‘অনুগত ও তোষামদকারী’ সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আমলা, সাংবাদিক, শিল্পীদের ৮৩০ প্লট দেন হাসিনা

জাতীয়

by protibimbo
০ মন্তব্য ৭৯ বার পড়া হয়েছে

রাতের ভোট নামে পরিচিতি পাওয়া ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশন সচিব ছিলেন হেলালুদ্দীন আহমদ। আওয়ামী লীগ সরকারের ‘অনুগত’ এই আমলাকে ভোটের পাঁচ মাস আগে পূর্বাচলে রাজউকের সাড়ে সাত কাঠার একটি প্লট দেওয়া হয়। তিনি প্লটটি পান সরকারি চাকরিতে ‘অসামান্য অবদানের’ জন্য।

‘রাতের ভোটে’ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর হেলালুদ্দীনকে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব করা হয়। ২০২২ সালে সেখান থেকে অবসরে যাওয়ার পর তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয় সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সদস্য পদে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর হেলালুদ্দীন আত্মগোপনে চলে যান। পরে ২৩ অক্টোবর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তিনি কারাগারে।

এখন এসব প্লটের কাঠাপ্রতি বাজারমূল্য কোটি টাকার বেশি। রাজউকের প্লটের আয়তন ৩, ৫, ৭, সাড়ে ৭ ও ১০ কাঠা। সংরক্ষিত কোটায় প্লট পাওয়া কেউ কেউ তা বিক্রিও করে দিয়েছেন।

২০১৪ সালে নবম জাতীয় সংসদের একতরফা নির্বাচনের পর সংরক্ষিত নারী আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য হন পিনু খান। তাঁর ছেলে বখতিয়ার আলম ওরফে রনিকে ২০১৩ সালে জাতীয়ভাবে ‘অসামান্য অবদানের’ জন্য রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পে একটি প্লট দেওয়া হয়। ২০১৫ সালে বখতিয়ার আলম রাজধানীর ইস্কাটনে যানজটে আটকা পড়ায় এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে দুই রিকশাচালককে হত্যা করেন। এ ঘটনায় হওয়া মামলায় ২০১৯ সালে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। তিনি এখন কারাগারে।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে এভাবে সরকারি চাকরি, জনসেবা ও সমজাতীয় খাতে জাতীয়ভাবে ‘অসামান্য অবদানের’ নামে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অথবা আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠদের দেওয়া হয় রাজউকের প্লট। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহর, উত্তরা তৃতীয় প্রকল্প ও ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পের প্লটগুলো তাঁরা পেয়েছেন কাঠাপ্রতি মাত্র ২ থেকে ৩ লাখ টাকায়। যদিও এসব প্লটের বাজারমূল্য তখনো বহুগুণ বেশি ছিল। এখন এসব প্লটের কাঠাপ্রতি বাজারমূল্য কোটি টাকার বেশি। রাজউকের প্লটের আয়তন ৩, ৫, ৭, সাড়ে ৭ ও ১০ কাঠা। সংরক্ষিত কোটায় প্লট পাওয়া কেউ কেউ তা বিক্রিও করে দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের আমলে রাজউকের অ্যালটমেন্ট অব ল্যান্ডস রুলসের ১৩/এ উপবিধির (অসামান্য অবদান) অধীনে কত প্লট বিতরণ করা হয়েছে, তা জানতে প্রথম আলো আড়াই মাস অনুসন্ধান চালায়। অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত ৮৩০টি প্লট কার কার নামে বরাদ্দ করা হয়েছে, তা জানা সম্ভব হয়েছে। রাজউকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এর বাইরে আরও প্লট রয়েছে, যেগুলো ‘অসামান্য অবদানের’ নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেগুলোর তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে পাওয়া নাম বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি প্লট বরাদ্দ পেয়েছেন বিগত তিন সংসদের (নবম, দশম ও একাদশ) সাবেক সংসদ সদস্যরা। তাঁদের সংখ্যা অন্তত ২৫৬। এ ছাড়া সাবেক অন্তত ২২ মন্ত্রী, ১২ প্রতিমন্ত্রী ও ৩৯ জন সচিব ‘অসামান্য অবদানের’ নামে প্লট বরাদ্দ পেয়েছেন। রাজনীতিবিদ ও আমলাদের বাইরে অন্তত ৩০ জন সাংবাদিক, ৩০ জন শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী পেয়েছেন প্লট। তালিকায় আছেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, বিচারপতি, প্রবাসী, আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ অনেকে। তাঁদের পরিচয় মূলত তাঁরা প্রভাবশালী ও আওয়ামী লীগ সরকারের অনুগত অথবা তোষামোদকারী। কেউ কেউ তদবির করেও প্লট নিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের আমলে রাজউকের অ্যালটমেন্ট অব ল্যান্ডস রুলসের ১৩/এ উপবিধির (অসামান্য অবদান) অধীনে কত প্লট বিতরণ করা হয়েছে, তা জানতে প্রথম আলো আড়াই মাস অনুসন্ধান চালায়। অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত ৮৩০টি প্লট কার কার নামে বরাদ্দ করা হয়েছে, তা জানা সম্ভব হয়েছে।

