বার্লিনালে ৭৬
——- বার্লিন থেকে কবি নাজমুন নেসা পিয়ারি
বার্লিনালে” বিশাল চলচ্চিত্র উৎসব — এর বিভিন্ন আয়োজন, অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা যেন ফুরায় না। যদিও উৎসবের সমাপ্তি ঘটেছে ২২শে ফেব্রুয়ারি। এ উৎসবের মূল আয়োজকদের আমন্ত্রণে জুরিরা এসেছিলেন বিভিন্ন দেশ থেকে। অফিসিয়াল আন্তর্জাতিক জুরিদের বিচারে স্বর্ণ ভাল্লুক ও রৌপ্য্য ভল্লুক মিলিয়ে আটটি পুরস্কার ছাড়াও আরো বেশ কিছু শাখায়ও রৌপ্য ভল্লুক ও অন্যান্য পুরস্কার দেওয়া হয়। তবে এর বাইরেও ছিল আরো বেশ কিছু পুরস্কার — “প্রাইজেস অব দ্যা ইন্ডিপেন্ডেন্ট জুরিস” — স্বাধীন ভাবে কিছু সংগঠন তাদের নির্বাচিত জুরিদের মাধ্যমে পুরষ্কার নির্বাচন করেন, পুরস্কার দেন। এরকম প্রায় এক ডজনের ওপরে বিভিন্ন সংগঠন “বার্লিনালে”-তে অংশগ্রহণকারী ছবিগুলো থেকে তাঁদের পক্ষ থেকে নির্বাচিত জুরিদের মাধ্যমে বিচার করে পুরস্কার দেন। এর ফলে পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য দেখা যায় — বার্লিনালের মূল পুরস্কারের বাইরেও অন্য আরো অনেকে পুরস্করৃত হন। এই পুরস্কারের ভেতরে “বার্লিনালে” আন্তর্জাতিক জুরিদের কাছ থেকে বার্লিনালের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার — সেরা ছায়াছবির জন্য “স্বর্ণ ভাল্লুক” পুরস্কার পাওয়া “গেলবে ব্রিফ (হলুদ চিঠি)’র পরিচালক লিকার চ্যটাক ইনডিপেনডেন্ট জুরি-র পুরস্কার গিলড ফিলম প্রাইজ-এর পক্ষ থেকেও পুরস্কার পেয়ে যান। যারফলে এবারের বার্লিনালেতে তাঁর কাছে দুটো পুরস্কার চলে গেল।

জার্মানির দুটি দৈনিক পত্রিকা “ডেয়ার বার্লিনার মরগেনপোসট” এবং “টাগেস স্পিগেল“ তাদের নির্বাচিত পাঠকদের নিয়ে নির্বাচিত বিচারক দল তৈরি করে তাঁদের মাধ্যমে বার্লিনালের ছবি থেকে ছবি বাছাই করে পুরস্কার ঘোষণা করেছে। “বের্লিনার মরগেন পোস্ট” জুরি গঠন করেছে পত্রিকার ১৪ জন পাঠক নিয়ে এবং “টাগেস স্পিগেল” জুরি তৈরি করেছে পত্রিকার সাতজন পাঠককে নিয়ে। “বেরলিনার মরগেনপোস্ট” পত্রিকা স্প্যানিশ পরিচালক ফার্নান্দো এইমবাকের পরিচালিত “মোসকাস” অর্থাৎ “মাছি” ছবিটিকে পুরষ্কৃত করে। দৈনিক “টাগেস স্পিগেল” পত্রিকা পরিচালক জানাইনা মার্কেজ-এর ছবি “আই বিল্ট এ রকেট”-কে পুরষ্কৃত করে।
বেবলসব্যার্গ জার্মানির রাজধানী বার্লিনের দক্ষিন পশ্চিম এলাকায় পটসডাম-এ অবস্থিত। ব্যাবেলসব্যার্গ ঐ এলাকার সবচেয়ে বড্ ডিসট্রিকট — এই বাবেলসব্যার্গ এলাকা ঐতিহাসিক ফিল্ম স্টুডিওর জন্য আন্তর্জাতিক ভাবে খ্যাত। স্টুডিও বাবেলসব্যার্গ কুপার-এর সহযোগিতায় পাঁচজন জুরির মাধ্যমে এবার বার্লিনালে-র পুরষ্কার নির্বাচন করেন! তাঁদের বিচারে পরিচালক আলফি ব্যারকার তাঁর “দ্যা জেব্রা” ছবির জন্য প্রথম ও রেনিস হাইকা তাঁর “ডে ওয়ান” ছবির জন্য দ্বিতীয় পুরস্কার পান —- পুরস্কার হিশেবে তাঁরা বিশাল অংকের অর্থ লাভ করেন। এরকম আরো পুরস্কার রয়েছে—- বার্লিনালের এই ইনডিপেনডেন্ট জুরিদের মাধ্যমে দেওয়া নানা শাখার পুরস্কারের সংখ্যও কম নয়।
বার্লিনালেতে এবার বাংলাদেশের জন্য খা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো এবারই প্রথম বারের মতো বার্লিনালের বিশেষ একটি শাখা ইওরোপিয়ান ফিল্ম মার্কেট (EFM)- যোগ দেওয়া। এতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন তরুণ চিত্রনির্মাতা মিহির মশিউর রহমান। ইওরোপিয়ান ফিল্ম মার্কেটের EFM Toolbox 2026-এ তিনি যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। মিহির মশিউর রহমান ২০২৪ সালে জার্মানির মিউনিখে পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্র প্রতিযোগিতায় সেরা পুরস্কার পেয়েছিলেন। এছাড়াও এর আগে আরো কিছু পুরস্কার তিনি অর্জন করেছেন। এবারের ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে EFM-এ তাঁর অংশগ্রহণ প্রশংসার দাবী করে!
বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে যোগাযোগ ও মিটিং-এর জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান “বার্লিনালে হাব”-এ পরিচয় হয়েছিল ফিল্ম মার্কেট-এর কয়েকজনের সঙ্গে। ব্রাজিলের চিত্রনির্মাতা গুস্তাভো ফনটেলে ইওরোপিয়ান ফিল্ম মার্কেট (EFM)-এ যোগ দিয়েছিলেন। তিনি সেখানে যোগাযোগ স্থাপন করেছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে —তাঁর দুটি এনিমেশন ফিচার ফিল্ম (Swallows এবং Hacker Leolens) নিয়ে তিনি বার্লিনালে উৎসবে এসেছিলেন — এই দুটো প্রজেক্ট নিয়েই তিনি ফিল্ম মার্কেট EFM-এ যোগ দিয়েছিলেন— সেখানে ব্রজিল ফিল্ম ইনস্টিটিউটের স্টল ছিল যার ফলে তাঁর অনেক নেট ওয়ারর্কিং সম্ভব হয়েছে—- তিনি আরো বলেন, “বার্লিনালে” এক বিশাল উৎসব এবং এখানে ভালো বাজারও রয়েছে। এখানে তাঁর আবার আসার ইচ্ছা আছে বলে জানালেন তিনি। বার্লিননালে-র হাব-এ এই ফেস্টিভ্যালের আয়োজোকদের এক আড্ডায় এক সকালে যোগ দিয়েছিলাম — ফরাসি রুটি ক্রোয়সো ও কফি খেতে খেতে আড্ডা যেন আর ফুরায়-ই না। জেনারেশন শাখার ছবির নির্বাচন কমিটির একজনকে প্রশ্ন করেছিলাম “নির্বাচন করতে গিয়ে তাঁদের কোন অসুবিধা হয় কিনা উত্তরে তিনি বললেন, “বিশাল সংখ্যক ছবি থেকে বাছতে হয় তখন কখনও কখনও কারো হয়তো” বলেই ডান হাতের একটি আঙুল চোখের নীচে ধরে বোঝালেন যে কান্না পায়। আসলেই তো সকলেকে মিলেমিশেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাঁর আন্তরিক মায়াময় ভঙ্গি যেন অনেক কথা বলেছিল, ভালো লেগেছিল। এবারে ফ্রন্সের বিখ্যাত অভিনেত্রী জুলিয়েট বিনোশ এসেছিলেন — প্রতিযোগিতার ছবি “কুইন এট সি”-তে প্রধান চরিত্রের অভিনেত্রী হিসেবে। প্রেস কনফারেন্স- এবং সিনেমা হলে ছবির অভিনেতা, অভিনেত্রীদের পরিচিতি পর্বে দর্শকদের সবচেয়ে বেশী করতালি পেয়েছিলেন তিনি। তিনি গতবছর কান চলচ্চিত্র উৎসবে জুরি প্রসিডেন্ট ছিলেন। আর সেবারই সেই প্রথম “কান চলচ্চিত্র উৎসব-এ বাংলাদেশের কোন একটি ছবি প্রথম কো্ন সন্মাননা পেল। বাংলাদেশের চিত্র পরিচালক আদনান আল রাজিব-এর “আলি” ছবি “স্পেসাল মেনশন” সন্মাননা অর্জন করল কান চলচ্চিত্র উৎসব ২০২৫-এ। তখন “হোয়াটস অন” অনলাইন টিভির খবরে বলেছিল “বাংলাদেশ “কান”-এ ইতিহাস রচনা করলো। এই প্রথম বাংলাদেশ কান-এ পুরষ্কা পেলো— “স্পেশাল মেনসন” পুরস্কার জিতে নিল।
“কুইন এট সি” বার্লিনালে-র আন্তর্জাতিক জুরি নির্বাচিত মূল পুরস্কারে ছবির পরিচালক লানস হামার রৌপ্য ভল্লুক এবং পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ক্রিস্টাল বিয়ার পেলেন একসঙ্গে অভিনেতা অভিনেত্রী দুজনে! এবছর শ্রেষ্ঠ প্রধান চরিত্রের পুরস্কার পেলেন জার্মান অভিনেত্রী সান্দ্রা হুলার মারকুস শলাইনৎসার পরিচালিত “রোজ”
ছবিতে অভিনয়ের জন্য। জার্মানির বিখ্যাত পত্রিকা “ফ্রাঙ্কফুর্টার আলগেমাইনে সাইটুং” ফেস্টিভ্যাল আরম্ভ হাওয়ার পর পরই লিখেছিল এবছর হয়তো “কুইন এট সি” স্বর্ণ ভল্লুক জিতে নেবে। পত্রিকার বিশ্লেষণ তেমন সঠিক হয় নি।
এবছর বার্লিনালে-তে আন্তর্জাতিক বিচারক মন্ডলীতে জুরি প্রেসিডেন্ট ছিলেন জার্মানির বিখ্যাত পরিচালক ভিম ভ্যানডারস — তাঁর সঙ্গে ছিলেন নেপালের প্রযোজক, পরিচালক মিন বাহাদুর ভান; ভারতের প্রযোজক, পরিচালক শিভনদ্র সিং দুঙ্গারপুর; জাপানের চিত্রলেখক, প্রযোজক, পরিচালক হিকারি; দক্ষিন কোরিয়ার অভিনেত্রী বায়ে দোনা ; আমেরিকার চিত্র লেখক, পরিচালক, প্রযোজক র্যানালডো মারকুস গ্রীন, পোল্যান্ডের প্রযোজিকা এভা পুৎসনিসকা!
১৫৬

