি দিয়ে শুরু করলাম।
“পেছন থেকে নেতৃত্ব দাও—আর সেই সংগে অন্যদের বিশ্বাস দাও যে নেতা আছে তোমাদের সাথে।”
দেশপ্রেম প্রতিটি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত একটি আবেগ বা অনুভূতি। যে কোনো অবস্থান থেকেই দেশকে ভালোবাসা যায়।সংহতি ও আনুগত্য প্রকাশ করা যায়। মানবিক মূল্যবোধহীন দেশপ্রেম অন্তসারশূন্য আবেগ।প্রতিটি দল বা মানুষ ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিযেগিতায় শ্লোগান মুখর হওয়ার আগে জনগণের সংগে সম্পর্ক স্থাপন হউক। সহজ মাতৃভাষার আবেগীকণ্ঠে উচ্চারিত শব্দমালায় কার্যকরী বক্তৃতা সমাবেশ হোক। হুঙ্কার,তর্জন গর্জন কখনই জনমানসে অনুভূতির জন্ম দেয় না।
প্রান্তিক ও অশিক্ষিত মানুষেরাও এদেশের নাগরিক।তাদের মধ্যেও দেশপ্রেম রয়েছে।বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক রাখাল বালক,রিক্সাওয়ালা,ফেরিওয়ালা,নৌকার মাঝি সাহায্য করেছে নানাভাবে।অনেকে গেরিলাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। তাদের ভোটের অধিকার রয়েছে। তারা কি চায় ভেবে দেখার প্রয়োজন। জনবিচ্ছিন্ন সরকার কখনোই জনগণের কাম্য নয়।
বিপ্লবের ভাষা ও নির্বাচনের ভাষা ভিন্ন।জনসাধারণের মনোজগতে প্রবেশ করার চেষ্টা প্রয়োজন। বিপ্লবী মুড্ এবং নেতা নির্বাচন এক নয়।
নিজস্ব সংস্কৃতির সংগে খাপ খায়— নির্বাচনী শ্লোগান এমন হওয়া উচিত।
রাজনীতির ময়দানে বিনয় ও ধৈর্যের সাথে বৈরিতা সম্পর্কে দলে আলোচনা করা দরকার।কখনো কখনো উদারতা ও ক্ষমা মানুষকে মহীয়ান করে তুলে।
নিজের বিবেক যেনো সদা জাগ্রত থাকে।দুর্নীতিকে কখনোই প্রশ্রয় দেয়া যাবেনা। একাকী নিজের সংগে বোঝাপড়া ও জবাবদিহিতার কালচার এডাপ্ট করতে পারলে এবং সংশোধিত হলে আশা করা যায় আপনিই জনগণের সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষ, যাকে ভোট প্রদানের মাধ্যমে জনগণ সন্তুষ্টি অনুভব করবে।
চাপিয়ে দেয়া শাসনব্যবস্থা কোনোকালেই টিকে থাকতে পারেনি।অতীতে সকল ফ্যাসিষ্টদের একই পরিণতি আমরা লক্ষ্য করেছি। বাংলাদেশে নব্য ফ্যাসিজম যেনো মাথাচাড়া না দেয়,সেদিকে সচেতন নাগরিকরা অবশ্যই লক্ষ্য রাখবেন।
একজন স্টেটসম্যান যিনি সমগ্র দেশ পরিচালনার মত গুরুত্বপূর্ণ দ্বায়িত্ব পালন করবেন,তাঁর সেই মনোবল, সততা, স্বচ্ছতা, দূরদর্শিতা, পরমতসহিষ্ণুতা ও দেশের প্রতি আনুগত্য থাকা উচিত।সর্বোপরি পলিটিক্যাল ম্যাচুরিটি রাজনীতির প্রধান উপাদান।কপট দেশপ্রেম দিয়ে জনগণকে খুব বেশিদিন ধোঁকা দেয়া যায় না।
অতীতকে বাদ দিয়ে কোনো মানুষ বা জাতি নেই এই পৃথিবীতে। অতীতের ওপর ভর করে আমরা সবাই দাঁড়িয়ে আছি।আমাদের অতীতকে অস্বীকার করলে আমাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অতীতের রাজনৈতিক নেতাদের জীবনী পড়লে নেতা হিসেবে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট হবে। তাঁদেরকে যোগ্য সম্মান দেওয়া ও মূল্যায়ণ করা প্রতিটি বাংলাদেশির কর্তব্য।একজন যোগ্য নেতার দেশ ও দশের প্রতি প্রচুর দ্বায়িত্ব রয়েছে।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি মানুষ একটি কেন্দ্রবিন্দুর দিকে ধাবিত হয়েছিল।রাজনীতির গাণিতিক সমীকরণ বা কেমিষ্ট্রির কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন একজন নেতা।অন্য নেতাগণও মতপ্রকাশ করেছেন, সর্বাত্মক লড়াইয়ের শপথে একাত্মতা পোষণ করেছেন। নেতা যখন আস্থা অর্জনে সক্ষম হন, জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তাঁকে গ্রহণ করে, একতাবদ্ধ হয়।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ৫২তেই হয়েছিল।একতাবদ্ধ জনতা একে একে অনেকগুলো পর্বত সমান দুর্গম ধাপ পেরিয়ে সংঘটিত হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ।৫২,৬২,৬৬,৬৯,৭০ এর ইলেকশন।তারপর ৭১–মহান মুক্তিযুদ্ধ।
মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী শহীদদের জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
সেই সংগে আজ পর্যন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সকল শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও মাগফেরাত কামনা করি।
মুক্তিযোদ্ধাদের যাঁরা এখনও বেঁচে আছেন দলমত নির্বিশেষে সবাইকে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই। তাঁদের ত্যাগ ও বিসর্জনের বিনিময়ে আমাদের এই সার্বভৌম বাংলাদেশ।
চব্বিশের বিপ্লব পরবর্তী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ তাকিয়ে আছে সেই মহান ব্যক্তিত্বের দিকে যিনি ১৮/১৯ কোটি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা রাখবেন।ধনতন্ত্র নয়, আক্ষরিক অর্থে গণতন্ত্রই মুক্তির মূল চালিকাশক্তি।
বোধের অতল গভীরে থাকে প্রতিটি বিষয়ের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ। সেখানে নিবিষ্টে ডুব দিতে পারলে কেউ পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে না। নিরপেক্ষ মতামত দেশপ্রেম ও গণতন্ত্রের প্রধান উপাদান।
২১/৩/২০২৫