৪৯
আমেরিকা থেকে লিখেছেন: কাজী জহিরুল ইসলাম।
জটিল বিপদে বাংলাদেশ: একটি সমাধান প্রস্তাব
ভারতের বাংলাদেশ বিরোধী অপতৎপরতা, নেতিবাচক প্রচার-প্রপাগাণ্ডা এবং মাঝে মধ্যেই সামরিক হুমকি-ধামকি, বিশ্বসভায় বাংলাদেশকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার আগ্রাসী প্রবণতা এবং বাংলাদেশ-বিরোধী একটি রাজনৈতিক দলের হাজার হাজার কর্মীকে অবৈধভাবে ভারতে আশ্রয় এবং প্রশিক্ষণ দেওয়া, এইসব ব্যাপক ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করার সামর্থ্য কোনো একক রাজনৈতিক দলের নেই। কোনো একক রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলেই তারা সর্বগ্রাসী এই সুনামী রুখে দিতে পারবে না। হয় তারা এই সুনামীতে ডুবে মরবে, মানে ভারতের হাতের পুতুল হয়ে আগের সরকারের মতো আত্মঘাতী চুক্তি সই করবে, বাংলাদেশকে ভারতের একচেটিয়া বাজারে পরিণত করবে অথবা কঠোর হতে গিয়ে ব্যর্থ সরকারে পর্যবসিত হবে। এই রকম একটি বৃহৎ শক্তিকে মোকাবেলা করার জন্য দরকার সুদৃঢ় দেশপ্রেম, জাতীয় ঐক্য এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য বিশ্ববরেণ্য কোনো ব্যক্তির নেতৃত্ব।
আজ বাংলাদেশের নির্বাহী প্রধানের দায়িত্বে প্রফেসর ড. ইউনূসের মত বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তি না থেকে অন্য যে কেউ থাকলে বাংলাদেশকে পৃথিবীর মানুষ একটি উগ্র মৌলবাদী দেশের তালিকায় ফেলে দিত। এই লক্ষ্যে ভারতের মদদে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা ব্যাপক প্রচার-প্রপাগাণ্ডা চালাচ্ছে কিন্তু ড. ইউনূসের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা এবং সততার কাছে সব খড়কুটোর মত ভেসে যাচ্ছে। বিশ্বনেতৃবৃন্দ ড. ইউনূসের কথাকে কখনোই অবিশ্বাস করে না। তিনি যা বলেন তাই তারা গ্রহণ করেন। এটি আমাদের বড়ো সৌভাগ্য।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী শেখ হাসিনার আমলের চেয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণের ঘটনা অনেক কম। হাসিনার শাসনামলে ৭ হাজার শিশুসহ ৪৩ হাজার নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। কিন্তু বৈরী মিডিয়াগুলো আজকের ঘটনা এমনভাবে প্রচার করছে যেন এই সরকারের আমলেই শুধু এইসব ঘটনা ঘটছে, এর আগে শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণের কোনো ঘটনাই বাংলাদেশে ঘটেনি। এইরকম ঘটনা যেন একটিও না ঘটে আমরা সকলেই তা চাই। আমাদের সেই শুভপ্রত্যাশা পূরণ হবে দেশের নাগরিকেরা সচেতন হলে এবং আইনের প্রয়োগ হলে। শেখ হাসিনার আমলে তার দলের ক্যাডার জসীম উদদীন মানিক এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ জন ছাত্রীকে ধর্ষণ করে কেক কেটে তার সাফল্য উদযাপন করেছে কিন্তু সরকার তাকে গ্রেফতার করেনি, তার কোনো বিচারও হয়নি। বিচার না হওয়ার এমনি অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে হাসিনার শাসনামলে।
১৮ কোটি মানুষের দেশে, জনগণ পুরোপুরি সচেতন না হলে, নৈতিকতার চর্চায় আত্মনিয়োগ না করলে, অপরাধ নির্মূল করা যাবে না। কিছু অপরাধ ঘটবেই। পৃথিবীর সব উন্নত দেশেই ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং খুনের ঘটনা ঘটে। এখন কথা হচ্ছে ঘটনা ঘটার পরে কী হয়? তারা কি এইসব ঘটনা ঘটিয়ে নির্বিঘ্নে পার পেয়ে যায়? সরকার, প্রশাসন কি ঘুষ, উৎকোচ গ্রহণ করে অপরাধীকে ছেড়ে দেয়? এই জায়গাটিই আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে। আছিয়াকে যারা ধর্ষণ করেছে, হত্যা করেছে, তারা কি দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেফতার হয়নি? শুধু গ্রেফতারই হয়নি দ্রুত বিচার কার্যও শুরু হয়েছে। সারা দেশ ধর্ষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। জাতির বিবেক জেগে উঠেছে। এই জায়গাটায় আমাদের অকৃপণভাবে প্রশংসা করতে হবে, যাতে জাতির বিবেক সকল অন্যায় ও অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে এভাবে সজাগ থাকে।
