একুশের চেতনা ও বাংলাভাষা। প্রবন্ধ। ফারজানা ইসলাম

সম্পাদকীয়:

by protibimbo
০ মন্তব্য ৭৭ বার পড়া হয়েছে

একুশের চেতনা ও বাংলাভাষা
ফারজানা ইসলাম

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ রক্তে রাঙানো সেই একুশে ফেব্রুয়ারি । এ দিন ভোর থেকে ধ্বনিত হবে সেই অমর সংগীতের অমিয় বাণী। বাঙালি জাতি পুরো মাসজুড়ে শ্রদ্ধা ভালোবাসা জানাবে ভাষার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছিলেন তাদের। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ফেব্রæয়ারি ছিল ঔপনিবেশিক প্রভুত্ব ও শাসন- শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম প্রতিবাদ প্রতিরোধ এবং জাতীয় চেতনার প্রথম উন্মেষকাল।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পর পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা হয় এবং নতুন রাষ্ট্রের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে গ্রহণ করা হয়। কিন্তু বাংলাভাষী জনগণ বুঝতে পারেন যে, তাদের নিজস্ব ভাষাকে বঞ্চিত করা হলে, তা কেবল ভাষার সমস্যা নয়, বরং তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এ কারণেই শুরু হয় বাংলার জন্য লড়াই।
আমরা জানি ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রæয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে দুর্বার আন্দোলনে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিকের রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতি পায় মাতৃভাষার মর্যাদা এবং আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেরণা। তারই পথ ধরে শুরু হয় বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং একাত্তরে নয় মাস পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
বস্তুত ফেব্রæয়ারি মাস একদিকে শোকাবহ হলেও অন্যদিকে আমাদের জাতীয় জীবনে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। কারণ পৃথিবীর একমাত্র জাতি বাঙালি, যারা ভাষার জন্য এ মাসে জীবন দিয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রæয়ারির প্রথম দিন থেকেই শুরু হবে নানা কর্মসূচি। তবে এবার করোনার কারণে কর্মসূচি হবে সীমিত। তা ছাড়া ভাষা আন্দোলনের চেতনাবাহী অমর একুশের বইমেলা পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। সঙ্গত কারণেই এবার ভাষার মাসের নানা অনুষ্ঠান ও কর্মসূচি সংকুচিত হয়ে পড়বে। তারপরেও সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নানা সংগঠন এ মাসে হয়ত বা নানা কর্মসূচির আয়োজন করবে।
ভাষা আন্দোলনের বহুমাত্রিক অর্জন আমাদের জানা। তবুও নতুন নতুন প্রজন্মের আগমনের কারণে এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যর্থতার সুযোগে যে সকল অর্জন কার্যত ইতিমধ্যেই ফিকে হয় এসেছে। দেশের সচেতন মানুষের কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে সাধ্যমত সেগুলি তুলে ধরা। যাতে বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্ম আবার নতুন উৎসাহে হারানো বিজয়গুলি পুনরায় অর্জন করতে পারে এবং তার মাধ্যমে দীক্ষিত হতে পারে।
একুশের আন্দোলন বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের ভাষার অধিকার সংগ্রামের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। একুশ আমাদের জীবনে এক স্বীকৃত চেতনা, যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি, জাতিসত্তা এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকে।
বাংলা ভাষার প্রতি এই অবিচল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভাষার মর্যাদা কেবল ভাষার চর্চার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা এক জাতির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত। একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের প্রেরণা দেয়—ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো, তা রক্ষা করা, এবং তা সঠিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কাজ করে যাওয়ার।
উল্লেখ্য, ভাষা আন্দোলনের চেতনার পথ ধরে সবাই ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেন। শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি, সঙ্গীত শিল্পী, নৃত্যশিল্পী, বাদ্য শিল্পী, ছাত্র ও যুব সংগঠন, নারী সমাজ সহ সমগ্র বাঙালি জাতি। ভাষা আন্দোলনের ৭৪ বছর পদার্পণে এটা আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।
আমাদের সবারই মনে আছে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্টে। ছয় থেকে সাত মাস যেতে না যেতেই ১৯৪৮ সালের মার্চে বাঙালি তরুণেরা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ বলে মাঠে নেমে পড়লেন। তাদের যে উদ্দীপনা দেশপ্রেম ভাষাপ্রেম আজ তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। কারণ ১৯৪৭ সালে মূলত অসাম্প্রদায়িক শক্তির পরাজয় ঘটেছিল, সেখানে ১৯৪৮ এর শুরুতেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ভিত্তিমূলেই আঘাত হানার মাধমে সেই শক্তি আবার জেগে ওঠে। এত দ্রæততার সাথে আন্দোলনটির সূচনা হলো যে ব্যাপক মানুষের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে তা বুঝে ওঠা সম্ভব হয় নি।
রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীর স্বীকৃতির পরবর্তীকালে দেখা গেছে বাংলা সাহিত্যের প্রসারে বাঙালি কবি সাহিত্যিক, ঐপন্যাসিকদের নতুন নতুন বই লিখতে ও প্রকাশ করতে, বই মেলার প্রচলন হতে, ধীরে ধীরে নারী শিক্ষার প্রসার ঘটতে। বস্তুত সমাজে এক বিশাল ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে সমাজদেহ থেকে সাম্প্রদায়িকতা উচ্ছেদ বা হ্রাসের প্রক্রিয়া শুরু হয়। আশার কথা আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, গড় মাথাপিছু আয় বেড়েছে, শিক্ষার হার বেড়েছে, গড় আয়ু বেড়েছে। আমরা বিশাল বিশাল বাজেট পাস করছি তাও সত্য। কিন্তু মানুষের অর্থনৈতিক বৈষম্য কি কমেছে? সর্বস্তরে বাংলাভাষা কি চালু হয়েছে? একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থঅর প্রর্বতন ছিল আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার। জাতীয় শিক্ষানীতি কি আমরা একমুখী করতে পেরেছি?ভাষার মাসে এসব প্রশ্ন সামনে চলে আসে। ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে এ কথা আমাদের স্মরণে রাখতে হবে, বাঙালি ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। ভাষা আন্দোলনের বিপুল অর্জনের পাশাপাশি আমাদের ব্যর্থতাও রয়েছে। এই ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে হবে। এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লেখক: ফারজানা ইসলাম (প্রাবন্ধিক ও সামাজিক উদ্যোক্তা)

সম্পর্কিত খবর

সম্পাদক: আবুল খায়ের (কবি ও কলামিস্ট)।
নির্বাহী সম্পাদক:
বার্তা প্রধান:

অফিস:  বাড়ি ১১, সড়ক ৩, সেক্টর ৬,  উত্তরা, ঢাকা-১২৩০।
যোগাযোগ: ০১৭১৫৩৬৩০৭৯
বিজ্ঞাপন: ০১৮২৬৩৯৫৫৪৯
Email: info@dainikprotibimbo.com khair.hrm@gmail.com

Facebook

©2025 Dainik Protibimbo – All Right Reserved. Designed and Developed by Bangla Webs