স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার অ্যাসাইনমেন্ট অফিসার, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, ব্যক্তিগত সহকারী এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অন্তত ১৫ জন গাড়িচালকও পেয়েছেন প্লট।

শেখ হাসিনার নিজের নামে, পরিবারের সদস্যদের নামেও প্লট বরাদ্দ হয়েছে। হাসিনার নামে বরাদ্দ হয়েছে পূর্বাচলে ১০ কাঠার একটি প্লট। তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ এবং ছোট বোন শেখ রেহানা (রেহানা সিদ্দিক), রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক (রূপন্তী) ১০ কাঠা করে প্লট পেয়েছেন পূর্বাচলে। সব মিলিয়ে এই পরিবারের ছয়জন মোট ৬০ কাঠা জমি পেয়েছেন। প্রতি ১০ কাঠার নির্ধারিত মূল্য ধরা হয় ৩০ লাখ টাকা এবং সব অর্থ ২০২২ সালে পরিশোধ করা হয়।

তথ্য গোপন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ নেওয়ায় হাসিনা ও তাঁর পরিবারের ছয়জনের নামে সম্প্রতি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এদিকে শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে ও যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশও পূর্বাচলে প্লট পেয়েছেন।

স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার অ্যাসাইনমেন্ট অফিসার, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, ব্যক্তিগত সহকারী এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অন্তত ১৫ জন গাড়িচালকও পেয়েছেন প্লট।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্লট পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ‘গডফাদার’, অর্থ আত্মসাৎকারী, ঋণখেলাপি, বিতর্কিত ব্যক্তি এবং সাবেক মন্ত্রী ও সচিবের মেয়ে। রাজউক সূত্র জানিয়েছে, প্লটের জন্য আবেদন করা হতো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে। তখন শেখ হাসিনার সম্মতিতেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সিদ্ধান্ত হতো কারা কারা প্লট পাবেন। পরে সেই তালিকা পাঠানো হতো মন্ত্রণালয় হয়ে রাজউকে। সংস্থাটির বোর্ড সভায় শুধু কাগুজে অনুমোদন হতো।

গৃহায়ণ ও গণপূর্তসচিব হামিদুর রহমান খান ১৫ জানুয়ারি তাঁর দপ্তরে প্রথম আলোকে বলেন, সংরক্ষিত কোটা ও অসামান্য অবদান কোটায় রাজউকের বরাদ্দ করা প্লটগুলো পর্যালোচনার জন্য আদালত থেকে একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। কমিটির সুপারিশে যা থাকবে, মন্ত্রণালয় সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। তিনি বলেন, রাজউকের প্লট বরাদ্দের বিধিমালার অসামান্য অবদান–সংক্রান্ত ১৩/এ উপবিধি ও সংরক্ষিত কোটা সংরক্ষণ-সংক্রান্ত ৭ নম্বর ধারা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বাতিল করেছে।

আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে প্লটগুলো নিয়মের মধ্যে দেওয়া হয়েছে কি না, তা দেখা। সে অনুযায়ী আমরা প্রতিবেদন জমা দেব। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন আদালত।

বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী

সম্পর্কিত খবর

সম্পাদক: আবুল খায়ের (কবি ও কলামিস্ট)।
নির্বাহী সম্পাদক:
বার্তা প্রধান:

অফিস:  বাড়ি ১১, সড়ক ৩, সেক্টর ৬,  উত্তরা, ঢাকা-১২৩০।
যোগাযোগ: ০১৭১৫৩৬৩০৭৯
বিজ্ঞাপন: ০১৮২৬৩৯৫৫৪৯
Email: info@dainikprotibimbo.com khair.hrm@gmail.com

Facebook

©2025 Dainik Protibimbo – All Right Reserved. Designed and Developed by Bangla Webs