এবার রমজানে, সম্ভবত গত ৫৪ বছরের বাংলাদেশে এই প্রথম, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য কমেছে, মানুষ স্বস্তিতে আছে। এখানেও আওয়ামীলীগের কর্মীরা সরকারের সততা ও আন্তরিকতার প্রশংসা না করে সমালোচনা করছে, বলছে, এতো দাম কমে গেলে কৃষক মারা যাবে। কেউ বলছেন এ বছর মার্চে রোজা হওয়ায় শীতের শব্জি এখনও বাজারে আছে, উৎপাদনের মৌসুমে রোজা হয়েছে বলেই কৃষিপণ্যের দাম কম। কিন্তু মার্চে মাসে তো রোজা আরো হয়েছে, প্রতি ৩৫/৩৬ বছরে একবার রোজা পুরো বছর ঘুরে আবার আগের জায়গায় আসে। কই আর কখনো তো রোজায় জিনিসপত্রের দাম কমেনি।
বাংলাদেশের মানুষ তো কমে যায়নি। দ্রব্যের চাহিদাও কমেনি। মাত্রাতিরিক্ত উৎপাদন হয়েছে তাও তো শুনিনি। তাহলে কেন দাম কমলো? এর কারণ দুটি। প্রথমত, কৃত্রিমভাবে দাম বাড়াত যেসব মধ্যস্বত্বভোগী অসাধু ব্যাবসায়ী-সিন্ডিকেট, সেটা ভেঙে পড়েছে। সরকারের সততা এবং সদিচ্ছার কারণেই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব হয়েছে। দ্বিতীয় কারণটি খুব ইন্টারেস্টিং, এটা কেউ ভেবে দেখেনি। রাজনৈতিক দলগুলো যখন ক্ষমতায় থাকে, বিশেষ করে শেখ হাসিনার শাসনামলে, দুর্নীতি ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ে, মানুষের হাতে ছিল মাত্রাতিরিক্ত অবৈধ অর্থ। এই অবৈধ অর্থের একটা আগ্রাসী ক্রয়ক্ষমতা প্রতিফলিত হত বাজারে। বাজারের সবচেয়ে বড়ো মাছটার দাম ধরেন ৩ হাজার টাকা। কিন্তু দশজন ক্রেতা বিপুল অবৈধ অর্থের মালিক, দশজই বড়ো মাছটা কিনতে চায়, তারা এভাবেই মর্যাদা ক্রয় করে, তখন বিক্রেতা সুযোগ বুঝে দামটা বাড়িয়ে ৬/৭ হাজারে তুলে দেয়, এটা কিন্তু প্রকৃত চাহিদা নয়, কৃত্রিম চাহিদা। এই কৃত্রিম চাহিদা প্রায়শই বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে, অস্থির করে তোলে। দুর্নীতি কমে আসায় এই কৃত্রিম চাহিদাটা এখন বাজারে অনুপস্থিত, ফলে নিপণ্যের দ্রব্যমূল্য শুধু নয়, এখন দেশে এপার্টমেন্টসহ নানান স্থাবর ও বিলাসী পণ্যেরও দাম কমে গেছে। কৃষিপণ্যের দাম কমে গেছে, কৃষক মরে যাচ্ছে, এই হা-হুতাশ যারা করেন তাদের জন্য বলি, আগেও আমরা দেখেছি, কৃষক মাথায় করে বাজারে এক টুকরি টমেটো এনেছে, বিক্রি করতে না পেরে বাজারেই ঢেলে ফেলে দিয়ে গেছে, কারণ দাম এতো কম বোঝা বয়ে বাড়ি ফিরিয়ে নিতেও চায়নি তারা। তখনও কিন্তু শহরের বাজারগুলোতে টমেটোর দাম কমেনি। কারণ মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের দাপট ছিল তীব্র।
হাসিনার নির্দেশে হাজার হাজার মানুষ খুন করে পুলিশ বিভাগের নৈতিক ভিত্তিটা ভেঙে গেছে। উচ্চ পর্যায়ে বাহারুল আলমের মত কিছু সৎ পুলিশ অফিসার নিয়োগ দিয়ে সেই নৈতিক জায়গাটা সংস্কারের চেষ্টা করে যাচ্ছে ইউনূস সরকার, অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে, আর দুই/তিন মাসের মধ্যে পুরোপুরি ঠিক হয়ে যাবে বলে আশা করা যায়।
আওয়ামী লীগ দাবী করে তাদের ও তাদের অঙ্গসংগঠনের কর্মী-সংখ্যা কোটির ওপরে। হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যরাসহ প্রায় ৪৫ হাজার দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। তাদের অধিকাংশই ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। দেশের প্রধান গণমাধ্যমে এসেছে তাদের কেউ কেউ নাম বদল করে হিন্দু নাম নিয়ে ভারতের কাগজপত্র করে নিচ্ছে। এই ৪৫ হাজারের সঙ্গে আরো অনেকেই অদূর ভবিষ্যতে যুক্ত হবে। তাদেরকে ভারত প্রশিক্ষণ দিয়ে এমনভাবে তৈরি করবে যাতে তারা আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় বসাতে পারে। দেশের ভেতরে থাকা আওয়ামী লীগের কর্মীরা ক্রমাগত দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করবে। অতীতের মতো কখনো বাসে পেট্রোল বোমা ছুঁড়বে, কখনো লগি-বৈঠার তাণ্ডব চালাবে, শাহবাগী গ্রুপ, ব্লগার গ্রুপ তৈরি করবে, কখনো ভবনে আগুন দেবে, এইসব নাশকতামুলক কাজ তারা করতেই থাকবে। এই দ্বিমুখী অরাজগতা এবং দেশ-বিরোধী কর্মকাণ্ড মোকাবেলা করা কোনো একক রাজনৈতিক দলের সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে না।
ঠিক এইরকম একটা সময়ে আমাদের দুটি কাজ করতে হবে। সকল দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক শক্তির একটি ঐক্য গড়ে তুলতে হবে, পাশাপাশি চীন এবং অন্যান্য বৃহৎ শক্তির সঙ্গে কৌশলগত কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করতে হবে।
বৃহৎ ঐক্য টেকসই হবে তখনই যখন ঐক্যবদ্ধ শক্তির সমন্বয়ে একটি জাতীয় সরকার গঠিত হবে। এই মুহূর্তে যদি নির্বাচন হয় এবং নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যদি একটি রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে তাহলে ঐক্য ধরে রাখা যাবে না। এমন কী কোনো জাতীয় সনদে সাক্ষর করার পরেও এই ঐক্য টিকবে না। টেকসই ঐক্য গড়তে হবে একটি জাতীয় সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে।
আমার প্রস্তাব হলো, সকল দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল এক হয়ে আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি জাতীয় ঐক্যমত্যের সরকার গঠন করা হোক। সেই সরকারের রাষ্ট্রপতি থাকবেন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বিএনপি থেকে প্রধানমন্ত্রীসহ ১৫ জন, জামায়াতে ইসলামী থেকে ১০ জন, এনসিপি থেকে ১০ জন, অন্যান্য দল থেকে ১৫ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং উপমন্ত্রী থাকবেন। এই ৫০ জনের ক্যাবিনেট আগামী ৫ বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করবে এবং সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রব্যাবস্থার পূর্ণাঙ্গ সংস্কার করবে। মন্ত্রী পরিষদের ওপরে একটি সুপ্রিম কাউন্সিল থাকবে। প্রত্যেক জেলা থেকে ২ জন প্রতিনিধি, সকল রাজনৈতিক দল থেকে মন্ত্রী পরিষদের আনুপাতিক হারে প্রতিনিধি, সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, তিন বাহিনীর প্রধান, পুলিশ প্রধানকে নিয়ে গঠিত হবে সুপ্রিম কাউন্সিল। এই কাউন্সিল জাতীয় সরকারের পার্লামেন্টের ভূমিকা পালন করবে। তবে শুধুমাত্র রুটিন কাজের বাইরে রাষ্ট্রীয় বড়ো ইস্যুগুলোতে সুপ্রিম কাউন্সিল মিটিংয়ে বসবে এবং সিদ্ধান্ত নেবে।
এই পাঁচ বছরের মধ্যে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে হত্যকাণ্ড ঘটানোসহ ৩টি ভোটার বিহীন নির্বাচন করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করা এবং খুন, গুম, দুর্নীতি, অর্থ পাচারসহ সকল অপরাধের বিচার করাও সম্ভব হবে। এরপর একটি দল নিরপেক্ষে তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করে বাংলাদেশে পুনরায় পার্টি পলিটিক্স শুরু করা যাবে।
এই পাঁচ বছরে দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করে একটি নৈতিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো যাবে, বিদেশ নীতিও একটি সুস্পষ্ট ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে। ড. ইউনূসের গ্রহণযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে এক অনন্য উচ্চতায় উঠে যাবে।
হলিসউড, নিউইয়র্ক। ১৮ মার্চ ২০২৫